ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
© লোগো
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের আপ্যায়নের জন্য বরাদ্দকৃত ৫৪ লাখ টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর আগে শিক্ষকদের দুই দিনের বেতনের সম পরিমাণ অর্থ ত্রাণ তহবিলে দেয়ার ঘোষণা দেয় বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতি। তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বলছে, বাইরের কোনো তহবিলে অনুদান না দিয়ে এসব অর্থ দিয়ে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্বচ্ছল ও অসহায় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।
জানা যায়, প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এজন্য হলগুলোকে আলাদা করে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে এ বছর করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে আবাসিক হলগুলো বন্ধ থাকায় পহেলা বৈশাখের কোনো আয়োজন হচ্ছে না। তাই গত বুধবার খাবারের জন্য বরাদ্দকৃত প্রায় ৫৪ লাখ টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তের বেশ সমালোচনা করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।
তারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের খাবারের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ত্রাণ তহবিলে না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের খাবারের জন্য পাঠানো প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সিদ্ধান্ত জানার পর উপাচার্য স্যারকে ফোন দিয়ে টাকাগুলো ত্রাণ তহবিলে না দিয়ে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যয় করার কথা বললে তিনি নাকচ করে দেন। এর আগেও যখন ডাকসুর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এ আহবান করা হয় তখন আমি উপাচার্য স্যারের সাথে কথা বলেছি যে, এ টাকা ডাকসুর মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হোক। প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে সারা দেশের মানুষ অর্থ দিচ্ছে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৫০০ শিক্ষার্থী আছে যারা খুবই দরিদ্র। তাদের ২০০০ করে টাকা দেয়া হলেও শিক্ষার্থীদের কল্যাণ হতো।
একই মত দেন প্রগতিশীল ছাত্র জোটের প্রধান সমন্বয়ক ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি আল কাদেরী জয়। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যয় করা উচিৎ। এ টাকা যদি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে যায় তাহলে এ টাকাগুলো চোর-বাটপারদের পকেটে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।
সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন ঢাবি ছাত্র অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসু সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন। তিনি এর বিরোধীতা করে গণমাধ্যমে দেয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ডাকসুর আহ্বানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত নববর্ষের আপ্যায়ন বাবদ প্রায় ৫৪ লক্ষ টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ-তহবিলে দান করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক হিসেবে এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করছি। মাহামারী করোনার এই দূর্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীই পরিবার নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে ভুগছে। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি নেই অনেকের ঘরে। মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের এসব শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা এবং সংকটকালীন উপহার একান্ত প্রয়োজন। এমতাবস্থায়, শিক্ষার্থীদের সহয়তা না করে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে তাদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ দান করা কোনোভাবেই সঠিক এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপ- উপাচার্য (প্রশাসন) ড.মুহাম্মদ সামাদ বলেন, আমি জানতে পেরেছি, ডাকসুর সভাপতি, কোষাধ্যক্ষ ও ডাকসু নেতৃবৃন্দ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের উপাচার্য স্যার আমাদের সাথে এ বিষয়ে আলাপ আলোচনা করেছেন সেখানে আমাদের মতামত দেওয়ার তেমন একটা সুযোগ নাই। বর্তমান এই লকডাউনের সময় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া আমাদের পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করবো যেখানে আমাদের শিক্ষার্থীরা বিপাকে রয়েছে তাদেরকে যেন বিশেষ নজর দেওয়া হয়।
এদিকে শিক্ষকদের দুই দিনের বেতন ত্রাণ তহবিলে দেয়ার সমালোচনা করেন অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী। তিনি বলেন, আমার মতে এই অর্থের আরো যৌক্তিক এবং সংগত ব্যবহার হবে যদি এই অর্থ সংগ্রহ করে এই বিপর্যয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিটিকে কীভাবে রক্ষা করতে পারি সেটার দিকে মনোযোগ দিতে পারি। এটা একটু স্বার্থপরের মতন শোনালেও বেশ কার্যকরী। প্রত্যেকটা কমিউনিটি যদি তার নিজের কমিউনিটির জন্য কাজ করে তাহলেই তো আর কারো কিছু করা লাগে না। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী রয়েছে ৩০/৩৫ হাজার এবং বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এরা কে কেমন আছে এই বিপর্যয়ে আমরা জানি?
এদিকে শিক্ষার্থীদের খাবারের টাকা ত্রাণ তহবিলে দিলেও ডাকসুর অভিষেক অনুষ্ঠানের অব্যয়িত অর্থ শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয় করতে রাজি নয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অভিষেক অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু মেয়াদের এক বছর শেষ হলেও অভিষেক অনুষ্ঠান না হওয়ায় এ অর্থ প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নবীন বরণের জন্য বরাদ্দ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নবীন বরণ অনুষ্ঠানও করা সম্ভব হয়নি। বরাদ্দকৃত এ অর্থ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয় করার দাবি জানিয়েছে ডাকসু।
বুধবার ডাকসুর স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী এ দাবি জানান। তবে এ অর্থ শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন ডাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, এগুলো সরকারি অর্থ, এখান থেকে কোথাও বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়। এগুলো করতে হয় সরকারি নীতিমালার আলোকে, অন্যথায় ফিন্যান্সিয়াল মিস ম্যানেজমেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থের সঙ্কট রয়েছে। আমরাতো চ্যারিটেবল না, সরকারি অর্থের উপরে আমাদের নির্ভর করতে হয়। তাই এ অর্থ দেওয়া সম্ভব নয়।