মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি

৫ কোটির স্থলে সরকারের আশ্বাস ২০ লাখ, কার্যকর হয়নি সেটাও—হাইকোর্টের নির্দেশনাও উপেক্ষিত

২১ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৪ PM , আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৫ PM
মাইলস্টোন কলেজ ট্র্যাজেডি

মাইলস্টোন কলেজ ট্র্যাজেডি © টিডিসি সম্পাদিত

রাজধানীর মাইলস্টোন কলেজ ট্র্যাজেডিতে ৩৫ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশে-বিদেশে তোলপাড় শুরু হয়। সে সময় নিহত ও আহতদের পরিবারকে আর্থিক সুবিধাসহ সরকারি আশ্বাস এবং প্রশাসনিক নানা ঘোষণাও আসে। তবে এর বেশিরভাগই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। তাদের দাবি, ক্ষতিপূরণ, ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও স্মরণীয় করে রাখার মতো একাধিক ঘোষণা দেওয়া হলেও প্রায় এক বছর পরও সেগুলোর বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

শুরুতে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ৫ কোটি টাকা এবং আহতদের প্রত্যেককে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। তবে সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের ২০ লাখ এবং আহতদের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। যদিও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এরইমধ্যে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও গাফিলতির অভিযোগ তুলে জরিমানাসহ ৯ দফা দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করায় সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার নোটিশও দেওয়া হয়েছে।

গত বছরের ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এতে পাইলট, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও কর্মচারীসহ ৩৫ জন নিহত হন। আহত হন ১৭২ জনের মতো। তাদের অনেকেই গুরুতর দগ্ধ হন।

‘২২ জুলাই হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়েছিল। সেটি জনস্বার্থে করা রিট। সেখানে নিহতদের পরিবারকে ৫ কোটি টাকা এবং আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছিলেন। এই ৫ কোটি টাকা দেওয়ার দাবি আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে করা হয়নি। আমরা পরে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেভাবে কোনো সাড়া পাইনি’-আশরাফুল ইসলাম, মাইলস্টোনে নিহত নাজিয়া ও নাফির বাবা

বিমান বিধ্বস্তের পরদিন, ২২ জুলাই সকালে ছয় দফা দাবিতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে বিক্ষোভে নামেন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, যুদ্ধ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় হতাহতের নাম-পরিচয় প্রকাশ, ক্ষতিপূরণ, সেনা সদস্যদের নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা, নিহতেদের শহীদি মর্যাদা, মাইলস্টোনের পাশে একটি মডেল মসজিদ নির্মাণ। 

বেলা ১১টার দিকে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ঘটনাস্থলে গেলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন। পরে কলেজের কনফারেন্স কক্ষে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন তারা। বৈঠক শেষে আসিফ নজরুল শিক্ষার্থীদের সব দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন এবং সরকারও দাবিগুলোকে যৌক্তিক বলে জানায়। 

এসব আশ্বাসের এক বছর পরও এখনও বাস্তবায়ন হয়নি তৎকালীন সরকারের দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতিগুলো। এ ঘটনায় মাইলস্টোনে নিহত নাজিয়া ও নাফির বাবা আশরাফুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘২২ জুলাই হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়েছিল। সেটি জনস্বার্থে করা রিট। সেখানে নিহতদের পরিবারকে ৫ কোটি টাকা এবং আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘এই ৫ কোটি টাকা দেওয়ার দাবি আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে করা হয়নি। জনগণের পক্ষ থেকেই এ দাবি করা হয়েছিল। হাইকোর্ট রুল জারি করার পর মামলাটি সেভাবেই আছে। পরবর্তী শুনানির জন্য রিটকারী পক্ষও আর সেভাবে এগোয়নি। আদালত থেকেও এ বিষয়ে পরবর্তী কোনো নির্দেশনা আসেনি। আমরা পরে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেভাবে কোনো সাড়া পাইনি।’

আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘এ ছাড়া আরও কিছু দাবি ছিল। এসব দাবি মূলত আমরা নিহতদের পরিবার থেকে করিনি। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিক্ষা উপদেষ্টা এবং প্রধান অতিথি দিয়াবাড়ী ক্যাম্পাসে গেলে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনগণ তাদের কাছে এসব দাবি জানিয়েছিলেন। নিহতদের শহীদ মর্যাদা দেওয়া, দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখা এবং উত্তরায় একটি আধুনিক মসজিদ নির্মাণের মতো দাবিও ছিল। এসবের বেশির ভাগই ছিল জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট।’

তিনি বলেন, ‘সে সময় আমরা নিহতদের পরিবারের কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। পরে শুনেছি, কর্তৃপক্ষ এসব দাবি মেনে নেওয়ার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু এরপর কোনো দাবিই বাস্তবায়ন করা হয়নি। আমরা পরে তাদের কাছে গিয়ে বারবার জানতে চেয়েছি, যেহেতু বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল, তাহলে এখন তা করা হচ্ছে না কেন। কেউ আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই তা বাস্তবায়ন করেননি।’

আশরাফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা জামায়াতে ইসলামীর আমিরের কাছেও গিয়েছি। তিনি বলেছিলেন, নির্বাচন শেষ হলে বিষয়টি দেখবেন এবং দাবিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছেও নির্বাচনের আগে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। তার কাছে গিয়ে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তিনিও নির্বাচনের পর সর্বাত্মক সহযোগিতা ও দাবিগুলো বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও আমরা তার দপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েছি। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল ইসলামের মাধ্যমে সেটি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমেও বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে আমরা কোনো ধরনের সহযোগিতা পাইনি।’

শুধু আহতদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকার সহযোগিতা করছে জানিয়ে আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘বিমান বাহিনীও সহযোগিতা করছে। স্কুল থেকেও কিছু ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা হয়েছে। কিন্তু যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের পরিবারগুলোর জন্য সরকার কোনো সহযোগিতা করেনি। সরকার থেকে শুরু করে কেউই তাদের পরিবারকে সহযোগিতা করেনি।’

ক্ষতিপূরণের ঘোষণা, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
মাইলস্টোন দুর্ঘটনার পর সরকার নিহত ও আহতদের জন্য বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। এক পর্যায়ে নিহতদের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা এবং আহতদের প্রত্যেককে ৫ লাখ টাকা করে বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। অর্থ বিভাগের এক চিঠিতে বলা হয়, ৫ লাখ টাকা করে ৬৪ জন আহতকে মোট ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ২০ লাখ টাকা করে ৩৫ নিহতের পরিবারকে মোট ৭ কোটি টাকা দেওয়া হবে।

এ ছাড়া সরকার গঠিত তদন্ত কমিশনের সুপারিশে নিহত শিশু ও শিক্ষার্থীদের পরিবারকে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা এবং প্রাপ্তবয়স্ক নিহতদের পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব করা হয়। আহত শিশুদের জন্য অগ্নিদগ্ধতার মাত্রা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। 

মাঝারি মাত্রার আহত শিশুদের জন্য ৩০ লাখ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। তুলনামূলক কম বা স্বল্পমেয়াদি আহতদের জন্য শিশুদের ১৫ লাখ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ১০ লাখ টাকা দেওয়ার সুপারিশ ছিল।

দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন এমন গুরুতর অগ্নিদগ্ধদের জন্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্যাকেজেরও সুপারিশ করা হয়। প্রায় ১৫ বছর চিকিৎসার প্রয়োজন হবে এমন ব্যক্তিদের জন্য ১৫ লাখ টাকা, ১০ বছর চিকিৎসার প্রয়োজন হলে ৯ লাখ টাকা এবং পাঁচ বছর চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। নিহতদের পরিবারকে দেওয়া ক্ষতিপূরণের অর্ধেক এককালীন নগদ এবং বাকি অর্ধেক পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রে দেওয়ার কথা বলা হয়।

