বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪ হাজার ৩০০ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। © টিডিসি ছবি
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা নদীতে গত ২৪ ঘণ্টায় পানির স্তর আর বাড়েনি। তবে জেলার অপর দুই নদী মহানন্দা ও পুনর্ভবায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি। এরই মধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪ হাজার ৩০০ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। শনিবার সকালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য থেকে এসব জানা গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা নদীর পাঙ্খা পয়েন্টে শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তিন সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পায়। এরপর থেকে নদীর পানি স্থিতিশীল রয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত নতুন করে আর পানি বাড়েনি। বর্তমানে পাঙ্খা পয়েন্টে পানির স্তর ২১ দশমিক ৭৯ মিটার, যা বিপৎসীমার ২৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তবে গত ২৪ ঘণ্টায় মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীতে সাত সেন্টিমিটার করে পানি বেড়েছে। ফলে জেলার নিম্নাঞ্চলের পানিবন্দী মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। আবার কেউ কেউ ঘরের ভেতর হাঁটুপানির মধ্যেই বসবাস করছেন। পানিবন্দী এসব মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে রান্না, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অনেক দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষ।
বন্যার পানি শুধু মানুষের বসতবাড়িতেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পড়েছে শিক্ষা কার্যক্রমেও। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২৯ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিকল্প স্থানে ক্লাস কার্যক্রম শুরু করলেও অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো পাঠদান ব্যাহত। এতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারছেনা।
পানিবন্দী এলাকার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকেছে, আবার কোথাও বিদ্যালয়ে যাওয়ার সড়ক ও আশপাশের এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
পানিবন্দী বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, ‘বাড়ির চারপাশে পানি, অনেক জায়গায় ঘরের ভেতরেও পানি ঢুকেছে। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা যাচ্ছে না। পরিবারের ছোটদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় আছি।
আরেক ভুক্তভোগী জাফর আলী বলেন, পানি বাড়ার পর থেকে ঘর থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে গেছে। কাজকর্ম বন্ধ। সংসারে খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। পানি আর না বাড়লে হয়তো কিছুটা স্বস্তি পাব।
কুদ্দুস মিয়া বলেন, বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় খুব কষ্টে দিন কাটছে। কেউ কেউ বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেছে। আমরা এখনো বাড়িতে আছি, কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ হলে আমাদেরও আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হবে।
এ দিকে পানিবন্দী মানুষের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ ও খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। শিবগঞ্জ উপজেলায় ইতোমধ্যে দুই দিন ধরে পানিবন্দী পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ চলছে। পাশাপাশি খাবার স্যালাইন ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রও।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন, পানিবন্দী মানুষের মধ্যে দুই দিন ধরে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। খাবার স্যালাইন ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে আসেনি। তবে পরিস্থিতির অবনতি হলে দ্রুত তাদের সেখানে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, পদ্মা নদীর পানি বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আজকের পর থেকে পদ্মা নদীর পানি কমতে শুরু করবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নিম্নাঞ্চলের মানুষের মধ্যে এখনো কাটেনি উদ্বেগ। নদীর পানি স্থিতিশীল হলেও বানভাসি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফেরেনি; বরং পানিবন্দিত্বের কারণে একদিকে যেমন বাড়ছে দুর্ভোগ, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম।