প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট আস্থাহীনতা, গ্রাহকদের ব্যাপক আমানত প্রত্যাহার এবং তারল্য সংকটের মধ্যেই ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটির চলমান সংকট ও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজতে আজ রবিবার (১৪ জুন) বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নরের সঙ্গে এ বৈঠক শুরু হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, দুজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) এবং ছয়জন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) অংশ নিয়েছেন। প্রতিনিধিদলটি ব্যাংকের চলমান পরিস্থিতি, তীব্র তারল্য চাপ এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে গভর্নরকে বিস্তারিত অবহিত করবেন।
এদিকে, চেয়ারম্যান নিয়োগকে ঘিরে সৃষ্ট অসন্তোষ ও আস্থাহীনতার জেরে গ্রাহকদের ব্যাপক টাকা উত্তোলনের কারণে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে দেশের বৃহত্তম এই বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকটি। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে ইসলামী ব্যাংককে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার জরুরি আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সহায়তার এ অর্থের মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা নগদ অর্থ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আন্তঃব্যাংক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সেবা সচল রাখতে আরও ৫০০ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকিং সূত্র জানায়, ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগের পর থেকেই গ্রাহকদের একাংশের মধ্যে তীব্র আস্থাহীনতা তৈরি হয়। এর জেরে মাত্র সাত কার্যদিবসে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা তুলে নেন আমানতকারীরা। ফলে ব্যাংকটির তারল্য ব্যবস্থাপনায় তীব্র চাপ তৈরি হয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, খুরশীদ আলমের নিয়োগের আগে ইসলামী ব্যাংকের ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকটির সিআরআর প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা থাকার কথা থাকলেও, টানা আমানত উত্তোলনের ফলে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংরক্ষিত ব্যাংকটির চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ব্যালেন্সও বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়েছে।
দৈনন্দিন লেনদেন ও গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ পরিশোধে হিমশিম খেতে থাকা ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছে। এরই অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে এই ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. জুবায়দুর রহমান আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন। একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে এই নিয়োগের পর থেকেই ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকদের একটি বড় অংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়।
‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ কর্মসূচি চলছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিতর্কিত ব্যক্তিকে শীর্ষ পদে বসানোর ফলে ব্যাংকের চলমান সংস্কার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দাবি আদায় না হলে আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচিরও আলটিমেটাম দিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে, গত শুক্রবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দাবি করেন, ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো অবৈধ হস্তক্ষেপ করেনি। গভর্নর বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইসলামী ব্যাংকে পাঁচ সদস্যের একটি বোর্ড ছিল। ওই বোর্ডের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় গত ১৬ মার্চ তাকে পরিবর্তন করা হয়। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংক কারও বদলি বা পদোন্নতির বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়নি।’