রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনা। © সংগৃহীত
আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে ২০২৫ সালের ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ঘটে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সামরিক বিমান দুর্ঘটনা। প্রতিষ্ঠানটির হায়দার আলী একাডেমিক ভবনে বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়। সেই মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ঘটনায় ৩৫ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিন জন শিক্ষক, তিন জন অভিভাবক ও বিমানের একজন পাইলট। আহতের সংখ্যাও কম নয়। আহত ১৭৫ জনের মধ্যে শিক্ষার্থীই ৬৩ জন।
জানা যায়, গেল বছরের ২১ জুলাই কলেজের প্রজেক্ট-২ ভবনের প্রতিটি কক্ষে চলছিল পাঠদান। তৃতীয় শ্রেণির ক্লাসরুমে বসে ছিল শিশু শিক্ষার্থীরা। সবাই ছিল শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনায় ব্যস্ত। দুপুর ১টায় ছুটি হয়। বিমান বাহিনীর এফ-৭ বিজেআই প্রশিক্ষণ বিমানটি ঢাকার বীর-উত্তম এ কে খন্দকার বিমান ঘাঁটি থেকে বেলা ১টা ৬ মিনিটে উড্ডয়ন করে। উড্ডয়নের অল্প সময়ের মধ্যেই বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। পাইলট জনবহুল এলাকা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও খুব কম উচ্চতায় থাকায় বিমানটির নিয়ন্ত্রণ আর ফিরে পাননি। শেষ পর্যন্ত ১টা ১৮ মিনিটে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী একাডেমিক ভবনে বিধ্বস্ত হয়। এক মুহূর্তে পালটে যায় সব কিছু। হতভম্ব ও দিশাহারা হয়ে শিক্ষার্থীদের দিগ্বিদিক ছুটোছুটি, চিৎকার, কান্না, ধোঁয়া, ধুলোয় ভরে যায় স্কুল। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এর মধ্য থেকে একের পর এক দগ্ধ শিক্ষার্থী বের করে আনা হয়। বিধ্বস্ত প্লেনটি ছিটকে প্রাইমারি শিক্ষার্থীদের ভবনের সিঁড়ির সামনে চলে যায়। বিধ্বস্ত হওয়া বিমানটির ‘নাক’ ঢুকে যায় ভবনের সিঁড়ির অংশে, আর এর দুই পাখার আঘাতে পুড়ে ছাই হয় শিশুদের দুটি ক্লাসরুম।
এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল তৎকালীন সরকার। সরকারের গঠিত ৯ সদস্যের তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী-চীনে তৈরি এফটি-সেভেন যুদ্ধবিমানটিতে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিলো না। মূলত প্রশিক্ষণার্থী পাইলটের উড্ডয়ন অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং গ্রাউন্ড সুপারভাইজারের চরম নজরদারির অভাবেই ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। যদিও সরকার এই তদন্ত প্রতিবেদন এখনো গোপন রেখেছে।
তদন্তে উঠে আসে- উড্ডয়নের মাত্র ৭ মিনিটের মাথায় পাইলটের ভুল কমান্ডের কারণে বিমানটির গতি ও উচ্চতার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া রানওয়ে সংলগ্ন এলাকায় রাজউকের ইমারত বিধি না মেনে ভবন তৈরি করা এবং একটিমাত্র বের হওয়ার পথ থাকায় প্রাণহানির সংখ্যা এত ভয়াবহ রূপ নেয়।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের জন্য এখনো কাঁদেন স্বজন, সহপাঠী ও শিক্ষকরা। আর যারা সেদিন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছেন, তাদের জীবন চলছে এক অজানা আতঙ্কে। আহতরা দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ক্লাসে ফিরলেও অধিকাংশই এখনো স্বাভাবিকে ফিরে আসতে পারেনি। যারা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন, তারাও নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তাদের চোখে এখনও আকাশ থেকে নেমে আসা আগুনের লেলিহান শিখা, আর্তনাদ, বন্ধুদের হারানোর শোকসহ বিভীষিকাময় দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়ায়।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর শিশুদের মনে গভীর মানসিক আঘাত বা ট্রমা তৈরি হয়েছে। যা তারা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কেবল শারীরিক চিকিৎসাই যথেষ্ট নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং সেবা শিশুদের স্বাভাবিক শৈশবে ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষার্থীদের এই গভীর মানসিক ক্ষত ও ট্রমা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে বেশ কিছু বেসরকারি ও সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকা এবং ছুটি রিসোর্টের যৌথ উদ্যোগে গাজীপুরের পুবাইলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশেষ ‘মেন্টাল হিলিং’ বা মানসিক নিরাময় কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম পরিবেশ থেকে দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তারা দিনভর মেডিটেশন, ছবি আঁঁকা, ফুটবল খেলা এবং উন্মুক্ত কাউন্সেলিং সেশনে অংশ নেয়।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির পর বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা পেলেও হতাহতের পরিবার সরকারের পক্ষ থেকে কোন আর্থিক সহায়তা পায়নি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ লাখ ও আহতদের ৫ লাখ করে টাকা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এটা খুবই সীমিত সহায়তা হিসেবে আখ্যায়িত করে অভিভাবকরা তা প্রত্যাখ্যান করেন।
অভিভাবকদের পক্ষ থেকে গত ১৭ জুন প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়ে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনো সাক্ষাৎ পাইনি তারা। গত ২১ জানুয়ারি ক্ষতিগ্রস্ত সকল পরিবার বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেছিল। সরকার গঠন করতে পারলে তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি। তবে দুর্ঘটনার পর এক বছর পার হলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্থানীয় কোনো পুনর্বাসন পরিকল্পনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে আহত শিশুরা দগ্ধজনিত জটিলতা, প্লাস্টিক সার্জারি ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের জন্য লিখিত আবেদনে শহীদ ও আহতদের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হলো—শহীদ পরিবারের সুরক্ষায় ও আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনে পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং দ্রুত হাইকোর্টের রিটের বাস্তবায়ন, আহতদের জন্য আজীবন বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও সিএমএইচ থেকে বিশেষ মেডিক্যাল কার্ডের ব্যবস্থা করা, নিহতদের রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদি মর্যাদা ও সনদ প্রদান করা, ২১ জুলাইকে ‘জাতীয় শিক্ষা শোক দিবস’ ঘোষণা এবং শহীদদের স্মরণে উত্তরায় একটি মসজিদ নির্মাণ করতে হবে।
মাইলস্ট্রোন ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ এবং আহত ব্যক্তিদের সুস্থতা কামনায় দোয়া ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল (২০ জুলাই) সোমবার সকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির দিয়াবাড়ী ক্যাম্পাসে এই দোয়া ও স্মরণসভা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ এবং আহত ব্যক্তিদের প্রতি সংহতি জানাতে দুই দিনের কর্মসূচি নিয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। এর অংশ হিসেবে দুর্ঘটনাস্থলটি আজ মঙ্গলবার সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে বলে জানিয়েছেন অধ্যক্ষ। দুর্ঘটনাস্থলে স্কাউট ও রোভার সদস্যরা গার্ড অব অনার দেবেন। নিহত ব্যক্তিদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে। এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে এবং দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি নিহত ব্যক্তিদের ছবি, বন্ধুদের লেখা স্মৃতিকথা ও বিভিন্ন বার্তা প্রদর্শন করা হবে।