সড়ক দূর্ঘটনা © সংগৃহীত
যশোরে অক্টোবর মাসের প্রথম ২৫ দিনে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২০ জন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৪৩ জন। নিহতদের মধ্যে শিশু, কিশোর ও তরুণদের পাশাপাশি রয়েছেন নারী, বৃদ্ধসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ, দ্রুতগতির যানবাহনের ধাক্কা এবং নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো ঘটনায় এসব প্রাণহানি ঘটেছে। বিশেষ করে নতুনহাটে দুই মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে তিন তরুণের মৃত্যু, চৌগাছায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই তরুণ-তরুণীর প্রাণহানি এবং মণিরামপুরের রাজগঞ্জে মাছবাহী পিকআপের ধাক্কায় মা ও তার চার বছরের শিশুসন্তানের মৃত্যুর ঘটনা স্থানীয়দের নাড়া দিয়েছে।
পুলিশ, হাসপাতাল ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এসব দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলের পাশাপাশি বাস, ট্রাক, পিকআপভ্যান, ইজিবাইক, ইঞ্জিনচালিত ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন জড়িত ছিল। কোথাও মুখোমুখি সংঘর্ষ, কোথাও পেছন থেকে ধাক্কা, আবার কোথাও যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
গত ২৩ অক্টোবর রাতে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের নতুনহাট এলাকায় দুটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিন তরুণ নিহত হন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত ওমর ফারুক ও রাকিব হাসানকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এর আগে ২ অক্টোবর চৌগাছা-কোটচাঁদপুর সড়কের দেবীপুর বালিগর্ত এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেলে সোলাইমান হোসেন (১৬) নামে এক কিশোর নিহত হন। আহত হন তানজিল হোসেন (১৪) ও ফরহাদ রেজা। পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, একদল বন্ধু সাতটি মোটরসাইকেলে ঘুরতে যাচ্ছিল। এ সময় একটি মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়।
৪ অক্টোবর চৌগাছা-মহেশপুর সড়কের ফাসতলা এলাকায় পিকআপভ্যানের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী স্কুলছাত্র জুবায়ের হোসেন (১৫) নিহত হয়। আহত হয় তার দুই বন্ধু লিখন ও ফাহিম। তারা তিনজনই নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
মুখোমুখি সংঘর্ষ ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনাও ঘটেছে একাধিক। ১৫ অক্টোবর চৌগাছা-যশোর সড়কের টালিখোলা মোড়ে পিকআপ ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে অয়ন হোসেন (২০) ও মিথিলা খাতুন (১৭) নিহত হন। পুলিশ ও স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিল মিথিলা। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত দুজনকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক অয়নকে মৃত ঘোষণা করেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে মিথিলার মৃত্যু হয়।
১৩ অক্টোবর চৌগাছা বাজারে ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন নুরুল আলম (৬০)। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ৬ অক্টোবর শার্শার নাভারন-সাতক্ষীরা মহাসড়কের খাজুরা মসজিদের সামনে পিকআপভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেলে আরিফ হোসেন (৩০) নামে এক হেলপার নিহত হন।
১ অক্টোবর দিবাগত রাতে যশোর সদর উপজেলার সতীঘাটা-কামালপুর কেন্দ্রীয় মসজিদ-সংলগ্ন সড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি ট্রাক মসজিদের প্রাচীর ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। এ ঘটনায় সড়কের পাশে ঘুমিয়ে থাকা অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি নিহত হন। আহত হন ট্রাকচালক।
এ ছাড়া ৪ অক্টোবর যশোর সদর উপজেলার বারীনগর বাজারে গড়াই পরিবহনের একটি যাত্রীবাসের ধাক্কায় শওকত আলী নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। একই দিনে বাঘারপাড়ার জামদিয়া এলাকায় দুটি ট্রাকের সংঘর্ষে একটি ট্রাক খাদে পড়ে। এতে চালক ও হেলপার আহত হন।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে গত ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় মণিরামপুরের রাজগঞ্জে। মাছবাহী পিকআপের ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে নিহত হন মৌসুমি বেগম (৩২) ও তার চার বছরের ছেলে আবদুর রহমান। মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন মৌসুমির স্বামী ওমর ফারুক। পিকআপের ধাক্কায় মা ও শিশু সড়কে পড়ে গেলে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি মাছবাহী পিকআপভ্যান তাদের চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই মৌসুমির মৃত্যু হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায় শিশুটি। আহত হন ওমর ফারুক। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে পরদিন বাড়িতে ফিরে স্ত্রী ও সন্তানকে দাফন করেন তিনি।
১৯ অক্টোবর ঝিকরগাছার মাগুরা ইউনিয়নের ফুলতলা এলাকায় ভ্যান ও গরুবোঝাই নসিমনের সংঘর্ষে একই পরিবারের দুই শিশু শোভন (১০) ও দিশা (৩) নিহত হয়। পূজা দেখতে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয় তাদের পরিবার। এতে শিশু দুটির বাবা কলেজশিক্ষক সাধন কুমার, মা, নসিমনের চালক ও এক যাত্রী আহত হন।
১০ অক্টোবর যশোর সদর উপজেলার কচুয়া এলাকায় বাড়ির সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় ইঞ্জিনচালিত ভ্যানের ধাক্কায় আহত ছয় বছরের শিশু সাজিদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ৪ অক্টোবর পুলেরহাট বাজার এলাকায় বাসের ধাক্কায় আহত বাইসাইকেল আরোহী সুলতান (৬০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
