দেশে হঠাৎ শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ বাড়ছে কেন?

২৯ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪২ PM , আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪৩ PM
শিশুকে হামের ভ্যাক্সিন দেওয়া হচ্ছে

শিশুকে হামের ভ্যাক্সিন দেওয়া হচ্ছে © সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকাসহ বেশ কিছু জেলায় হঠাৎ করেই শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি শিশু মারাও গিয়েছে। দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুরা এই রোগের টিকা পাওয়ার পরেও কেন এই সময় আবার রোগটির প্রবণতা বাড়ছে, সেই আলোচনা জোরদার হচ্ছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, টিকা দেওয়ার পরেও অনেক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগের। কারণ ব্যাপক ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত এই রোগটি আক্রান্ত শিশুর জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। তবে এবার আক্রান্ত রোগীদের উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং তাতে তারা সুস্থ হচ্ছেন বলেও বলছেন তারা।

পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় ছয়শো কোটি টাকা নতুন করে টিকার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে রোববার এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি অভিযোগ করেছেন, গত আট বছর অতি সংক্রামক এ রোগটির টিকা না দেওয়ার কারণেই এখন হামের প্রকোপ আবার দেখা যাচ্ছে।

ওদিকে, স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, তারা আগামী জুলাই-অগাস্টে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশজুড়ে শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন চলে আসছে। আরও যা যা লাগবে সেটি টিকার জন্য গঠিত বৈশ্বিক জোট গ্যাভিকে অবহিত করা হয়েছে। তারা মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ২ কোটি সিরিঞ্জ দিবে। সবকিছু একত্রিত হলেই আমরা ক্যাম্পেইন (বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি) শুরু করব।

কেন বাড়ছে হামের রোগী?
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা ও শিশু চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত পর্যাপ্ত টিকা না দেওয়া, শিশুদের মায়ের বুক দুধ ঠিকমতো পান না করানো, প্রয়োজনীয় কৃমিনাশক ঔষধ না খাওয়ানো এবং অপুষ্টির কারণেই নতুন করে হামের এই প্রকোপ শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এছাড়া হামের জন্য যে টিকা দেওয়া হচ্ছে সেই টিকার মান এবং দীর্ঘদিন ধরে টিকা দেওয়ার কারণে ভাইরাসের ধরণে কোনো পরিবর্তন নতুন করে হামের প্রকোপে ভূমিকা রেখেছে কি-না সেই প্রশ্নও উঠছে।

ময়মনসিংহে আরও দুটি শিশুর হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় হাসপাতালগুলোয় হাম সন্দেহে ভর্তির ভিড় বাড়ছে। মার্চ মাস জুড়ে এখন পর্যন্ত সারাদেশে হামের কারণে অন্তত ২০টি শিশুর মৃত্যুর তথ্য এসেছে দেশের সংবাদ মাধ্যমে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক আরও বলেন, সাধারণত ৯ মাস পূর্ণ হলে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা পায় শিশুরা। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে যারা আক্রান্ত তাদের ৩৩ ভাগ এই বয়সের আগেই আক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ ৯ মাসের কম বয়সীদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ বাড়ছে।  

সাধারণত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৯-১৫ বয়সী শিশুদের হামের দুটি টিকা দেওয়া হলেও এর অতিরিক্ত হিসেবে প্রতি চার বছর পরপর হামের টিকা দেওয়ার যে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়, ২০২৪ সালে তা হয়নি।

এ বিষয়ে শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ২০২০ সালে করোনা, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে হামের টিকাদানের বিশেষ ক্যাম্পেইন হয়নি এবং এরপর চলতি বছরের এপ্রিলে করার কথা থাকলেও সেটি হয়নি। 

চলতি বছরের শুরু থেকেই এই রোগটির প্রকোপের সম্ভাবনা প্রকাশ পাচ্ছিল। বিশেষ করে জানুয়ারির শুরুতে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও ঢাকার কিছু বস্তিতে রোগটিতে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছিল।

এরপর চলতি মাসেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভেন্টিলেশনসহ আইসিইউ সুবিধার অভাবে ৩৩টি শিশুর মৃত্যুর খবর দেশের সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হবার পর এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। যদিও এদের ১০ থেকে ১২টি শিশু হামে আক্রান্ত ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় চলতি মাসে রাজশাহী বিভাগের ১৫৩টি রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে ৪৪ জনের হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও পাবনায় সংক্রমণ হচ্ছে বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা.  একেএম শাহাব উদ্দীন বলেন, এর আগে ১৬ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমরা ২০ জন রোগীর নমুনা ঢাকায় পাঠিয়েছিলাম। তার মধ্যে ১০জনই হামে আক্রান্ত রোগী বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। জেলার সব উপজেলাতেই শিশুদের হামে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে এবং অনেকে চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠছেন।

