সেন্টমার্টিনে পর্যটকের ভাটা, তিন বেলার খাবার জোগাতে হিমশিম নিম্ন আয়ের মানুষের

০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫০ AM , আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০২ AM
দ্বীপ সেন্টমার্টিন

দ্বীপ সেন্টমার্টিন © টিডিসি ফটো

নীল জলরাশির বুক চিরে সাদা প্রবালবালুর সৈকত। চারদিকে সারি সারি নারকেলগাছ। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। একসময় পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকত পুরো দ্বীপ। হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ আর দোকানপাটে লেগে থাকত ব্যস্ততা। কিন্তু সেই চেনা চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। বন্ধ হোটেল-রিসোর্ট, তালাবদ্ধ রেস্তোরাঁ। কর্মহীন মানুষের চোখে-মুখে হতাশা। পর্যটনশূন্য দ্বীপে যেন চলছে নীরব দুর্ভিক্ষ।

পর্যটকের যাতায়াত কমে যাওয়ায় দ্বীপের মানুষের আয়-রোজগারও কমে গেছে। পর্যটননির্ভর অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। আয় না থাকায় বেশ কিছু হোটেল মালিক কর্মচারীদের ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছেন। তবে সবাই হাল ছেড়ে দেননি। কেউ কেউ খালি পড়ে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে জীবিকার নতুন পথ খুঁজছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, সেন্টমার্টিন জেটিঘাট থেকে বাজারপাড়ায় ঢুকতেই ডান পাশে একসময় জমজমাট থাকা দারুচিনি রেস্টুরেন্টটি এখন প্রায় খালি। সেখানে নেই আগের মতো ক্রেতা-পর্যটকের ভিড়। রেস্টুরেন্টটিতে এখন প্রতিদিন চলছে ক্যারাম খেলা। স্থানীয়রা প্রতি গেম ১০ টাকা দিয়ে ক্যারাম খেলছেন। এভাবেই প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছেন রেস্টুরেন্টটির মালিক সৈয়দ আমিন।

সৈয়দ আমিন জানান, একসময় তার প্রতিষ্ঠানে ২০ জনের বেশি কর্মচারী কাজ করতেন। পর্যটন কমে যাওয়ায় এখন তাদের সবাই বেকার।

পর্যটন মৌসুম সীমিত হয়ে আসায় আশপাশের শাহিনা রেস্তোরাঁ, আল্লাহর দান রেস্টুরেন্ট, ইউরো বাংলা, এশিয়া বাংলা রেস্টুরেন্টসহ অধিকাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁও বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক দোকানপাটেও ঝুলছে তালা। রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে অভুক্ত কুকুর। আর কর্মহীন মানুষ কেউ জাল বুনছেন, কেউ রাস্তার পাশে বা আশপাশের এলাকায় বসে সময় কাটাচ্ছেন।

ক্যারাম খেলার ফাঁকে স্থানীয় যুবক আলমগীর আকাশ বলেন, ‘সেন্টমার্টিনের মানুষ এখন খুব কষ্টে জীবন যাপন করছে। পর্যটক না থাকায় রিকশা, হোটেল, রেস্তোরাঁ—সবখানেই আয় নেই।’

শাহজালাল বলেন, ‘আগে ব্যবসা করতাম। এখন বড়শি নিয়ে সাগরে যাই। কিন্তু মাছ কিনবে, এমন সামর্থ্যবান মানুষও নেই। এভাবে চললে না খেয়ে মরতে হবে।’

স্থানীয়দের ভাষ্য, সেন্টমার্টিনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের সারা বছরের আয় পর্যটননির্ভর। তাই পর্যটন ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে তাদের জীবিকায়। বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে ভরা মৌসুমেও পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ফলে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে দ্বীপের অনেক বাসিন্দাকে।

শুধু পর্যটন খাতের মন্দাই নয়, সেন্টমার্টিনের মানুষের সংকট আরও বহুমুখী। বৈরী আবহাওয়ায় বারবার নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনা সম্ভব হয় না। অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা দেয় খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের সংকট। একই সঙ্গে বেড়ে যায় দাম।

টেকনাফ-সেন্টমার্টিন ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশিদ বলেন, ‘সাগরে বৈরী আবহাওয়া বা কোনো সতর্কসংকেত জারি হলে যাত্রীবাহী ট্রলার চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। ফলে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে যাত্রীদের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায় এবং সেন্টমার্টিনের বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।’

তিনি বলেন, দ্বীপের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ খাদ্যপণ্য টেকনাফ হয়ে সেন্টমার্টিনে পৌঁছে। তাই ট্রলার চলাচল বন্ধ থাকলে খাদ্যপণ্য সরবরাহও ব্যাহত হয়। এতে সংকট দেখা দেয়।

