জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী পিঠালি, শত বছরের স্বাদে আজও জমে ওঠে উৎসবের আয়োজন

১৮ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫২ AM , আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:০২ AM
পিঠালি

পিঠালি © টিডিসি ফটো

জামালপুরে আকিকা, চল্লিশা কিংবা বড় কোনো পারিবারিক আয়োজন মানেই খাবারের তালিকায় পিঠালি। মাংস, চালের গুঁড়া আর নানা মসলায় তৈরি ঘন ও আঠালো এই খাবার স্থানীয়দের কাছে ম্যান্দা বা মিল্লি নামেও পরিচিত। শত বছরের বেশি সময় ধরে জামালপুরের মানুষের রসনা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকা পিঠালি এখন ঘরের আয়োজন পেরিয়ে জায়গা করে নিয়েছে শহরের বিভিন্ন রেস্তোরাঁর মেনুতেও।

স্থানীয়দের মতে, শত বছরের বেশি সময় ধরে গ্রাম কিংবা শহরের বড় আয়োজনে এই খাবার রান্না হয়ে আসছে। বিশেষ করে আকিকা, খতনা, চল্লিশা ও বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানে সাদা ভাতের সঙ্গে পিঠালি পরিবেশনের প্রচলন রয়েছে। তবে পিঠালি প্রতিদিনের খাবার নয়; বড় কোনো আয়োজন হলেই এর চাহিদা বাড়ে।

হালিমের মতো দেখতে, স্বাদে আলাদা
দেখতে অনেকটা হালিমের মতো হলেও পিঠালির স্বাদ ও ঘনত্ব একেবারেই আলাদা। হালিমের তুলনায় এটি বেশি ঘন ও আঠালো। সাধারণত গরুর মাংস ও চালের গুঁড়া দিয়ে পিঠালি তৈরি করা হয়। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, আদি পিঠালিতে মহিষের মাংস ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে অনেকে খাসির মাংস দিয়েও পিঠালি রান্না করেন।

মাংস ও চালের গুঁড়ার সঙ্গে ব্যবহার করা হয় পেঁয়াজ, রসুন, আদা, কাঁচা ও শুকনা মরিচ, জিরা, এলাচ, ধনে, গোলমরিচ, জয়ত্রীসহ নানা ধরনের মসলা। মাংস দীর্ঘ সময় সেদ্ধ ও মসলা কষানোর পর শেষে চালের গুঁড়া যোগ করা হয়। এতেই তৈরি হয় ঘন, আঠালো ও মসলাদার পিঠালি।

পিঠালি রান্না হলেই যেন উৎসব
জামালপুরের মানুষ প্রতিদিনের খাবারে ভাত, মাছ, মাংস, ডাল ও সবজিতে অভ্যস্ত। তবে কোনো বাড়িতে পিঠালি রান্নার আয়োজন হলে সেখানে যেন আলাদা উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। বড় হাঁড়িতে মাংস ও মসলার সঙ্গে চালের গুঁড়া মিশিয়ে রান্না করা এই খাবারের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাড়িতে।

জামালপুর শহরের পুরোনো পিঠালি বাবুর্চিদের একজন সুহেল রানা। শহরের উপজেলা পরিষদের পাশে তার একটি রেস্তোরাঁ রয়েছে। প্রায় ২০ বছর ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও আয়োজনে পিঠালি রান্না করছেন তিনি। বাবা মন্তাজ আলীর কাছ থেকেই পিঠালি রান্নার কৌশল শিখেছেন সুহেল।

কীভাবে এল পিঠালি?
ঠিক কবে থেকে জামালপুরের মানুষের সঙ্গে পিঠালির সখ্য গড়ে উঠেছে, তার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে স্থানীয়দের দাবি, শত বছরের বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলের মানুষ পিঠালির ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। স্বাধীনতার আগেও গ্রামের বৈঠক, সামাজিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন পারিবারিক আয়োজনে পিঠালি পরিবেশন করা হতো।

ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কারও মৃত্যুর ৪০ দিন পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান, স্থানীয়ভাবে যাকে ‘চল্লিশা’ বা ‘বেপার’ বলা হয়, সেখানেও পিঠালির আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া আকিকা, খতনা ও অন্যান্য পারিবারিক অনুষ্ঠানেও পিঠালি রান্না করা হয়।

অনেক পরিবার নিজেদের বাড়িতে ছোটখাটো আয়োজনেও এই খাবার রান্না করে আত্মীয়-স্বজন ও অতিথিদের আপ্যায়ন করেন। ফলে পিঠালি এখন শুধু একটি খাবার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জামালপুরের মানুষের পারিবারিক স্মৃতি, আতিথেয়তা ও স্থানীয় সংস্কৃতি।

ম্যান্দা, পিঠালি না মিল্লি?
জামালপুরের বিভিন্ন এলাকায় খাবারটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। কোথাও বলা হয় পিঠালি, কোথাও ম্যান্দা, আবার কোথাও মিল্লি। নামের ভিন্নতা থাকলেও রান্নার ধরন ও উপকরণে রয়েছে বেশ মিল।

স্থানীয়দের কাছে নামের চেয়ে এর ঐতিহ্য ও স্বাদই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বড় কোনো আয়োজনের রান্নাঘরে পিঠালির হাঁড়ি বসলে সেটিকে ঘিরে বাড়ির মানুষের মধ্যেও তৈরি হয় আলাদা ব্যস্ততা ও আনন্দ।

যেভাবে রান্না হয় পিঠালি
ষাটোর্ধ আয়েশা বেগমের মতে, পিঠালি রান্না খুব কঠিন নয়। তবে সব উপকরণ ঠিকঠাক ব্যবহার করা এবং রান্নায় পর্যাপ্ত সময় দেওয়া জরুরি।

তিনি জানান, কিভাবে নানা দশীয় উপকরণ দিয়ে স্বুসাদু পিঠালি হয়ে উঠে। 

প্রথমে মাংসের টুকরাগুলো একটু বড় করে কেটে ভালোভাবে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিতে হয়। এরপর মাংসের সঙ্গে হলুদ, মরিচ, ভাজা জিরা, লবণ, রসুনবাটা ও আদাবাটা মেশানো হয়। শর্ষের তেল বা সয়াবিন তেল দিয়ে মাংস ও মসলা ভালোভাবে মেখে প্রায় আধা ঘণ্টা রেখে দেওয়া হয়।

এরপর চুলায় হাঁড়ি বসিয়ে মসলা মাখানো মাংস দিয়ে পরিমাণমতো পানি দিতে হয়। প্রায় ৩০ মিনিট জ্বাল দেওয়ার পর পানি কিছুটা শুকিয়ে এলে আবার গরম পানি দিয়ে মাংস সেদ্ধ করতে হয়।

মাংস সেদ্ধ হওয়ার সময় পেঁয়াজকুচি ও গরম মসলার গুঁড়া দেওয়া হয়। এরপর এলাচ, ধনে, গোলমরিচ, জয়ত্রীসহ প্রয়োজনীয় মসলা দিয়ে মাংস ভালোভাবে কষানো হয়। আবার কিছুটা গরম পানি দিয়ে হাঁড়ি ঢেকে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট রান্না করতে হয়।

রান্নার শেষ ধাপে যোগ করা হয় চালের গুঁড়া। পাঁচ থেকে সাত মিনিট ভালোভাবে নাড়াচাড়া করলেই তৈরি হয়ে যায় ঘন ও আঠালো পিঠালি।

কেমন লাগে পিঠালি
পিঠালির স্বাদ অনেকটাই নির্ভর করে মাংস, মসলা ও চালের গুঁড়ার সঠিক মিশ্রণ এবং রান্নার সময়ের ওপর। গরম সাদা ভাতের সঙ্গে ঘন পিঠালি পরিবেশন করলে নরম মাংস, মসলার ঘ্রাণ ও চালের গুঁড়ার আঠালো ভাব মিলে তৈরি হয় আলাদা স্বাদ। বিশেষ করে যারা ছোটবেলা থেকে পারিবারিক আয়োজনে পিঠালি খেয়ে আসছেন, তাঁদের কাছে খাবারটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আলাদা আবেগ।

আরও দেখুন: গায়ে হলুদে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ ৫

রেস্তোরাঁয়ও মিলছে ঐতিহ্যের স্বাদ
চাহিদা থাকায় জামালপুর শহরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার রেস্তোরাঁয় এখন পিঠালি বা ম্যান্দা বিক্রি হচ্ছে। শহরের উপজেলা পরিষদসংলগ্ন হোটেল নূর জাহান, হোটেল ফিরোজ মিয়া, কথাকলি মার্কেট এলাকার হোটেল ভর্তা ভাই এবং আজাদ ডাক্তার মোড় এলাকার হোটেল খালেকে পিঠালি পাওয়া যায়।

এ ছাড়া শহরের গেটপার, ফৌজদারি ও বাইপাস এলাকার বেশ কয়েকটি খাবারের দোকানেও পিঠালি বা ম্যান্দা বিক্রি হয়।

যা বলছেন স্থানীয়রা
জামালপুরের প্রবীণ নারী আফরোজা বেগম বলেন, ‘আমাদের ছোটবেলা থেকেই পিঠালি দেখে আসছি। আগে কোনো বাড়িতে বড় আয়োজন হলে পিঠালি রান্না হতো। আকিকা, চল্লিশা কিংবা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে পিঠালি ছাড়া আয়োজন যেন পূর্ণ হতো না। এখন অনেক খাবার এসেছে, কিন্তু পিঠালির সেই স্বাদ ও ঐতিহ্য এখনো আছে।’

জামালপুর শহরের বাসিন্দা সাইমুম সাব্বির শোভন বলেন, ‘পিঠালির স্বাদ অন্য খাবারের চেয়ে আলাদা। মাংসটা খুব নরম থাকে, মসলার ঘ্রাণও ভালোভাবে পাওয়া যায়। গরম ভাতের সঙ্গে পিঠালি খেতে বেশ ভালো লাগে। ছোটবেলা থেকে বাড়ির বিভিন্ন আয়োজনে খেয়ে আসছি, তাই এর সঙ্গে একটা আলাদা আবেগও জড়িয়ে আছে।’

জামালপুর জিআই পণ্য বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘পিঠালি জামালপুরের মানুষের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এর নিজস্ব স্বাদ, রান্নার ধরন ও স্থানীয় পরিচিতি রয়েছে। তাই পিঠালিকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিলে ভবিষ্যতে এটি জিআই স্বীকৃতি পেতে পারে বলে আশা করা যায়।’

জামালপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলী বলেন, ‘ইতোমধ্যে মিল্লি ভাতকে জিআই পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট তৈরি করা হচ্ছে। ডকুমেন্টটি শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে হবে। আমরা আশা করছি, খুব দ্রুতই মিল্লি ভাত জিআই পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে।’

টেকনাফে মানবপাচারকারীদের গোপন আস্তানা ধ্বংস করল যৌথবাহিনী
  • ০৮ নভেম্বর ২০২৬
শেকৃবির গেটে ককটেল বিস্ফোরণ
  • ০৮ নভেম্বর ২০২৬
বনানীর সেতু ভবনের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ
  • ০৮ নভেম্বর ২০২৬
কুয়াকাটায় ঘুরতে গিয়ে প্রাণ হারালেন সলিমুল্লাহ মেডিকেলের চিক…
  • ০৮ নভেম্বর ২০২৬
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে গ্যাস লিকেজ থেকে আগুন, আহত শিক্ষার…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
‎জাবিতে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে,…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950