কে এই মিল্টন সমাদ্দার, কী তার অপরাধ

২৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৫৯ AM , আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৫, ০৪:১০ PM
মিল্টন সমাদ্দার

মিল্টন সমাদ্দার © সংগৃহীত

মানবতার সেবক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেওয়া মিল্টন সমাদ্দারের পাঁচটি ফেসবুক পেজে ফলোয়ার প্রায় ২ কোটি। রাস্তার পাশে প্রতিবন্ধি, ভবঘুরে ও অসুস্থ বৃদ্ধদের খোঁজ পেলেই তাদের উদ্ধারে তিনি দলবল নিয়ে ছুটে যান। সেসব নারী, পুরুষ ও শিশুকে নিয়ে ভিডিও তৈরি করে প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন তিনি। এসব পোস্টে মিল্টন মানুষের অসহায়ত্ব তুলে ধরে তাদের জন্য বিত্তবানদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন।

মিল্টনের হিসাবে, অসহায় মানুষদের জন্য বিত্তবানদের দেওয়া প্রতি মাসে সহায়তা হিসেবে জমা পড়ে গড়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। এসব টাকায় রাজধানীর দক্ষিণ পাইকপাড়ায় গড়ে তুলেছেন ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’। বর্তমানে মিল্টন এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। সেখানে ২০ জনের মতো বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আশ্রিত রয়েছেন বলে জানান তিনি।

আর সাভারে কেনা জমিতে নির্মাণ করেছেন ছয়তলা ভবন। যেখানে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ পুরুষদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে থাকছেন দুইশত পয়তাচল্লিশ জনের মতো।

তবে এটাই মিল্টনের আসল চেহারা নয়। জাতীয় দৈনিকের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মানবিকতার আড়ালে মিল্টন সমাদ্দারের কর্মকাণ্ডের গা শিউরে ওঠার মতো সব তথ্য। যেই প্রতিষ্ঠানের জন্য এত পরিচিতি, সেই আশ্রম ঘিরেই ভয়াবহ প্রতারণার জাল বিস্তার করেছেন মিল্টন।

মিল্টন সমাদ্দারের দেয়া তথ্য যাচাই করতে সাভারের আশ্রমে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সর্বোচ্চ ৫০-৬০ জনের মতো আশ্রিত রয়েছেন। এছাড়া, দুটি শাখায় মোট ৬০ থেকে ৭০ জন কর্মচারী রয়েছেন। তবে বিভিন্ন সময় ফেসবুক লাইভে মিল্টন দাবি করেন, তিনি আশ্রমের দুইটি শাখায় ৮ থেকে ৯শ’ মানুষের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মিল্টন সমাদ্দার এসব কর্মকাণ্ডের আড়ালে অন্যের জমি দখল করছেন। এমনই একজন শামসুদ্দিন চৌধুরী। মিল্টনের সাভারের আশ্রমের পাশের জমির মালিক তিনি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষটির অভিযোগ, বহুদিন ধরে এই জমির দিকে মিল্টনের নজর রয়েছে। ঈদুল ফিতরের আগের দিন পরিবারসহ জমি দেখতে গেলে মিল্টনের সাথে কথা কাটাকাটি হয় তার। একপর্যায়ে মিল্টন আশ্রমের মধ্যে পরিবারের সবাইকে আটকে নির্যাতন করে।

মিল্টন প্রতারণা সম্পর্কে জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার আশ্রমে সব সময় আড়াইশ থেকে তিনশ অসুস্থ রোগী থাকেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে রাস্তায় যারা মারা যান, তাদের দাফন করেন মিল্টন। আবার তার আশ্রমে অবস্থানকালেও অনেকে মারা যান। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০০ মরদেহ দাফন করেছেন বলে মিল্টন দাবি করেন।

তবে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে গিয়ে জানা যায়, মিল্টন সমাদ্দারের প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে সেখানে সব মিলিয়ে ৫০টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ১৫টির মতো মরদেহ দাফনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে আজিমপুর কবরস্থানে ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত কোনো মরদেহের দাফন হয়নি বলে জানান সেখানকার দায়িত্বরতরা।

মিল্টন সমাদ্দারের জন্ম ১৯৮৪ সালে বরিশালের উজিরপুরের গুটিয়া ইউনিয়নের বৈরকাঠী গ্রামে। মিল্টন তার বাবা জন সমাদ্দারের দ্বিতীয় স্ত্রীর একমাত্র সন্তান। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া মিল্টন তিনবেলা ঠিকমতো খাবার পেতেন না। জীবিকার জন্য মানুষের জমিতে কাজ করতেন। ছোটবেলা থেকেই তার ছিল অর্থের মোহ। বিয়ে, ব্যবসা এমনকি ধর্মকেও তিনি ব্যবহার করেছেন নিজের লাভের জন্য।

বাল্যকালের বন্ধু, শিক্ষক, প্রতিবেশী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে নানা প্রতারণার তথ্য। তবে মিল্টন সমাদ্দার অনেক অভিযোগ স্বীকারও করেছেন। জানা গেছে, ছোটবেলায় ছবি আঁকায় পারদর্শী ছিলেন মিল্টন। বরিশালে জেলা পর্যায়ে ছবি এঁকে পুরস্কারও জিতেছেন। স্কুলের শিক্ষক ‘হামিদ স্যার’ তাকে ছবি আকার সরঞ্জাম কিনে দিতেন। তবে টাকা না দিলে স্কুলের পক্ষে কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন না মিল্টন। প্রতিবার পুরস্কার পেলে স্কুলের পক্ষ থেকে তাকে ৫০ টাকা দিতে হতো।

