বাংলাদেশ ক্রিকেট দল © সৌজন্যে প্রাপ্ত
নাহিদ রানার গতির ঝড় আর সফরকারী ব্যাটারদের আসা-যাওয়ার মিছিলে সন্ধ্যা থেকেই জয়ের সুবাস পাচ্ছিল বাংলাদেশ। তবে লাল-সবুজের সেই আনন্দ-উল্লাসে বাধা হয়ে দাঁড়ায় 'বজ্রপাত'। প্রাকৃতিক এই নিয়ামকের কারণে দীর্ঘক্ষণ পিছিয়ে যায় বাংলাদেশের বহুল প্রতীক্ষিত 'অস্ট্রেলিয়া বধ'।
যদিও প্রতিটি মুহূর্তে জমে উঠেছে ইতিহাস লেখার প্রস্তুতি। অবশেষে বৃষ্টি বাগড়া পেরিয়েই পর্দা নামে দীর্ঘ প্রতীক্ষার! ২১ বছরের অপেক্ষা আর ১৫ ম্যাচের হতাশা পেরিয়ে অবশেষে ওয়ানডে ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার মতো পরাশক্তিকে ফের পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ দিলো লাল-সবুজেরা।
মঙ্গলবার (৯ জুন) মিরপুর শের-ই-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৮৪ রানের সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ। জবাবে বৃষ্টি-আইনে অজিদের ৮৬ রানে হারায় স্বাগতিকেরা। এই জয়ে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল স্বাগতিকরা।
লক্ষ্য তাড়ায় নেমে শুরুতেই চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। ইনিংসের প্রথম বলেই অস্ট্রেলিয়ার স্ট্যাম্প ভেঙে দেন তাসকিন আহমেদ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভাঙে ওপেনার ম্যাথু স্কটের স্ট্যাম্প। শূন্য রানে সাজঘরে ফেরেন স্কট।
তাসকিনের পর আঘাত হানেন মুস্তাফিজুর রহমানও। দ্বিতীয় ওভারে দ্বিতীয় বলে মুস্তাফিজ লেগ বিফোর করেন মার্নাস লাবুশেনকে। আম্পায়ার অবশ্য প্রথমে সাড়া দেন। রিভিউ নিয়ে উইকেট আদায় করে স্বাগতিকরা।
সেই ধাক্কা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন জশ ইংলিস ও কুপার কনোলি। কিন্তু রানার গতিতে ভেঙে যায় তাদের জুটি। ১১তম ওভারের প্রথম বলেই ইংলিসকে ফিরিয়ে দেন এই পেসার। ২৫ বলে ১৯ রান করেন অজি অধিনায়ক।
মাঝে ৪ বছর পর দলে ফেরা মোসাদ্দেকের ওপর আস্থা রেখেছিলেন অধিনায়ক মিরাজ। এই অলরাউন্ডারও অধিনায়ককে নিরাশ করেননি। ব্যাট হাতে ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস খেলার পর বল হাতেও নিজের দ্বিতীয় ওভারেই উইকেট তুলে নেন। থিতু হয়ে যাওয়া কলোনিকে বোল্ড করেন তিনি। সাজঘরে ফেরার আগে কলোনির ব্যাট থেকে ৫০ বলে ৩৫ রান এসেছিল।
এরপরে গুরুত্বপূর্ণ সময়েও ব্রেকথ্রু এনে দেন নাহিদ। তার দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে প্যাভিলিয়নে ফেরেন ৪৭ রান করা অ্যালেক্স ক্যারি। মোসাদ্দেকের টার্ন করা ডেলিভারিতে ম্যাট রেনশও টিকতে পারেননি। অফে খেলতে চেয়েছিলেন রেনশ। কিন্তু বলের লাইনে যেতে পারেননি তিনি। জোরাল আবেদনে সাড়া দেন আম্পায়ার। রিভিউয়ের কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত নেননি রেনশ। ৪ বলে তিনি করেন ২ রান।
নাহিদের বাউন্সারে অভিষিক্ত লিয়াম স্কটও টিকতে পারেননি। ১৪৬ কিলোমিটার গতির বলে গালিতে হৃদয়র হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি। ৪ বলে ২ রান করেন স্কট। এই পেসারের ১৪৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার গতির বাউন্সারে ১ রান করে আউট হন বার্টলেটও।
প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে ব্যাট হাতে দারুণ পারফরম্যান্স, বল হাতেও কার্যকর ভূমিকার পর ফিল্ডিংয়েও উজ্জ্বল হয়ে উঠেন মোসাদ্দেক। তার অসাধারণ ক্যাচে জয়ের আরও কাছে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ।
মুস্তাফিজুরের অফ-কাটার ডেলিভারিতে কাভার দিয়ে শট খেলতে গিয়েছিলেন ন্যাথান এলিস। তবে টাইমিং ঠিকমতো করতে না পারায় মিড-অফ থেকে সীমানার দিকে দৌড়ে গিয়ে কাঁধের উপর দিয়ে দুর্দান্ত ক্যাচটি তালুবন্দি করেন মোসাদ্দেক। ১৫ বলে মাত্র ৮ রান করেন এই ব্যাটার।
এরপর কেবলই উদযাপনের অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ শিবির। কিন্তু স্বাগতিকদের জয়ের অপেক্ষা বাড়ায় বজ্রপাত। প্রাকৃতিক এই নিয়ামকের বাধায় ৩০ মিনিট ধমকে যায় খেলা। শেষমেষ আর কোনো বল মাঠে না গড়ালে বৃষ্টি-আইনে ৮৬ রানের জয় পায় বাংলাদেশ।
এর আগে, ব্যাটিংয়ে নেমে ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। নাথান এলিসের করা ওই ওভারের দ্বিতীয় বলটি ছিল অফ স্টাম্পের কাছাকাছি ফুল লেংথ ডেলিভারি, যা পিচে পড়ার পর হঠাৎ বাইরে সরে যায়। ড্রাইভ করতে গিয়ে সাইফের ব্যাটের কানায় লেগে বল উঠে যায় স্লিপে। সেখানে ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দারুণ এক ক্যাচ নেন লাবুশেন।
দ্রুত উইকেট হারালেও তানজিদ তামিমকে সঙ্গে নিয়ে দলের হাল ধরেছিলেন শান্ত। দুজনে মিলে গড়ে তোলেন ৯০’র বেশি রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। পরে তানজিদ ফিফটি তুলে নিলেও ইনিংস বড় করতে পারেননি, ৫৪ রান করেই ফেরেন।
তানজিদের বিদায়ের পর লিটন দাসকে নিয়ে ইনিংস এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন শান্ত। এরই মাঝে নিজের ফিফটি পূর্ণ করেন তিনি। তবে লিটন বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ম্যাট রেনশর বলে উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে এসে বড় শট খেলতে গিয়ে ব্যর্থ হন। ফলো থ্রুতে সহজ ক্যাচ নেন রেনশ, ৯ বলে ৭ রান করে আউট হন লিটন।
লিটনের বিদায়ের পর কিছুটা চাপের মধ্যেই খেলছিলেন নাজমুল। শেষপর্যন্ত তিনিও সাজঘরের পথ ধরেন, ফেরার আগে তার ব্যাট থেকে ৬৭ রান এসেছিল।
মাঝে তাওহীদ হৃদয়ের নড়বড়ে ইনিংসও বেশিদূর এগোয়নি। দীর্ঘ সময় ক্রিজে থাকলেও তিনি স্বস্তিতে ছিলেন না এই মিডল-অর্ডার ব্যাটসম্যান; শুরু থেকেই টাইমিং খুঁজে পেতে ভুগছিলেন।
জেভিয়ার বার্টলেটের আগের বলে অল্পের জন্য ক্যাচ না হলেও, পরের বলেই স্লোয়ার ডেলিভারিতে তেড়েফুঁড়ে খেলতে গিয়ে নাথান এলিসের হাতে ধরা পড়েন হৃদয়। ভোগান্তির এই ইনিংসে ৫১ বলে ১ চারসহ ৩১ রান করেন হৃদয়।
এরপর বেশি সময় টিকতে পারেননি মেহেদী হাসান মিরাজও। পরের বলেই শাফল করে লেগ সাইডে খেলার চেষ্টায় এলবিডব্লিউ হন তিনি। আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের পর রিভিউ নিলেও ফল বদলায়নি। ১২ বল খেলে মাত্র ৩ রান করে ফিরতে হয় তাকে।
তবে সতীর্থদের আসা-যাওয়ার মিছিলেই চার বছর পর ওয়ানডে দলে ফিরেই অপরাজিত ৮৬ রানের ইনিংস খেলেন মোসাদ্দেক। ৩ ছক্কা ও ৭ চারে ৭০ বলে ওয়ানডেতে তার ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস এটি। এ ছাড়া ইনিংসের শেষ বলে আউট হন ১৬ বলে ২০ রান করা তাসকিন। তাদের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়েই শেষ ১০ ওভারে ৭১ রানের সুবাদে লড়াকু পুঁজি পায় বাংলাদেশ।