আহত শিশুদের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ দুই কিস্তিতে এবং বাকি ৫০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়পত্রে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। সেই অর্থ শিশুর ২৫ বছর বয়সের আগে উত্তোলন করা যাবে না। প্রাপ্তবয়স্ক আহতদের ক্ষেত্রেও ৫০ শতাংশ দুই কিস্তিতে এবং বাকি ৫০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়পত্রে দেওয়ার কথা বলা হয়। এই অর্থ পাঁচ বছরের আগে উত্তোলন করা যাবে না। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এসব ঘোষণার অনেক কিছুই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

‘শুধু চিকিৎসায় সহযোগিতা পেয়েছি’
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে শহীদ তাসনিয়া হকের পিতা নাজমুল হক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ঘটনার পর আমরা প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি। আমাদের কয়েকটি দাবি ছিল। সরকারও কিছু দাবি পূরণের কথা বলেছিল। কিন্তু প্রায় এক বছর হতে চললেও এখন পর্যন্ত এসব বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। শুধুমাত্র তখনকার সময় চিকিৎসা সহযোগিতাটা পেয়েছি। কিন্তু বাকি জীবনে যে ওই শিক্ষার্থীগুলোকে আরও চিকিৎসা নিতে হবে। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই ক্ষতিপূরণ আমরা এখনও পাইনি।’

তিনি বলেন, ‘‘সন্তানের মৃত্যুর পর এই ক্ষতিপূরণ চাওয়া এক ধরনের লজ্জার বিষয়। আমরা আশা করেছিলাম, সরকার ঘোষিত ক্ষতিপূরণ আমরা পাব। এক বছর হলো। আমরা বিভিন্ন দপ্তরে দৌড়াদৌড়ি করেছি। চিঠি দিয়েছি। দাবি জানিয়েছি। আমরা সংবাদ সম্মেলন করেছি, দাবি দাওয়া জানিয়েছি, সরকারের মন্ত্রীদের সাথে দেখা পর্যন্ত করেছি। কিন্তু কেউ আমাদের কথাগুলো পর্যন্ত শুনতেও চাইছে না’

সরকারের আর্থিক সহায়তার বিষয়ে নাজমুল হক বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আহত শিশুদের জন্য যে আর্থিক সহায়তার কথা বলা হয়েছিল, সেটি আমরা ফেরত দিয়েছি। প্রায় ২০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। তবে কোনো অভিভাবকই সেই অর্থ নেননি।’

তিনি বলেন, ‘আহত শিশুদের চিকিৎসা এখনো চলছে। ভবিষ্যতেও অনেকের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। তাদের অনেকে কর্মক্ষমতা হারাতে পারেন। কেউ কেউ দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার মধ্যে আছেন। তাই এককালীন এই অর্থ দিয়ে তাদের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়।’

নাজমুল হক আরও বলেন, ‘আমাদের কয়েকটি দাবির মধ্যে নিহত শিশুদের শহীদ মর্যাদা দেওয়া, আহতদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মতো বিষয় রয়েছে। এসব দাবি বাস্তবায়নের জন্য আমরা এখনো কাজ করছি।’

হাইকোর্টে চলমান রিট মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘২২ জুলাই করা রিটটিই এখন চলমান আছে। পরবর্তী সময়ে এ-সংক্রান্ত যেসব বিষয় বা আবেদন করা হবে, সেগুলোও ওই রিটের সঙ্গে যুক্ত হবে। শিগগিরই মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।’

মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার বিষয়ে নাজমুল হক বলেন, ‘মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ আছে। তবে আর্থিকভাবে তারা এখনো সেভাবে সহযোগিতা করেনি। তবে আহত শিশুদের ফিজিওথেরাপির জন্য উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে একটি ফিজিওথেরাপি সেন্টার ভাড়া করে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সেখানে ফিজিওথেরাপি নেওয়া শিশুদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের যাতায়াতের জন্য একটি গাড়িরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে শিশুরা ওই গাড়িতে করে ফিজিওথেরাপি সেন্টারে যাওয়া-আসা করতে পারছে।’