তবে পড়াশোনায় ভালো ছিলেন না কখনো। ছোটবেলা থেকেই আশ্রয় নিয়েছিলেন নানা প্রতারণার। প্রথমবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে গণিতে ফেল করেন। এরপর ২০০১ সালে ফের পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন। ওই বছরই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে পিতা জন সমাদ্দারকে পিটিয়ে আহত করেন। এরপর বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। একটি ওষুধ কোম্পানিতে আড়াই হাজার টাকা বেতনে চাকরি পান মিল্টন। কিছুদিনের মধ্যেই ফার্মেসি কর্মকর্তা এবং হাসপাতালের নার্সদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। এরপর শুরু করেন চুরি।

উজিরপুর এলাকার এক বাসিন্দা জানান, ২০০৫ সালে মিল্টন তার বাবাকে মারধর করে। পরে এলাকা থেকে পালিয়ে সে ঢাকায় বসবাস শুরু করে। এখন দেখা যায় সে মানবতার ফেরিওয়ালা। বিষয়টি আশ্চর্যজনক।

অপরদিকে, মিল্টন সমাদ্দার ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজধানীর দক্ষিণ পাইকপাড়ার বাসিন্দাদের স্পর্শকাতর একটি অভিযোগ রয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, আশ্রমে দুই থেকে তিনদিন পরপরই মানুষ মারা যেতো। পরে গোসলের জন্য তাদের পার্শ্ববর্তী বায়তুস সালাহ মসজিদে নিয়ে যাওয়া হতো। মসজিতে গোসলের কাজে নিয়োজিতরা মরদেহের শরীরের সন্দেহজনক কাটাছেঁড়া দেখতে পান। এতে মসজিদ কর্তৃপক্ষ শরীর থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চুরির সন্দেহ করে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জানান, প্রত্যেকটি মরদেহেই কাটাছেঁড়া থাকে। এ কারণে গোসলের কাজে নিয়োজিত একজন গোসল করাতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে ক্যামেরা বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলে মরদেহ সেখানে পাঠানো বন্ধ করে দেয়া হয়। স্থানীয় আরেকজন জানান, মিল্টন কিছু ছেলেপেলেকে পুষতো। কিছুদিক আগে তার আশ্রমে কবুতর যাওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় দুইজনকে আটকে নির্যাতন করে সে।

দখল ও প্রতারণায় মিল্টন সমাদ্দারের আরও পুরোনো ইতিহাস রয়েছে। নিজ এলাকা বরিশালের উজিরপুরে ‘চন্দ্রকোনা খ্রিষ্টান মিশনারি চার্চ’ নামে একটি চার্চ রয়েছে। এটি দখলের জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সিল-স্বাক্ষর জাল করে চার্চের নতুন কমিটি গঠন করে সে। পরে বরিশাল জেলা প্রশাসককে একটি চিঠিও দেন তিনি। ওই কমিটিতে মিল্টন সমাদ্দারকে সভাপতি করা হয়। কমিটির বাকিরা তার স্ত্রী ও ভাই।

পরে বিষয়টি চার্চের যাজকদের নজরে আসলে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেন তারা। মন্ত্রণালয় থেকে এ ধরনের কোনো চিঠি ইস্যু করা হয়নি বলে তাদের জানানো হয়। যাজকরা জানান, চার্চটিকে দখল করতে তারা ব্যপক চেষ্টা চালায়। শারীরিক ও মানসিকভাবে তাদেরকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলেও জানান তারা।

এসব স্পর্শকাতর নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিটি অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন মিল্টন সমাদ্দার ও তার স্ত্রী। মিল্টন সমাদ্দার বলেন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি করার যে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো কোন হাসপাতালে বিক্রি করা হয়েছে এর প্রমাণ দেখাতে হবে। তার স্ত্রী কিশোর বালা জানান, তিনি জাতীয় হৃদরোগ ইনিস্টিটিউট হাসপাতালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত। এমন পেশায় থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে পারেন না তিনি।

মিল্টন সমাদ্দারের প্রতিষ্ঠান চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ারের অনুমোদন দিয়েছিল সমাজসেবা অধিদফতর। কিন্তু সেখানে সরকারি নিয়মের কিছুই মানা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো ট্রাস্টি বোর্ড করা হয়নি। দান হিসেবে কোটি কোটি টাকা পেলেও কখনোই আয়-ব্যয়ের হিসাবের কোনো অডিট করা হয়নি। এসব অনিয়ম খতিয়ে দেখতে গত ২৫ মার্চ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সমাজসেবা অধিদফতর।

চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার নিয়ে নানা অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে সমাজসেবা অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. আবু সালেহ মোস্তফা কামাল বলেন, সারাদেশে এমন ৬৯ হাজার সংগঠনের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সবকিছু জানা সম্ভব হয় না। তবে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে আমরা খতিয়ে দেখবো।

অনির্দিষ্টকালের বন্ধ সিলেটে সব পেট্রোল পাম্প
  • ০২ এপ্রিল ২০২৬
সংসদ থেকে ওয়াক-আউট, যা বললেন বিরোধীদলীয় নেতা
  • ০২ এপ্রিল ২০২৬
স্বামীর কাছে যাওয়ার আগের দিন ঝুলন্ত অবস্থায় মিলল গৃহবধূর লাশ
  • ০২ এপ্রিল ২০২৬
ব্যক্তি উদ্যোগে মহাসড়ক থেকে ময়লার স্তুপ অপসারণ
  • ০২ এপ্রিল ২০২৬
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি অফিস সূচি পরিবর্তনের বিজ্ঞপ্তিটি ভু…
  • ০২ এপ্রিল ২০২৬
দেশের ৯ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়-বৃষ্টির আভাস
  • ০২ এপ্রিল ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence