অপ্রতীম ও তার হত্যাকারীরা © টিডিসি সম্পাদিত
একজন এসেছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে, আরেকজন কোটবাড়ি বোর্ড মার্কেট এলাকা থেকে। আরেকজনকে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল হত্যার পরিকল্পনার কথা। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন পথ ধরে তিনজন গিয়ে জড়ো হয় লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায়। সেখানে তাদের সঙ্গে ছিল ১৩ বছর বয়সি স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমও।
তিনজনের জবানবন্দি থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা আগেই করা হয়েছিল বলে আসামিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। ঘটনার দিন অপ্রতিমকে ছবি তোলার কথা বলে পাহাড়ের দিকে নেওয়া হয়। তবে চারজন একই জায়গা থেকে পাহাড়ে যাননি। প্রত্যেকের জবানবন্দিতে তাদের যাত্রাপথ ও সাক্ষাতের বর্ণনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে।
তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। এরপর তিনি অপ্রতিমকে সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যান। জবানবন্দিতে ওই জায়গাটিকে তুহিনের চাচা শাহ আলমের পাহাড় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, দুপুর ২টার পর কোটবাড়ি বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগে সে তার আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে যায়। যাওয়ার আগেই ওই বন্ধুকে অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয় বলে তার জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।
তৃতীয় কিশোরের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে ওই কিশোরের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখানেই তাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। এরপর বিকেল ৪টার পর তারা পাহাড়ে যায়।
পাহাড়ে গিয়ে তারা অপ্রতিম ও তুহিনকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখে বলে তৃতীয় কিশোরের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। পরে চারজন কিছু সময় গল্প ও আড্ডা দেন।
তিন আসামির জবানবন্দির একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। তার জানায়, হত্যাকাণ্ডের আগে অপ্রতিমের ফোন নেওয়া হয়। অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরের ভাষ্য, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম সেটি দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর ফোনটি তুহিনের হাতে তুলে দেয় সে।
তুহিনের জবানবন্দিতেও ফোন নেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। পরে অপ্রতিম ফোনটি ফেরত চাইলে তার সঙ্গে তুহিনের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।
এর একপর্যায়ে তুহিন অপ্রতিমকে প্রথমে থাপ্পড় দেন এবং পরে পাশে থাকা একটি কোদালের হাতল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন বলে। তিন জবানবন্দিতেই তুহিনের প্রথম আঘাতের কথা উঠে এসেছে। তুহিনের নিজের জবানবন্দি অনুযায়ী, এরপর তিনি অন্য দুজনকে অপ্রতিমকে মারতে বলেন।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরও জানিয়েছে, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঝগড়ার একপর্যায়ে তুহিন কোদালের হাতল দিয়ে প্রথমে তার মাথায় আঘাত করেন। তৃতীয় কিশোরের জবানবন্দিতেও তুহিনের হাতে প্রথম আঘাতের কথা বলা হয়েছে।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে চারজনের চলে যাওয়ার বিষয়ে অবশ্য তিন জবানবন্দিতে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া গেছে।
তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায়। এরপর তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর সে ও তার কিশোর বন্ধু একসঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়। তখন তুহিন ঘটনাস্থলে ছিলেন।
অন্যদিকে তৃতীয় কিশোর জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে চলে যান। অর্থাৎ, অপ্রতিমের মৃত্যুর পর কে কার সঙ্গে এবং কোন পথে ঘটনাস্থল ছাড়ে— এ বিষয়ে তিন আসামির বর্ণনায় পুরোপুরি মিল নেই। তবে তিন জবানবন্দিতেই অপ্রতিমের ফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছে থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
হত্যাকাণ্ডের পরের ঘটনাতেও আসামিদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। তুহিন জানিয়েছেন, পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। এরপর তিনি তার এক বন্ধুকে নিয়ে কোটবাড়ি এলাকায় অপ্রতিমকে খুঁজতে যান।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার এক সহকারীর সঙ্গে তাকে খুঁজতে বের হয়। পরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে সেও ঘটনাস্থলে যায়।
তৃতীয় কিশোরের বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে স্ট্যাটাস দেয়।
এদিকে তুহিনের জবানবন্দিতে তার এক বন্ধুর বিষয়ে নতুন তথ্যও এসেছে। তুহিন জানিয়েছেন, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি ওই বন্ধুকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তাকে পুরো ঘটনা জানান। এমনকি হত্যার পরিকল্পনার বিষয়েও ওই বন্ধু আগে থেকেই জানতেন বলে তুহিনের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে তুহিনের ওই বন্ধুর হত্যার পরিকল্পনায় সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়নি।
পরে পুলিশ তুহিনের ওই বন্ধুকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি। তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন।
পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করা হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়।
আদালতে দেওয়া তিন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নেওয়া, ফোন নেওয়া এবং হামলার বিষয়ে বেশ কিছু মিল পাওয়া গেলেও হত্যার পর ঘটনাস্থল থেকে কে কোথায় গেছে, তুহিনের বন্ধুর সম্পৃক্ততা কতটা এবং ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না— এসব বিষয় এখনো তদন্তসাপেক্ষ।
পুলিশ জানায়, আদালতে দেওয়া জবানবন্দির তথ্য অন্যান্য সাক্ষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও উদ্ধার হওয়া আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। ফলে জবানবন্দিতে উঠে আসা ঘটনাপ্রবাহের প্রতিটি তথ্য তদন্তে যাচাই করার পরই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ চিত্র নিশ্চিত হবে।