হাইকোর্টের নির্দেশও বাস্তবায়িত হয়নি
মাইলস্টোন দুর্ঘটনার পর জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট করা হয়। রিটে নাগরিকদের জীবন রক্ষার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনার বিচারিক তদন্তের দাবি জানানো হয়। রিটের পর হাইকোর্ট কয়েকটি অন্তর্বর্তী নির্দেশনা দেন। এর মধ্যে ছিল এক সপ্তাহের মধ্যে কারিগরি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন এবং ৪৫ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করা।

জনবহুল এলাকায় ত্রুটিপূর্ণ ও প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করার নির্দেশও দেওয়া হয়। আহতদের দেশে বা বিদেশে সরকারি খরচে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বলা হয়। এ ছাড়া নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ৫ কোটি টাকা এবং আহতদের প্রত্যেককে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। 

দেশের শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্রে রক্তের গ্রুপ ও অভিভাবকের ফোন নম্বর যুক্ত করা এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হয়। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতি মাসে হলফনামার মাধ্যমে আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ ছিল।

আরও পড়ুন: মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: কী ঘটেছিল সেদিন, কেন এত প্রাণহানি?

হাইকোর্টের এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশে সাত দিনের মধ্যে হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করার কথা বলা হয়েছে।

নোটিশে সতর্ক করা হয়েছে, আদালত অবমাননায় দোষী সাব্যস্ত হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের চাকরিজীবনে গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। নোটিশের প্রাপকদের মধ্যে রয়েছেন প্রতিরক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব, শিক্ষা সচিব, বিমানবাহিনী প্রধান, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।

নিহতদের পরিবারের ৯ দফা দাবি
এদিকে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও গাফিলতির অভিযোগ তুলে নিহতদের পরিবার নয় দফা দাবি জানিয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নিহত তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তারের মামা লিয়ন মীর, তৃতীয় শ্রেণির মরিয়ম উম্মে আফিয়ার মা উম্মে তামিমা এবং অষ্টম শ্রেণির তানভীর আহমেদের বাবা রুবেল মিয়া এসব দাবি তুলে ধরেন।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, আইন ও নিয়ম ভেঙে কোচিং বাণিজ্যের মাধ্যমে শিশুদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। মাইলস্টোনসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা। নিহত পরিবারগুলোকে মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আর্থিক জরিমানা দেওয়া।

এ ছাড়া রানওয়ে এলাকা থেকে মাইলস্টোনের কোচিং কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়া, কোচিং বাণিজ্যের মূল হোতাদের অপসারণ করে আইনের আওতায় আনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষকে সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করতে বলা হয়েছে। হাইকোর্টের রিট অনুযায়ী সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ বাস্তবায়ন এবং বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জনহীন এলাকায় স্থানান্তরের দাবিও রয়েছে।

লিয়ন মীর বলেন, মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও অনিয়মের কারণে এত প্রাণহানি হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ছিল না। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ঘটনার দিন ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীদের কোচিং করানো না হলে প্রাণহানি এত বেশি হতো না। তাদের দাবি, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কোচিং করতে বাধ্য করতেন। কোচিং বন্ধের দাবিতে এর আগে মাইলস্টোনে একাধিকবার আন্দোলনও হয়েছে।

আরও পড়ুন: মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর: তদন্তে ৩০টির বেশি সুপারিশ, বাস্তবায়িত হয়নি কোনোটিই

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, তাদের শোক ও ক্ষতিপূরণ দাবিকে নিয়ে প্রতিষ্ঠানের একাধিক ব্যক্তি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তারা এসব বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান।

এ বিষয়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপদেষ্টা নুরুন্নবী বলেন, ‘আমরা যখন তখনকার সরকারের কাছে গেলাম, তখন সরকার বলল আমরা জুলাইযোদ্ধা যারা মারা গেছে, তাদেরকে ৩০ লাখ টাকা করে দিয়েছি। আমি তাকে বললাম, স্যার এমন কিছু সহায়তা দেওয়া উচিত যাতে পরিবার বাকি জীবন কাটাতে পারে। এমন অনেক আহত রয়েছে, যারা আর তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে না। এর মধ্যে আমাদের কয়েকজন শিক্ষকও রয়েছে’।

