বনরুই © সংগৃহীত
সত্তরের দশকে বাংলাদেশে তিন ধরনের বনরুইয়ের অস্তিত্ব ছিল। এর মধ্যে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়েছে এশীয় বৃহৎ বনরুই। চায়না বনরুইও বিলুপ্তপ্রায়। একমাত্র টিকে আছে ভারতীয় বনরুই; তাও হরহামেশা দেখা মেলে না। বর্তমানে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে দুটি পয়েন্টে অবাধে বিচরণ করছে মহাবিপন্ন এই প্রাণী। নিশাচর হওয়ায় দিনের বেলায় নিজের খোঁড়া ৮ থেকে ১০ ফুট মাটির গভীর গর্তে বসবাস করে বনরুই। সন্ধ্যা নামতেই গর্ত থেকে বেরিয়ে খাবারের খোঁজে বনে বিচরণ করে।
বনরুইয়ের ইংরেজি নাম ‘Pangolin’। দাঁত নেই বলে আগে দন্তহীন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দলে অন্তর্ভুক্ত ছিল এরা। তবে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে বর্তমানে এদের আলাদা একটি দল ফোলিডাটার (Pholidata) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাধারণত বনরুইয়ের মাথাসহ শরীরের দৈর্ঘ্য ৬০ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার ও লেজ ৪৫ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। বুক ও পেটে আঁশের ফাঁকে ফাঁকে সামান্য লোম দেখা যায়। নাক সরু ও চোখা। জিহ্বা লম্বা ও আঠালো। চোখ-কান সরু। সামনের নখরগুলো পেছনের নখরের তুলনায় দ্বিগুণ লম্বা। শরীর নিচু; প্রায় মাটি-ছোঁয়া। পিঠ, পাশ, হাত-পায়ের উপরদিক ও গোটা লেজ বড় বড় ত্রিকোণ শক্ত আঁশে ঢাকা। নিচের চামড়া থেকে আঁশ গজায় এবং বুকের দিক ছাড়া গোটা শরীর রক্ষা করে। আঁশ একেকটি করে ঝরে পড়ে ও নতুন করে গজায়।
২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর পার্বত্যাঞ্চলের বিভিন্ন বনাঞ্চলে ক্যামেরা ট্র্যাপিং করে ১৯ ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণীর সন্ধান পায় ‘প্যাঙ্গলিন ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড কনজারভেশন ইন বাংলাদেশ’ নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তাদের গবেষণায় পাবর্ত্যাঞ্চলে কোনো বনরুইয়ের দেখা মেলেনি। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) বনরুইকে লাল তালিকায় স্থান দিয়েছে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত আইইউসিএন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত ‘রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ’ চায়না বনরুই ও ভারতীয় বনরুইকে বাংলাদেশের জন্য ‘মহাবিপন্ন’ ঘোষণা করে। দেশে ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী আইনে বনরুইকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি-খাগড়াছড়ির রামগড়ের ১ হাজার ১৭৭ দশমিক ৫৩ হেক্টর জমিতে অবস্থিত। চট্টগ্রাম শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে ফটিকছড়ি দিয়ে এ বনাঞ্চলে যাওয়া যায়। ২০১০ সালের ৬ এপ্রিল এটিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়।
হাজারিখিল অভয়ারণ্যের রেঞ্জ অফিসার সিকদার আতিকুর রহমান বলেন, অভয়ারণ্যটি দেশের বন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বর্তমানে এক বিরল পাহাড়ি অঞ্চল। বাংলাদেশের মধ্যে এখন একমাত্র এই বনেই মহাবিপন্ন বনরুইয়ের দেখা মেলে। অভয়ারণ্যের কালাপানি ছড়া পয়েন্ট ও তার পাশের পাহাড়– এ দুটি পয়েন্টে সন্ধ্যার পর বনরুই অবাধে বিচরণ করে।
পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী বলেন, হাজারিখিল অভয়ারণ্য এখন বন্য জীব সংরক্ষণে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখানে ১৫০ প্রজাতির পাখি, ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৫ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী নিরাপদে বাস করছে। উদ্ভিদ রয়েছে ২৫০ প্রজাতির। জীব ও বৈচিত্র্য সংরক্ষণে হাজারিখিল এখন আমাদের অন্যতম জাতীয় সম্পদ।