যশোর জেনারেল হাসপাতালে আসা সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের বড় অংশই তরুণ বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. আহসান কবীর বাপ্পী। তাঁর মতে, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, তরুণদের অনিয়ন্ত্রিত মোটরসাইকেল চালানো এবং সড়কের অবস্থাও দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনায় গুরুতর আহতদের মধ্যে মাথায় আঘাতের ঘটনা বেশি দেখা যায়। অনেক রোগীকে হাসপাতালে আনার আগেই মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। আবার গুরুতর আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর প্রয়োজন হয়। কারণ, যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিউরোসার্জারি বিভাগ নেই। ফলে সার্জারি ও অর্থোপেডিকস বিভাগের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ডা. আহসান কবীর বাপ্পী বলেন, সম্প্রতি যশোর শহরতলীর চাঁচড়া এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের চিকিৎসায় বিশেষায়িত সেবার প্রয়োজন হয়।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে শুধু সড়ক নির্মাণ ও গতিনিয়ন্ত্রণের অবকাঠামো তৈরি যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী শাম্মী সুলতানা। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সওজ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি), হাইওয়ে পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শাম্মী সুলতানা বলেন, সড়কে ট্রাফিক সাইন, সংকেত ও প্রয়োজনীয় গতিনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা সওজের কাজের অংশ। অন্যদিকে চালকদের লাইসেন্স ও যানবাহনের ফিটনেস যাচাই বিআরটিএর দায়িত্ব। চালকদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত বিআরটিসি। আর সড়কে আইন প্রয়োগ ও নিয়ম ভঙ্গের বিষয়গুলো দেখভাল করে হাইওয়ে পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশ। তবে এসব ব্যবস্থা কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি জানান, দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও দুর্ঘটনার প্রবণতা শনাক্ত করার কাজ সওজের বিভাগীয় পর্যায় ও অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে করা হয়। যশোর-মাগুরা সড়কের সওজের আওতাধীন প্রায় সাত কিলোমিটারের বিভিন্ন অংশে সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন স্থানে ট্রাফিক সাইন ও সংকেত স্থাপন করা হবে।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে চালক, যানবাহনের মালিক, যাত্রী ও পথচারী—সব পক্ষের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিআরটিএর যশোর সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) ও অফিসপ্রধান মোহাম্মদ জমির হোসেন। তিনি বলেন, চালকদের বিশেষভাবে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে সন্তানদের মোটরসাইকেল চালানোর আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ, চালানোর দক্ষতা ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
যশোর-বেনাপোল মহাসড়কে গত শুক্রবার রাতে তিনজনের প্রাণহানির দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে জমির হোসেন বলেন, একটি মোটরসাইকেলে তিনজন আরোহী থাকা এবং অতিরিক্ত গতিতে চলার বিষয়টি দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনায় এসেছে। উচ্চগতিতে চলার সময় হঠাৎ কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে চালক দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এতে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিরাজুল ইসলাম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। ফিটনেসবিহীন ও নিবন্ধনহীন যানবাহন, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা এবং মোটরসাইকেল চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার না করার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনা কমাতে পুলিশের পাশাপাশি চালক, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।
তিনি বলেন, সড়কে বাস, ট্রাক, মিনিবাস, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় যানবাহনের চাপ তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনাও উদ্বেগজনক। বিশেষ করে তরুণ ও কম বয়সী চালকদের মধ্যে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানো, ঝুঁকিপূর্ণভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম করা এবং অল্প সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
মিরাজুল ইসলাম বলেন, অনেক দুর্ঘটনা ফাঁকা সড়ক বা মোড়ের কাছে ঘটছে। এসব স্থানে চালকেরা দ্রুতগতিতে যানবাহন চালান। গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম করার সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
তরুণদের মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সন্তানদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়ার আগে ভালো প্রতিষ্ঠানে যথাযথভাবে চালানো শেখানো, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং গতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সতর্ক করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ ও সবার সচেতনতাই সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।