জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী © সংগৃহীত
সোমবার যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প বললেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে 'গঠনমূলক' আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকবে, তখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নাটকীয়ভাবে কমতে শুরু করেছে।
আর সেই সঙ্গে পুঁজিবাজারে গত কয়েক দিনের ধারাবাহিক দরপতনের ধারাও যেন দিক পরিবর্তন করার আভাস দিতে শুরু করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, দুই দেশ একটি ‘সম্পূর্ণ ও সামগ্রিক’ সমাধানের বিষয়ে আলোচনা করেছে, তবে ইরান এ ধরনের কোনো আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে।
এদিকে ট্রাম্পের ওই বিবৃতির পর ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল অর্থাৎ অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে, আর বিপরীতে ইউরোপীয় এবং মার্কিন শেয়ারের দর বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালির নৌপথ পুনরায় খুলে দেওয়া না হয়, তবে তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেবেন।
জবাবে ইরানও বলেছিল, তারা পারস্য গালফ অঞ্চলের মার্কিন সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালাবে।
শনি ও রবিবার ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ওই সব বক্তব্যে আর্থিক বাজার অস্থির হয়ে উঠছিল, যা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নিতে পারে-এমন আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
সোমবার এক পর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৩ মার্কিন ডলারে উঠে গিয়েছিল, কিন্তু ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্যের পর তা দ্রুত নিচে নেমে আসে। এরপর ব্যারেল প্রতি সর্বনিম্ন ৯৬ ডলারে নেমে পরে আবারও সামান্য বৃদ্ধি পায়।
এদিকে তেলের দাম কমলেও শেয়ারবাজারের সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
লন্ডনের ফাইনান্সিয়াল টাইমস স্টক এক্সচেঞ্জ এফটিএসই-১০০ সূচক সোমবার দিনের শুরুতে ২ শতাংশের বেশি পড়ে গেলেও দিন শেষে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসে। জার্মানির ডিএএক্স সূচকও ঘুরে দাঁড়িয়ে এক দশমিক দুই শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দিন শেষ করেছে, আর ফ্রান্সের সিএসি সূচক প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ড পি ৫০০, মানে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত শীর্ষ ৫০০ কোম্পানির কার্যত্রম দেখা হয় যে ইনডেক্সে তার সূচক এক দশমিক এক শতাংশের বেশি বেড়েছে। আর ডাও জােন্স সূচক প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধিতে দিন শেষ করেছে। এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলো ট্রাম্পের মন্তব্যের আগেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে বড় ধরনের ধস দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই সূচক ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সাড়ে ছয় শতাংশ কমেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের ফলে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ তারা তেল ও গ্যাসের জন্য ব্যাপকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল, যা সাধারণত বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান কার্যত এই জলপথটি অবরুদ্ধ করে রেখেছে। বিশ্বের প্রায় কুড়ি শতাংশ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজি সাধারণত এ প্রণালি দিয়ে পার হয়, যে কারণে এ সংঘাত বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে।
সোমবার সকালে ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ ইংরেজি বড় হাতের অক্ষরে লেখা এক পোস্টে ট্রাম্প জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান আমাদের 'শত্রুতার একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক সমাধানের' বিষয়ে গত সপ্তাহে আলোচনা করেছে।
তিনি লেখেন, ‘এই গভীর, বিস্তারিত এবং গঠনমূলক আলোচনার মেজাজ ও সুরের’ ওপর ভিত্তি করে তিনি ইরানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে যেকোনো ধরনের হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি আরও যোগ করেন যে, সিদ্ধান্তটি 'চলমান বৈঠক এবং আলোচনার সফলতার ওপর নির্ভরশীল'।
তবে এরপর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি জারি করে যেখানে বলা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যা বলেছেন, তা আমরা অস্বীকার করছি।’
একই সঙ্গে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফ সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-এ লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে চোরাবালিতে আটকে আছে - তা থেকে বাঁচতে ‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়া খবর প্রচার করা হচ্ছে।”
আর্থিক প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুজানা স্ট্রিটার বলেছেন, ট্রাম্পের এসব মন্তব্য বাজারকে এক ‘উত্তাল পরিস্থিতির’ মধ্য দিয়ে নিয়ে গেছে।
তবে তিনি যোগ করেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথার ওপর নির্ভর করাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ গত চার সপ্তাহে আশা যেভাবে জেগেছিল, আবার তা বারবার ভেঙেও গেছে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তেলের দাম এখনো ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে থাকায় ‘কোম্পানি এবং সাধারণ গ্রাহক উভয়ের জন্যই জ্বালানি খরচ একটি পীড়াদায়ক ব্যাপার হয়ে থাকবে’।
‘যেহেতু জ্বালানি সরবরাহ রুটে অচলাবস্থা চলছে এবং ওই অঞ্চল জুড়ে ব্যাপকভাবে অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, ফলে এটি স্পষ্ট যে, একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও ব্যবসায়ীরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে খুবই কম জ্বালানি প্রবাহ পাওয়ার আশা করছেন।’
এ সংঘাত ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহকে বিঘ্নিত করেছে, যার ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
এর আগে সোমবার, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার আইএ'র প্রধান ফাতিহ বিরল সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, এ যুদ্ধের কারণে বিশ্ব গত কয়েক দশকের মধ্যে ভয়াবহতম জ্বালানি সংকটের সম্মুখীন হতে পারে।
বিরল বর্তমান এই জ্বালানি সংকটকে ১৯৭০-এর দশকের সংকট এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের প্রভাবের সাথে তুলনা করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ায় একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী এই সংকটটি মূলত দুটি তেল সংকট এবং একটি গ্যাস বিপর্যয় - সবকিছুর এক ভয়াবহ সংমিশ্রণ।’
সংঘাত শুরুর পর থেকে তেল ও গ্যাসের দামের এই উল্লম্ফন চলতি বছরের শেষের দিকে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বিল মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার গত রবিবার ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তারা হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সোমবার দিন শেষে, স্যার কিয়ার সরকারের জরুরি অবস্থা মোকাবিলা কমিটি 'কোবরা'র একটি বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন, যেখানে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি উপস্থিত থাকবেন।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের আগেই ওই বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, বৈঠকে জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হবে।
গত কয়েক দিনে যুক্তরাজ্য সরকারের ঋণের খরচ দ্রুত বাড়ছে এবং গত শুক্রবার তা ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে।
সোমবার, ১০ বছর মেয়াদী সরকারি ঋণের সুদের হার, এক পর্যায়ে যা ৫ দশমিক ১২ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল, সেটি ট্রাম্পের মন্তব্যের পর কমে প্রায় পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি নেমে আসে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা