ধর্ষণের শিকার কিশোরীর ছবি ফেসবুকে দিলেন ওসি, এসআইকে প্রত্যাহার

০৪ জুন ২০২৬, ০৮:৫৭ AM
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেন

ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেন © সংগৃহীত

ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীর ছবি ও পরিচয় প্রকাশের অভিযোগকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারের চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এবং চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামকে ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

কক্সবাজারের চকরিয়ায় এক কিশোরী অপহরণের ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলা এবং পরে হামলাকারীদের ওপর পুলিশের নির্যাতনসহ নানা কারণে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জনমনে ক্ষোভ ও বিরূপ প্রভাব পড়ে চকরিয়া থানা পুলিশের ওপর।ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামকে ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এবং চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

বুধবার (৩ জুন) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ন্যাশনাল ল ইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস. এম. জুলফিকার আলী জুনু এ নোটিশ প্রেরণ করেন। নোটিশটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এ ঘটনার নেপথ্য নির্দেশদাতা হিসেবে ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেনের অপসারণ ও শাস্তির দাবি ওঠে। এ থেকে জনদৃষ্টি সরাতে অভিযানে উদ্ধার হওয়া ধর্ষণের শিকার কিশোরীর একটি ছবি ‘চকরিয়া পুলিশ স্টেশন’ নামে একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেছেন খোদ ওসি। শুধু তাই নয়, অভিযোগ উঠেছে, ভিকটিমের আপত্তিকর ছবি ওসি মনির নিজেই তুলেছেন। সোমবার রাতে ছবিটি প্রকাশ করা হয়। আইনি সুরক্ষার বদলে পুলিশের এমন চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং বেআইনি আচরণে স্তম্ভিত স্থানীয় সচেতন মহল ও মানবাধিকারকর্মীরা।

কেবল ছবি প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হননি ওসি মনির। অভিযোগ উঠেছে, নিজের ‘তৎপরতা’ জাহির করতে এবং সমালোচকদের কড়া জবাব দিতে সোমবার রাতে ওই ছবির সঙ্গে ফেসবুক পেজে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাসও জুড়ে দেন তিনি। চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী এলাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে ওসির নিজের ভাষায় লেখা ওই দীর্ঘ বয়ানটি ভিকটিমের সুরক্ষার বদলে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরে অবশ্য সমালোচানার মুখে ফেসবুক পেজটি ডিঅ্যাকটিভ করা হয়।

পুলিশ সূত্র জানায়, শনিবার সন্ধ্যায় চকরিয়ায় এক কিশোরীকে উদ্ধার অভিযানে যায় পুলিশ। সেখানে গিয়ে ‘প্রেমিক-প্রেমিকা’কে লাঠিপেটা করার অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে ওই রাতেই অভিযুক্ত উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামকে চকরিয়া থানা থেকে প্রত্যাহার করে কক্সবাজার জেলা পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়।

পুলিশের দাবি, উদ্ধার হওয়া কিশোরী অপহরণ ও ধর্ষণের শিকার। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মামলার পর তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে শক্তি প্রয়োগ করা হয়। ভিডিওটি সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান ওসি মনির। স্থানীয় সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। ওসির এমন কাণ্ডে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নেটিজেনরা।

মেয়েটির বাবা বলেন, ‘আমার মেয়েকে পুলিশ উদ্ধারের পর কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করায়। সেখানে চিকিৎসকরা ধর্ষণের আলামত পেয়েছেন বলে ওসি আমাকে জানিয়েছেন। তবে ফেসবুকে আমার মেয়ের ছবি প্রচারের বিষয়ে ওসি আমাকে কিছুই জানাননি, আমার কোনও অনুমতিও নেননি। মেয়ের মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছেন কিনা, তাও আমি জানি না।’

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির (বার) সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৪ ধারা অত্যন্ত স্পষ্ট। এই আইন অনুযায়ী, কোনও অবস্থাতেই নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার কোনও নারী বা শিশুর ছবি, নাম-ঠিকানা বা পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। আইনের রক্ষক হিসেবে ওসির এই আচরণ শুধু দুঃখজনকই নয়, সরাসরি বিদ্যমান আইনের লঙ্ঘন। এর বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

নোটিশে বলা হয়েছে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যায় যে, ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীর ছবি চকরিয়া থানার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানার ওসি মনির হোসেনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং বিষয়টি আইনগত ও নৈতিক দিক থেকে গুরুতর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

আইনজীবীর দাবি, যৌন সহিংসতার শিকার কোনো ব্যক্তি, বিশেষ করে শিশু বা কিশোরীর পরিচয় প্রকাশ করা কিংবা এমন তথ্য প্রচার করা, যার মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তা বিদ্যমান আইন, মানবাধিকার নীতি এবং ভিকটিম সুরক্ষাবিষয়ক নির্দেশনার পরিপন্থি। একই সঙ্গে এটি আদালতের নির্দেশনারও লঙ্ঘন হতে পারে।

নোটিশে উল্লেখ করা হয়, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তা ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মৌলিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে। পাশাপাশি এ ধরনের কর্মকাণ্ড ভিকটিমের মানসিক সুস্থতা, সামাজিক মর্যাদা এবং নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ঘটনায় পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, ভিকটিমকে শনাক্ত করা যায় এমন সব ছবি ও তথ্য দ্রুত অপসারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও নির্দেশনা কার্যকর করা।

নোটিশে আরও বলা হয়েছে, নোটিশ পাওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে লিখিতভাবে জানাতে হবে। অন্যথায় জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হবে।

​অভিযোগের বিষয়ে জানতে চকরিয়া থানার ওসি মনির হোসেনের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, ওসির এই বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কেউ সোচ্চার হলে বা সংবাদ প্রকাশ করলে সাংবাদিকদের ‘ডাকাতি ও ইয়াবা মামলায় ফাঁসানো’র হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করছেন তিনি।

​আইন লঙ্ঘনের এই স্পর্শকাতর বিষয়ে কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. অহিদুর রহমান বলেন, ‘ভিকটিমের কোনও ছবি বা পরিচয়-ঠিকানা কোনোভাবেই প্রচার করা যায় না। এটি আইন পরিপন্থি এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ওসি চকরিয়া ফেসবুকে ভিকটিমের ছবি দিয়ে ঠিক করেননি। আমি তার সঙ্গে কথা বলবো। পাশাপাশি তার আরও কিছু বিষয় আছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার কক্সবাজারে আসলে এ বিষয়ে এসপি স্যার আর আমি কথা বলবো।’

আজ যুক্তিতর্ক শেষে জানা যাবে রায়ের দিন
  • ০৪ জুন ২০২৬
২০২৩ সালের প্রিলিমিনারি টু মাস্টার্স পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ
  • ০৪ জুন ২০২৬
নদীতে গোসল নেমে প্রাণ গেলো দুই ভাইয়ের
  • ০৪ জুন ২০২৬
পে স্কেল শতভাগ বাস্তবায়নসহ সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা চান সরক…
  • ০৪ জুন ২০২৬
রামিসাকে ধর্ষণ-হত্যার আসামির আইনজীবী হওয়ার কারণ জানালেন মুস…
  • ০৪ জুন ২০২৬
ধর্ষণের শিকার কিশোরীর ছবি ফেসবুকে দিলেন ওসি, এসআইকে প্রত্যা…
  • ০৪ জুন ২০২৬