ঢাকার শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি কারণ রোগটিতে আক্রান্ত হলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং সে কারণে নিউমোনিয়ায় ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়।

গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাজশাহীতে অন্তত ৮০ জনকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ চিকিৎসকরা করলেও সবাইকে সেই সুবিধা দেওয়া যায়নি। আবার আইসিইউতে নেওয়ার পরেও মারা গেছে ৯ জন।

ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চলতি বছরের শুরু থেকে চারশোর বেশি রোগী হাম সন্দেহে ভর্তি হয়েছে, যাদের অধিকাংশের হাম শনাক্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছেন সেখানকার একজন কর্মকর্তা। ঢাকার এই হাসপাতালটিতে হাম, বসন্ত, ধনুষ্টংকার, কালাজ্বর ও জলাতঙ্ক রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু গবেষণায় তারা দেখতে পাচ্ছিলেন যে নয় মাস বয়সের আগেই শিশুরা হাম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

অথচ সম্প্রসারিত টিকাদান বা ইপিআই কর্মসূচিতে শিশুদের প্রথম এই টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে। সে কারণে অনেকে হামের টিকার সময়সীমা এগিয়ে আনার পক্ষে মত দিচ্ছেন।

আবার এতদিন ধরে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত যে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছিল, তার মান ঠিক আছে কি-না তা নিয়েও উদ্বেগ আছে অনেকের মধ্যে।

শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে বলছেন, ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা যায়। আর একজন হাম আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে আরও অন্তত ১৮ জন সংক্রমিত হতে পারে। এর প্রথম পর্যায়ে অনেক জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল ও আলো সহ্য করতে না পারা (চোখ ওঠা)র মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এটি একটি ভাইরাল ও খুবই ছোঁয়াচে রোগ। এতে আক্রান্ত হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। তখন শিশু নিউমোনিয়া ও লুজ মোশনে আক্রান্ত হতে পারে। আবার এসব হলে পুষ্টিহীনতা দেখা দেয়। সব মিলিয়ে শিশুর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে এই রোগ।

চিকিৎসকদের মতে, বেশির ভাগ সময় হামে আক্রান্ত শিশুকে হাসপাতালে আলাদা ব্যবস্থাপনায় রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। তবে রোগটিকে প্রতিরোধযোগ্য উল্লেখ করে সঞ্জয় কুমার দে বলেন, সময়মত টিকা নিলে এ রোগ থেকে শিশুকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।

পরিস্থিতি সামাল দিতে কী করা হচ্ছে?
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে এবং এরপর ভ্যাকসিন কোনো গভর্নমেন্ট দেয়নি। গত ১৫ দিনে হামের প্রবণতা বেড়েছে। তবে এখনো আমাদের সক্ষমতা রয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ডিএনসিসি হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা কর্নার করা হয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসিইউ রেডি করা হয়েছে, উইথ ভেন্টিলেটর।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) আবু হোসেইন মো. মইনুল আহসান বলেন, সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকায় বেশি আক্রান্ত হলেও কমবেশি সারাদেশেই হামে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাচ্ছেন তারা। বড় দশটি মেডিকেল কলেজে আলাদা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। সব আইসিউতে এসব রুগীকে চিকিৎসা দেওয়া যায় না। তাই আলাদা করে আইসিউর ব্যবস্থা করা হচ্ছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে।

ট্যাগ: হাম
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ফার্মাসিস্ট ফোরামের নতুন কমিটি
  • ১১ মে ২০২৬
বিকেলে মোটরসাইকেল কিনে সন্ধ্যায় দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল স্কুলছা…
  • ১১ মে ২০২৬
এসএসসির ভূগোল ও পরিবেশ পরীক্ষার প্রশ্ন দেখুন এখানে
  • ১১ মে ২০২৬
দেশে বেশ কিছু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় আসছে: শিক্ষামন্ত্রী
  • ১১ মে ২০২৬
পবিপ্রবিতে ভিসিবিরোধী আন্দোলনকারী বিএনপিপন্থীদের ওপর আরেক অ…
  • ১১ মে ২০২৬
প্রো-ভিসি পদে বহিরাগত নয়- জাতীয়তাবাদী আদর্শের কাউকে চায় গাক…
  • ১১ মে ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SUMMER 2026
Application Deadline Wednesday, May 13, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9