বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিত্যক্ত পানি মিশ্রিত ফার্নেস অয়েল স্লাজ সরাসরি মইল্ল্যা খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সাঙ্গু নদীতে মিশছে © টিডিসি
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কালিয়াইশ ইউনিয়নে অবস্থিত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) দোহাজারী-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিত্যক্ত পানি মিশ্রিত ফার্নেস অয়েল স্লাজ সরাসরি মইল্ল্যা খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সাঙ্গু নদীতে গিয়ে মিশছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে পানি দূষিত হয়ে জলজ প্রাণী ও বিভিন্ন উদ্ভিদ মারা যাচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।
স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নিঃসৃত পরিত্যক্ত ফার্নেস অয়েল স্লাজ ও তৈলাক্ত পানি তাদের নিজস্ব একটি ড্রেন দিয়ে সরাসরি মইল্ল্যা খালের পানিতে গিয়ে মিশছে। পরে ওই পানি বৃষ্টিপাতের সঙ্গে খাল বেয়ে সাঙ্গু নদীতে গিয়ে মিশছে। ফলে মইল্ল্যা খালের একটি অংশে পানির স্বাভাবিক রং ও বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হয়ে কালচে আকার ধারণের পাশাপাশি দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টার দিকে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে ‘পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসুন, পৃথিবীকে ভালোবাসুন’ এবং ‘পরিবেশ দূষণকারী শুধু প্রকৃতির শত্রু নয়, সমগ্র মানবজাতির শত্রু’ এই স্লোগানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতিকারক বর্জ্য মইল্ল্যা খাল ও কৃষিজমিতে ফেলে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ তুলে মলেয়াবাদ, রসুলাবাদ ও নতুন চাগাচর গ্রামের জনসাধারণের ব্যানারে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কৃষক ও স্থানীয়রা জানান, কালিয়াইশ ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের কৃষকরা শুষ্ক মৌসুমে কৃষিপণ্য উৎপাদনে মইল্ল্যা খালের পানি সেচ হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নিঃসৃত ফার্নেস অয়েল স্লাজ খালের পানি দূষিত করেছে। ফলে জমিতে সেচ দেওয়া বন্ধ রয়েছে। অতিবৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বন্যার ফলে এসব স্লাজ পানির সঙ্গে আশেপাশের কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়াও খালের বিভিন্ন অংশ তৈলাক্ত ও কালচে আকার ধারণ করেছে। এমনকি মইল্ল্যা খালে দেশীয় প্রজাতির মাছ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তারা।
ওই সময় মানববন্ধনের খবর পেয়ে সাতকানিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেনসহ সঙ্গীয় ফোর্স তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পরে ফোনে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রথমে বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এবং পরে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয় ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন। সর্বশেষ পুলিশ ক্ষতিগ্রস্তদের বিভিন্ন আশ্বাস দিলে তারা মানববন্ধন কর্মসূচি সম্পন্ন করে প্রধান ফটক থেকে সরে যান।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে মানববন্ধনের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের একটি টিম সেখানে পাঠানো হয়। পরে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলে মানববন্ধনে অংশ নেয়া লোকজনদের প্রধান ফটক থেকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
গত (১৩ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষিণ পাশে তাদের একটি নিজস্ব ড্রেন রয়েছে। ওই ড্রেন দিয়ে পানির সঙ্গে পরিত্যক্ত ফার্নেস অয়েল স্লাজ প্রবাহিত হয়ে সরাসরি মইল্ল্যা খাল মিশছে। ফলে খালের পানিতে তৈলাক্ত ও কালচে আকার ধারণের পাশাপাশি পুরো খালজুড়ে কালচে আস্তরণ পড়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে খালের ভেতর ও পাড়ে জন্মানো উদ্ভিদ প্রায় মরে গেছে। এমনকি খালের উপরের বৃহৎ একটি অংশে এই ফার্নেস অয়েল স্লাজের আস্তরণ লেগে আছে। এ ছাড়াও অতিবৃষ্টি হলেই খালের পানি সরাসরি সাঙ্গু নদীতে গিয়ে মিশে যাওয়ায় দূষণ আরও বিস্তৃত এলাকা কিংবা কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পূর্ব পাশে মইল্ল্যা খালের পার্শ্ববর্তী একটি জমিতে কলার আবাদ করেছেন আব্দুস সাত্তার। তিনি বলেন, আমি এ জমিতে প্রায় অর্ধশতাধিক কলাগাছ রোপণ করেছিলাম। কিন্তু ভারী বর্ষণ ও বন্যার সময় খালের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাগানে প্রবেশ করেছিল। ওই সময় পানির সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নিঃসৃত কালচে স্লাজ জমিতে প্রবেশ করায় অধিকাংশ কলাগাছ মারা গেছে। জমিটির কিছু অংশে এখনো পর্যন্ত স্লাজের আস্তরণ লেগে আছে।
কালিয়াইশ ইউনিয়নের বাসিন্দা ফরিদ উদ্দিন বলেন, খালের পানির মাধ্যমে দূষিত স্লাজ সাঙ্গু নদীতে প্রবেশ অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। কারণ এ নদী সাতকানিয়াসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অন্যতম অংশ। ফলে মইল্ল্যা খালের দূষণ শুধু খালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নদীর জলজ পরিবেশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ফার্নেস অয়েল স্লাজ বা তেলজাতীয় বর্জ্য পানিতে মিশে গেলে এর প্রভাব শুধু পানির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না বরং জলজ প্রাণী, উদ্ভিদ, মাটির গুণাগুণ এবং কৃষি উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বেশ কয়েকবছর আগে পোড়া বর্জ্য তেল নিঃসৃত হয়ে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে মিশেছিল। ফলে পরিবেশ অধিদপ্তর জরিমানার পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সাময়িক বন্ধ রাখারও নির্দেশ দিয়েছিল। আমরা চাই এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হোক। তাই দূষণের উৎস শনাক্ত করে তা দ্রুত সময়ের মধ্যে বন্ধ করা জরুরি। ভবিষ্যতে যাতে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্লাজ সরাসরি খাল কিংবা নদীতে মিশতে না পারে, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
দোহাজারী–কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মো. আব্দুল মান্নান বলেন, বিষয়টি ইতোমধ্যে আমাদের নজরে এসেছে। এ ঘটনায় আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অতিবৃষ্টি এবং বন্যার ফলে হয়তো কিছু পানি মিশ্রিত ফার্নেস অয়েল স্লাজ খালে মিশেছে। তবে আমরা শীঘ্রই সেগুলো সরিয়ে নিব।
তিনি আরও বলেন, মূলত আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ফার্নেস অয়েল ব্যবহৃত হয়। এই ফার্নেস অয়েল ব্যবহার পরবর্তী পানি মিশ্রিত স্লাজ একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা হয়। পরে সেখান থেকে পানি আলাদা করে স্লাজ সংরক্ষণ করা হয়। আমরা প্রতিবছর সেগুলো নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে থাকি। তাই এগুলো ফেলে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপ পরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, বিষয়টি নজরে আসার পরপরই আমাদের একজন পরিদর্শক ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং দূষণের স্থানগুলো পরিদর্শন করে নমুনা সংগ্রহ করেছেন। বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্টদের দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে। এ ছাড়াও সংগ্রহকৃত নমুনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।