বনঘেঁষে মুরগির খামার, খোলা গাড়িতে বিষ্ঠা পরিবহন—চর্মরোগে আক্রান্ত ৫ স্কুলের শিক্ষার্থীরা © সংগৃহীত
ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের কাহালগাঁও গ্রামটি বনের মধ্যে একটি গ্রাম। এ গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৩ টি, একটি মাধ্যমিক ও একটি দাখিল মাদরাসা রয়েছে। এ গ্রামের শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকরা আক্রান্ত হচ্ছে চুলকানি রোগে। অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে।
গতকাল সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ৫ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আক্রান্ত হচ্ছে শরীর চুলকানির মত রোগে। আক্রান্ত হচ্ছে শিক্ষকরাও। হাজার হাজার টাকা খরচ করেও শরীর চুলকানির যন্ত্রণা থেকে তাদের মুক্তি মিলছে না। এর কারন হিসাবে দেখছেন কাহালগাঁও গ্রামের বাণিজ্যিক মুরগি খামারগুলো। সিপি বাংলাদেশ নামক একটি বয়লার মুরগি খামার থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ১৫ থেকে ২০ টি লড়িতে করে মুরগি, বিষ্ঠা পরিবহন হয়ে থাকে মৎস্য খামারে। ঢাকনা বিহীর মুরগি, বিষ্ঠা পরিবহনের ফলে বাতাসের সাথে মিশে তা বায়ু দূষণ করছে। পরিবহনের সময় মুরগি বিষ্ঠা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকছে গ্রামের সড়ক গুলোতে।
অভিযোগ উঠেছে মুরগি বিষ্ঠার এই অবৈধ বাণিজ্যের সাথে জড়িত ফুলবাড়ীয়া উপজেলা শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। তার সাথে ১০-১২ জনের একটি গ্রুপ এ কাজ করে। কাইয়ুম প্রথমে স্বীকার করে পরে মোবাইলে নয় সরাসরি দেখা করার জন্য বলেন।
বন বিভাগ জানায়, এনায়েতপুর ইউনিয়নের ৫ টি মৌজায় ২৮শ ৮৩ একর সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে। কাগজে ৩০০ একর গজারী বনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোন হদিস নেই। সবচেয়ে বেশি জমি রয়েছে কাহালগাঁও গ্রামে। বনের সকল জমি সেখানে জবরদখল হয়ে গেছে।
এনায়েতপুর বিট কর্মকর্তা সেলিম মিয়া জানান, বনের জমিতে ১০-১২ টি বাণিজ্যিক মুরগি খামার গড়ে তোলা হয়েছে। ঐ সময় বনবিভাগ এসব বাণিজ্যিক মুরগি খামার নির্মাণ বন্ধে উদ্যোগ নিলেও প্রভাবশালীদের দাপটে তা রোধ করা যায়নি। কাহালগাঁও গ্রামের গড়ে উঠা মুরগি খামার গুলো বন এলাকার পরিবেশ বিপন্ন করছে।
এনায়েতপুর ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নং এ তিন ওয়ার্ড মিলে কাহালগাঁও গ্রাম। এ গ্রামে প্রায় ৮/৯ হাজার ভোটার রয়েছে। জনসংখ্যা ১৫ হাজারের মতো।
কাহালগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৬০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষার্থীরা শরীর চুলকানির মত রোগে আক্রান্ত কিনা বিষয়টি জানেন না বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক আকিকুন নেছা। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বায়োজিদ ও পবিত্র জানান, ৩ মাস ধরে শরীরে চুলকানি রোগ দেখা দিয়েছে। চুলকানিতে তারা এখন অতিষ্ঠ।
কাহালগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফজলুল করিম জানান, এক সময় কাহালগাঁও গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ বেশ মনোরম ছিল। বর্তমানে বাণিজ্যিক মুরগি খামারের জন্য পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন রোগে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। বেড়েছে মশা মাছি। মুরগি বিষ্ঠার ব্যবসা নিয়মে না নিয়ে আসতে পারলে জনস্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে পড়বে।
কাহালগাঁও ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসা পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ঐ মাদরাসার প্রায় প্রতিজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী চুলকানি রোগে আক্রান্ত। তারা সকলেই অবাধে গড়ে উঠা মুরগি ফার্ম ও মুরগি বিষ্ঠা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পরিবহণকে দায়ী করেছেন।
কামারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, চুলকানির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে অনুপস্থিত। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়ার হাতে চুলকানির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় কদিন ধরে সে বিদ্যালয়ে আসছে না। ঐ স্কুলের সহকারী শিক্ষক নায়ার সুলতানা ভুগছেন শ্বাসকষ্টে। তার বাড়ির সাথেই রয়েছে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠা মুরগি ফার্ম। দুর্গন্ধে বাড়িতে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। রাত ১০ টার পর থেকে খোলা ট্রাকে করে মুরগি বিষ্ঠা পরিবহন শুরু হয়। তথন দুর্গন্ধের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জানান, চুলকানির কারণে অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে আসতে চায় না। চুলকানি থেকে পরিত্রাণের একটা বিহিত করা দরকার। তা না হলে চুলকানির মত ছোঁয়াচে রোগটি সকল শিক্ষার্থীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। এরই মধ্যে রোগটি অনেকের শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে।
কাহালগাঁয়ের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম জানান, তিনিসহ তার পরিবার এ রোগে আক্রান্ত। অনেক টাকা খরচ করার পরও এখনো ভাল হয়নি। বাণিজ্যিক মুরগি খামারে বিষ্ঠার অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের শরীরে চুলকানি ছড়িয়ে পড়ছে। সরকারিভাবে মুরগি বিষ্ঠা, পরিবহন ও বেঁচাকেনা বন্ধ করা জরুরি।
ফুলবাড়ীয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার হারুন আল মাকসুদ জানান, ফুলবাড়ীয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইদানিং বেশি চুলকানির রোগী চিকিৎসার জন্য আসছে। কেন এমন হচ্ছে এটা নিয়ে বিশদ পরীক্ষা নিরীক্ষা করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন জানান, বিষয়টি আমার জানা নেই খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ফুলবাড়ীয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার শহিদুল ইসলাম সোহাগ জানান, বিষয়টি খুব বেদনাদায়ক। পরিবেশের একটা বিরূপ প্রভাব পড়েছে সেখানে খোঁজ নিয়ে বিষয়টি দেখা হবে।