ফের বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম
প্রতীকী ছবি © এ আই দ্বারা তৈরিকৃত ছবি
দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কিছুটা প্রশমিত হলেও এর ধাক্কা এখনো কাটেনি। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সংকট-পূর্ব পর্যায়ের কাছাকাছি ফিরলেও ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানা এখনো প্রয়োজনীয় চাপের গ্যাস পাচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের অস্থিরতা নতুন চাপ তৈরি করেছে। এর মধ্যেই গতকাল রবিবার ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে সব ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের দাম। ফলে বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে পরিবহন ব্যয় ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির নতুন শঙ্কা। সব মিলিয়ে জ্বালানি সংকট এখন সরকারের জন্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, জনজীবন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনারও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংকট কমলেও স্বস্তি ফেরেনি
পেট্রোবাংলার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুটে উঠেছে। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে প্রায় ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। সংকটের আগে মোট সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৬০০-২ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ প্রায় আগের অবস্থায় ফিরেছে। কিন্তু শিল্পাঞ্চলের বাস্তবতা এখনো ভিন্ন।
শিল্পোদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ১০-১৫ পিএসআই চাপের বিপরীতে ঢাকার আশপাশের অনেক কারখানা মাত্র ২-৩ পিএসআই গ্যাস পাচ্ছে। ফলে উৎপাদন স্বাভাবিক করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ সমস্যা এখন শুধু গ্যাসের মোট সরবরাহ ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়; সরবরাহ, সঞ্চালন, বিতরণ ও চাহিদা ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতাও বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে।
শিল্পে বাড়ছে উৎপাদন ও রপ্তানির ঝুঁকি
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, নিটিং, সিরামিকসহ জ্বালানি-নির্ভর শিল্পে। শিল্প পুলিশের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মূল্যায়নে প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোর ৪০০টির বেশি কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। এর মধ্যে ২০২টি কারখানা সংকট অব্যাহত থাকলে এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। তবে তৈরি পোশাক খাতে এখন পর্যন্ত গ্যাস সংকটের কারণে কোনো কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ।
সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, সংকটের প্রকৃত প্রভাব আগামী কয়েক মাসে আরও স্পষ্ট হতে পারে। ফলে তাৎক্ষণিক কারখানা বন্ধের চেয়ে বড় উদ্বেগ হলো উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়া, সময়মতো রপ্তানি না হওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া। গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় শিল্পের ব্যয় বাড়ছে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হলো জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির নতুন চাপ।
একলাফে ২০ টাকা, বাড়ছে জনদুর্ভোগের শঙ্কা
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে সরকার ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দর কার্যকর হয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে।
সরকারের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপের কারণে এ সমন্বয় প্রয়োজন হয়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান ২২৮ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন টাকা হয়েছে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে।
কিন্তু এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের ওপর। ইতোমধ্যে রাজধানীর কয়েকটি রুটে বাসভাড়া ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর খবর এসেছে। দক্ষিণাঞ্চলগামী কয়েকটি রুটের পরিবহন মালিকেরাও যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান মনে করেন, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে। তার মতে, এর ফলে ব্যক্তিগত ভোগ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ পড়তে পারে।
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনও বলেছেন, পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে জ্বালানি সরাসরি ব্যবহার না করা পরিবারগুলোকেও শেষ পর্যন্ত বেশি দাম দিতে হবে। বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার বেশি চাপে পড়বে। কৃষিতেও ডিজেলনির্ভর সেচ, যান্ত্রিকীকরণ ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে, যা খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করবে।
দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা সংকটের কারণ
সাম্প্রতিক সংকটের তাৎক্ষণিক কারণগুলোর একটি ছিল মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালে দীর্ঘ সময়ের কারিগরি বিঘ্ন। এর সঙ্গে এলএনজি কার্গো সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তবে এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কাঠামোগত সমস্যা— দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের সীমাবদ্ধতা, আমদানিনির্ভরতা, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্যের ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর উচ্চ নির্ভরতা। আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্য অস্থিরতাও যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, শিল্প ও পরিবহন খাতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, সাম্প্রতিক সংকট সেটিই আবার সামনে এনেছে।
সরকারও পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখী করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলছে। কিন্তু জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা কিংবা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে সাময়িক ঘাটতি পূরণ দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
নতুন জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সামাজিক ধাক্কাও সামলাতে হবে সরকারকে। ব্যবসায়ী মহলের আশঙ্কা, জ্বালানি ব্যয় বাড়লে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেছেন, এই মূল্যবৃদ্ধি শিল্প ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে এবং ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ সরকারের সামনে এখন একসঙ্গে কয়েকটি চাপ—বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সচল রাখা, জ্বালানি আমদানির বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামলানো এবং জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত যাতে নিত্যপণ্য ও গণপরিবহনে অস্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে না পড়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা।
একদিকে পূর্ববর্তী সময়ের আমদানিনির্ভর ও দুর্বল জ্বালানি কাঠামোর উত্তরাধিকার, অন্যদিকে সেই কাঠামো সংস্কারের দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সংকটের দায়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে এর বাস্তব ফল—বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিশ্চয়তা, বাড়তি পরিবহন ব্যয়, বাড়তে থাকা উৎপাদন খরচ এবং নিত্যপণ্যের দামের নতুন চাপ।
তাই সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ এখন শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাসের ঘাটতি মেটানো নয়। জ্বালানি সংকট যেন মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ব্যয় ও জনদুর্ভোগের বহুগুণ সংকটে রূপ না নেয়—স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।