লেগুনায় দুজনের মরদেহ © সংগৃহীত
গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী পূর্ব থানাধীন উত্তর বনমালা এলাকায় ঘটে যাওয়া বাবা ও ছোট ভাই হত্যাকাণ্ডে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনকল, ঘটনাস্থলের আলামত ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে ঘটনাটি এখন একটি সুপরিকল্পিত ও জটিল হত্যাকাণ্ড হিসেবে সামনে আসছে। এ ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বড় ছেলে সোহান (২৮), যাকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত রাতের কোনো এক সময় পরিবারের ঘরের ভেতর। প্রথমে ঘুমন্ত অবস্থায় ছোট ভাই সাকিবকে (১৮) ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তার শরীরে একাধিক গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা পরিকল্পিত হত্যার ইঙ্গিত দেয়। ঘটনার সময় আশপাশে বড় ধরনের কোনো শব্দ না হওয়ায় স্থানীয়রা কিছু বুঝতে পারেননি।
ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয় আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ। ফুটেজে দেখা যায়, বাবা সোহেল রানাকে (৫০) বড় ছেলে সোহান এবং আরও এক ব্যক্তির সঙ্গে রেললাইনের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ওই সময় তিনি জীবিত ছিলেন এবং চলাফেরা করছিলেন, তবে শারীরিকভাবে দুর্বল অবস্থায় ছিলেন বলে ধারণা তদন্তকারীদের।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবাকে রেললাইনের কাছে ফেলে দেওয়ার মতো একটি দৃশ্য ফুটেজে ধরা পড়েছে। কিছু সময় পর রেললাইনের ওপর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ট্রেনের ধাক্কায় মারা গেছেন নাকি পরিকল্পিতভাবে রেললাইনে ফেলে হত্যা করা হয়েছে—তা নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর সোহান ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে না গিয়ে স্বজনদের ফোন দিয়ে হত্যার খবর জানান। তবে তার দেওয়া তথ্য ও ফোনকলের মধ্যে অসংগতি পাওয়া গেছে, যা তদন্তকারীদের সন্দেহ বাড়িয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে সিসিটিভি ফুটেজে আরও এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যাকে স্থানীয়ভাবে “মাদানী আলিফ” নামে শনাক্ত করা হচ্ছে। তবে তার পরিচয় ও ভূমিকা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
ঘটনার পর এলাকায় গুজব ছড়ায়—বাবা নাকি ছেলেকে হত্যা করে আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজে সেই দাবির সত্যতা মেলেনি। বরং তদন্তে ভিন্ন চিত্র উঠে আসছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পরবর্তীতে সন্দেহজনক ভূমিকা ও প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে বড় ছেলে সোহানকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের পর তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (ক্রাইম) মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ডেটা ও ফরেনসিক রিপোর্টসহ সব তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
স্থানীয়দের দাবি, পরিবারটিতে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক অশান্তি, মানসিক চাপ ও নেশাজনিত সমস্যা ছিল। একই রাতে দুইজনের মৃত্যু ও একজনের গ্রেপ্তারে পুরো বনমালা এলাকায় শোক, আতঙ্ক ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, একাধিক ধাপে সংঘটিত এ ঘটনায় ঘটনাপ্রবাহ ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দ্রুত রহস্য উদঘাটনের আশা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এ ঘটনায় এলাকাবাসীর একটাই দাবি, দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।