অন্যদিকে, আহত ও অগ্নিদগ্ধদের জন্য যে ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে, সেখানে বলা হয়- শিশুদের ক্ষেত্রে গুরুতর ক্ষতিগ্রস্তদের ৬০ লাখ, মাঝামাঝি ক্ষতিগ্রস্তদের ৩০ লাখ, অল্প ক্ষতিগ্রস্তদের ১৫ লাখ টাকা করে প্রদান করা উচিত। একইভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ও গুরুতর ক্ষতিগ্রস্তদের ৪০ লাখ, মাঝামাঝি ক্ষতিগ্রস্ত ২০ লাখ, স্বল্প ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে তদন্ত কমিশনের সুপারিশে।

এছাড়াও ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় চিকিৎসার জন্য ১৫ লাখ, নয় লাখ ও এক লাখ টাকা করে অর্থ ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বরাবর দিতে বলা হয়েছে। তাদের বাজেটে এই বিষয়টি যুক্ত করতেও বলা হয়েছে। তবে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বার্ন ইউনিট এই বাজেট পেলেও ঢাকার জাতীয় বার্ন ইন্সটিটিউট জানিয়েছে, এবার নতুন যে বাজেট তৈরি করা হয়েছে, সেখানে মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসায় নতুন করে কোনো বাজেট এখনো পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।

তদন্ত কমিশনের সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যারা হতাহত হয়েছে, কমিশনের পক্ষ থেকে তাদের ক্ষতিপূরণের জন্য সুস্পষ্ট সুপারিশ ছিল। আমরা চাই রাষ্ট্র যেন সেই প্রতিবেদনটা খুলে দেখে। তদন্ত কমিশন হতাহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানে ব্যবস্থা নিতে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল।’

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘নিহতদের শহীদ হিসেবে সনদ বা তালিকাভুক্ত করার বিষয়টি আলোচনার বিষয়। কারণ এটা একটা দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যান। সবাইকে তো শহীদ হিসেবে গণ্য করা যায় না। তবে মাইলস্টোনে যারা নিহত হয়েছেন, তারা প্রায় সবাই শিশু। এটা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা। আমরা সমবেদনা জানাই।’

মাইলস্টোন স্কুলের বিমান দূর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যুক্তিসংগত মন্তব্য করে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরাও স্যরি যে, আমরা ৫ মাস সরকারের দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু বিষয়টি এখনও নিরসন করা হয়নি।’

এ দুঃখজনক দুর্ঘটনার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রশ্নের জবাবে একথা বলতে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি ক্ষতিপূরণ দিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা দেওয়া আছে। যদি তাই থাকে, তাহলে আদালতের আদেশ যাতে বাস্তবায়ন হয়, সে ব্যাপারে আজই আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। আমরা চাই ক্ষতিগ্রস্তরা যেন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পান।’

ফাইনালে হারের পর কেন দলের সঙ্গে আর্জেন্টিনায় ফেরেননি মেসি
  • ২২ জুলাই ২০২৬
পেটের সুস্থতায় খাদ্যতালিকায় রাখুন প্রোবায়োটিক-সমৃদ্ধ খাবার
  • ২২ জুলাই ২০২৬
বৃন্দাবন সরকারি কলেজের নতুন উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম হারুন…
  • ২২ জুলাই ২০২৬
রাহুল গান্ধী শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার …
  • ২২ জুলাই ২০২৬
বন্যায় বিক্রির আগেই সর্বনাশ, ২০ লাখ টাকার পেঁপে বাগান হারিয়…
  • ২২ জুলাই ২০২৬
একজনকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেল একই পরিবারের তিনজনের
  • ২২ জুলাই ২০২৬