স্থানীয় বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকা নেই। বিদ্যুৎ সংকটও চরম আকার ধারণ করেছে। এ ছাড়া বৈরী আবহাওয়ায় নৌ-যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দেয়। তাই দ্রুত হাসপাতালে রেবিস টিকা সরবরাহ, বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা চালু এবং দ্বীপে একটি সরকারি খাদ্যগুদাম স্থাপনের দাবি জানাই।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, সেন্টমার্টিন হাসপাতালে প্রায় দুই বছর ধরে জলাতঙ্ক প্রতিষেধক বা র‍্যাবিস ভ্যাকসিন নেই। অথচ দ্বীপে বিপুলসংখ্যক কুকুর রয়েছে। সামনে কুকুরের প্রজনন মৌসুম। এ সময় কুকুরের আক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা। তাই দ্রুত হাসপাতালে পর্যাপ্ত র‍্যাবিস ভ্যাকসিন সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন দ্বীপবাসী।

চিকিৎসাসেবা নিয়েও রয়েছে সংকট। সেন্টমার্টিনে যে হাসপাতাল রয়েছে, সেখানে নিয়মিত চিকিৎসক থাকেন না। ফলে সাধারণ চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন দ্বীপের মানুষ। বৈরী আবহাওয়ার কারণে নৌ-যোগাযোগ বন্ধ থাকলে জরুরি প্রয়োজনে টেকনাফে যাওয়ার সুযোগও থাকে না।

টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল হোসাইন বলেন, তিনি বর্তমানে অসুস্থ থাকায় ছুটিতে আছেন। তবে তিনি শুনেছেন, সেন্টমার্টিনে বর্তমানে কোনো চিকিৎসক কর্মরত নেই। সেখানে চিকিৎসক দেওয়ার বিষয়ে কাজ চলছে।

কুকুরের জলাতঙ্ক প্রতিষেধক র‍্যাবিস টিকার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি প্রাণিসম্পদ বিভাগের আওতাধীন। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত লাইভস্টক কর্মকর্তারা কাজ করছেন। আশা করা যাচ্ছে, শিগগিরই প্রয়োজনীয় টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।

বিদ্যুৎ সংকটও দ্বীপটির দীর্ঘদিনের সমস্যা। বর্ষাকালে পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। একই সময়ে ব্লু মেরিন কর্তৃপক্ষ নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারায় অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয় বাসিন্দাদের। এতে সাধারণ জীবনযাত্রার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যও ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. শোয়েব বলেন, ‘সেন্টমার্টিনের অধিকাংশ মানুষ পর্যটননির্ভর হলেও বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে পর্যটকের সংখ্যা কমে গেছে। ফলে মানুষের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। দ্বীপে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নেই। বৈরী আবহাওয়ায় নৌ-যোগাযোগ বন্ধ থাকলে জরুরি প্রয়োজনে টেকনাফে যাতায়াতও সম্ভব হয় না। অন্যদিকে সাগরে আরাকান আর্মির দৌরাত্ম্যের কারণে জেলেরা নিরাপদে মাছ ধরতে যেতে ভয় পান। সব মিলিয়ে সেন্টমার্টিনের মানুষ নানামুখী সংকটের মধ্যে বসবাস করছেন।’

সাগরে আরাকান আর্মির দৌরাত্ম্যও জেলেদের জন্য নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপত্তার শঙ্কায় তারা অনেক সময় সাগরে মাছ ধরতে যেতে ভয় পান। ফলে পর্যটন খাতের পাশাপাশি মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল মানুষের আয়ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও সেন্টমার্টিনের অন্যতম বড় উদ্বেগ। স্থানীয়দের মতে, বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস হলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা দ্বীপের ভূমির চেয়ে বেশি হয়ে যায়। এতে পুরো দ্বীপ প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ঝুঁকিতে পড়ে মানুষের জীবন ও সম্পদ। এ কারণে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, শক্তিশালী উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, সাগরে আরাকান আর্মির দৌরাত্ম্য ও দুর্যোগের ঝুঁকি—দুই দিক থেকেই জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, দ্বীপবাসী দীর্ঘদিন ধরে নানামুখী সংকটে রয়েছেন। এসব সমস্যা সরকারের নজরে এনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সমস্যাগুলোর সমাধান হলে সেন্টমার্টিনের মানুষের জীবনযাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক হবে।

খাদ্যসংকট মোকাবিলায় অবশ্য সরকারি উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. অনীক চৌধুরী। তিনি বলেন, সেন্টমার্টিনে প্রতি মাসেই প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পাঠানো হয়। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আলাদা খাদ্য মজুত রাখার জন্য দ্বীপে একটি খাদ্যগুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে নৌযোগাযোগ ব্যাহত হলে খাদ্য পরিবহনে সাময়িক সমস্যা দেখা দেয়। এরপরও জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে যতটা সম্ভব দ্রুত খাদ্যসামগ্রী দ্বীপে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

নতুন পে স্কেলে বিসিএস ক্যাডারসহ প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের …
  • ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চিয়া সিড খাওয়ার আগে জেনে নিন এসব তথ্য
  • ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পে স্কেলের গেজেট কবে, যা বলছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব
  • ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একাদশে ভর্তির আবেদন শুরু আজ, করবেন যেভাবে
  • ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নতুন পে স্কেলে প্রাথমিকের প্রধান ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন কত…
  • ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সেন্টমার্টিনে পর্যটকের ভাটা, তিন বেলার খাবার জোগাতে হিমশিম …
  • ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