গভীর সংকটে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্প

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৪১ AM , আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৩৩ AM
গার্মেন্টস শিল্প

গার্মেন্টস শিল্প © ফাইল ফটো

বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্প বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ২২০টিরও বেশি গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানিখাত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। এর প্রভাব শুধু রপ্তানি আয়ে সীমাবদ্ধ নয়; পুরো শিল্পশৃঙ্খল, শ্রমবাজার এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।

এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বায়ারদের আচরণে। সাম্প্রতিক সময়ে H&M, Zara, Nike–এর মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর ভিজিট ও অডিট বাতিল হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের প্রতি আস্থার ঘাটতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাশাপাশি LEED ও কমপ্লায়েন্স অডিট স্থগিত হওয়ায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কাঠামোগত কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে টেক্সটাইল শিল্প মূলত উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের পরিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও সরকারের কার্যকর সহায়তা ছিল সীমিত। শিল্প টিকিয়ে রাখার জন্য যেসব মৌলিক সাপোর্ট প্রয়োজন—যেমন কাঁচামালের সহজলভ্যতা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ তা বাস্তবে সঠিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। বরং কর ও বিভিন্ন চার্জ বৃদ্ধির মাধ্যমে শিল্পের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় বিদেশ থেকে সুতা আমদানি বাড়ায় দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও দেশের স্পিনিং শিল্পে বিশ্বমানের আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে এবং উৎপাদন সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, তবু নীতিগত দুর্বলতার কারণে এই শিল্প ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে শিল্পবান্ধব নীতির অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

তবে সংকটের দায় শুধু নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপালেই শেষ হয় না। শিল্পের ভেতরেও স্বল্পমেয়াদি লাভকেন্দ্রিক মানসিকতা একটি বড় সমস্যা। দীর্ঘমেয়াদে শিল্পকে টিকিয়ে রাখার পরিকল্পনার অভাব এই দুর্বলতাকে আরও তীব্র করছে। যদিও এই মানসিকতার পেছনে সরকারি সহায়তা ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো টেক্সটাইল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে টেক্সটাইল বিষয়ে প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের ঘাটতি। এর ফলে সঠিক যাচাই-বাছাই ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যাহত হচ্ছে, যা পুরো শিল্প কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের টেক্সটাইল সেক্টরের সমস্যাগুলোকে সামনে রেখে এসবের প্রকৃত কারণ, উত্তরণের পথ এবং যুগোপযোগী বিভিন্ন দিক নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. শাহ আলিমুজ্জামান বেলাল, অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম, অধ্যাপক ড. শেখ মো. মামুন কবীর এবং সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আববাস উদদীন। 

ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. শাহ আলিমুজ্জামান বেলাল বলেন, টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে সরকার ও শিল্প দুই পক্ষেরই দায় রয়েছে। শিল্পটি মূলত শ্রমিক ও উদ্যোক্তাদের পরিশ্রমে টিকে থাকলেও সরকারের কার্যকর সহায়তা খুব সীমিত। কাঁচামাল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করে কর ও সুবিধা আদায়েই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। বিদেশি সুতা আমদানির কারণে আধুনিক মেশিন থাকা সত্ত্বেও দেশীয় স্পিনিং মিল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু উদ্যোক্তার স্বল্পমেয়াদি লাভকেন্দ্রিক মানসিকতা শিল্পকে দুর্বল করছে। টেক্সটাইল বিষয়ে দক্ষ লোকের অভাব ও শিল্পবান্ধব নীতির ঘাটতিও এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।

ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম বলেন, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল পিছিয়ে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে আমি গ্যাস সংকট কে দেখছি। বাংলাদেশের গ্যাস কমে যাচ্ছে, ঢাকার নিচে পানি অনেক কমে গিয়েছে- এ অবস্থায় টেক্সটাইল সেক্টর কেমন করে এগিয়ে যাবে?

তিনি আরো বলেন, টেক্সটাইল সেক্টরকে এগিয়ে নিতে হলে অবশ্যই চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এলাকায় কার্যক্রম বাড়াতে হবে। মাটির নিচের নয়, বরং নদী বা সাগরের পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। 

টেক্সটাইল ম্যাটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. শেখ মো. মামুন কবীর বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিপুলসংখ্যক গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পের জন্য একটি গুরুতর সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর ফলে রপ্তানি আয় হ্রাসের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সংকট, শিল্পশৃঙ্খলে উৎপাদন ব্যাঘাত এবং শ্রমবাজারে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। সেই সাথে তিনি উল্লেখ করেন, কমপ্লায়েন্স অডিট স্থগিত, এনার্জি সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও বায়ারদের আস্থার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে; যার উত্তরণে ভ্যালু-অ্যাডেড উৎপাদন, অবকাঠামোগত সংস্কার ও নীতিগত সহায়তা জোরদার করা জরুরি। 

টেক্সটাইল সেক্টরের বর্তমান সংকটগুলোর উত্তরণে ডিজিটালাইজেশন, অটোমেশন কিংবা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর ভূমিকার বিষয়ে ডাইজ এন্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আববাস উদদীন বলেন, টেক্সটাইল সেক্টরের সংকট মোকাবিলায় ডিজিটালাইজেশন, অটোমেশন ও এআই তখনই কার্যকর হবে, যখন একজন ইঞ্জিনিয়ার কোর প্রসেস ও মেশিন ভালোভাবে বুঝবে। মেশিনের কাজ, ব্রেকডাউন, এনার্জি লস ও প্রসেস দুর্বলতা না জেনে শুধু সফটওয়্যার ব্যবহার করলে সমাধান আসবে না। আগে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে, তারপর ডেটা, অটোমেশন ও এআই শেখে হাইব্রিড ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। নতুন গ্র্যাজুয়েটদের মৌলিক জ্ঞান, ডেটা স্কিল, সাসটেইনেবিলিটি ও গ্রিন ইঞ্জিনিয়ারিং শেখার পাশাপাশি সততা ও লেগে থাকার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাত বর্তমানে একটি কঠিন সময় পার করছে। গ্যাস সংকট, পানি ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব একসঙ্গে শিল্পকে চাপের মধ্যে ফেলেছে। এর ফলে কারখানা বন্ধ, রপ্তানি আয় হ্রাস এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট স্থায়ী নয়। সরকারকে সময়োপযোগী নীতিগত সিদ্ধান্ত, শিল্পের ভৌগোলিক পুনর্বিন্যাস, টেকসই পানি ও জ্বালানি ব্যবহারে জোর এবং ভ্যালু-অ্যাডেড ও বিকল্প রপ্তানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে টেক্সটাইল সেক্টর আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত ২ বাংলাদেশির ১ জন কলেজছাত্র
  • ০৯ মে ২০২৬
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ হোক স্বচ্ছতার সঙ্গে
  • ০৯ মে ২০২৬
সাজেকে ব্রাশফায়ারে ইউপিডিএফ সদস্য নিহত
  • ০৯ মে ২০২৬
বাংলার নবম, বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভ…
  • ০৯ মে ২০২৬
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ওষুধ সংকট
  • ০৯ মে ২০২৬
মীনা বাজার নিয়োগ দেবে এক্সিকিউটিভ, আবেদন ২০ মে পর্যন্ত
  • ০৯ মে ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SUMMER 2026
Application Deadline Wednesday, May 13, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9