যশোর শিক্ষা বোর্ড এলাকায় সড়কে এভাবেই সারিবদ্ধভাবে বাস দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে © টিডিসি
উচ্ছেদের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই আবারও দখলে চলে গেছে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনের সরকারি জায়গা। অবৈধ স্থাপনা, দোকানপাট, ইট-বালি-খোয়ার ব্যবসার পাশাপাশি সেখানে ফের বসেছে মিনি বাস টার্মিনাল। মহাসড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে বাস দাঁড় করিয়ে রাখায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে সড়ক। একটি বড় যান চলাচল করলে ভ্যান, রিকশা কিংবা ছোট যানবাহন পাশ কাটিয়ে যাওয়ারও জায়গা থাকে না। ফলে খাজুরা বাসস্ট্যান্ড থেকে শিক্ষা বোর্ড পর্যন্ত এলাকায় প্রতিদিনই সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সেবাগ্রহীতাদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অবস্থান। শিক্ষা বোর্ডের সামনে মহাসড়কসংলগ্ন বড় একটি সরকারি জায়গা দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর দখলে ছিল। সেখানে গড়ে উঠেছিল অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা। পাশাপাশি ইট, খোয়া ও বালির ব্যবসা এবং মিনি বাসের অস্থায়ী টার্মিনালও চালু ছিল।
দুই মাস আগে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় যশোর হাউজিং কর্তৃপক্ষ অভিযান চালিয়ে ওই এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় অবৈধ স্থাপনা। উচ্ছেদ করা হয় ইট, খোয়া ও বালির ব্যবসা এবং সরিয়ে দেওয়া হয় মিনি বাস টার্মিনালও। এতে কিছুদিনের জন্য স্বস্তি ফিরে আসে মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায়। কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, উচ্ছেদের কয়েক সপ্তাহ পর থেকেই আবার সরকারি জায়গায় বসতে শুরু করেন দখলদাররা। এখন সেখানে নতুন করে তৈরি হচ্ছে স্থাপনা। আগের মতোই চলছে ইট, খোয়া ও বালির ব্যবসা। মহাসড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে বাস দাঁড় করিয়ে তৈরি করা হয়েছে অনেকটা মিনি বাস টার্মিনালের পরিবেশ। ফলে উচ্ছেদের আগে যে পরিস্থিতি ছিল, ফের অনেকটা সেই অবস্থায় ফিরে গেছে এলাকাটি।
শিক্ষা বোর্ডে সেবা নিতে আসা শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষা বোর্ডের সামনে দখলদারিত্বের কারণে সড়কটি দিন দিন আরও সংকুচিত হচ্ছে। খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নানা কাজে শিক্ষা বোর্ডে আসেন। যানজটের কারণে তাঁদের অনেককেই দুর্ভোগে পড়তে হয়।
মাগুরার শত্রুজিতপুর কালিপ্রসন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল হান্নান বলেন, নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন-সংক্রান্ত কাজে তিনি শিক্ষাবোর্ডে এসেছিলেন। তার ভাষায়, ‘শিক্ষা বোর্ডের সামনের বড় একটি অংশ দখল হয়ে গেছে। খাজুরা বাসস্ট্যান্ড থেকে শিক্ষা বোর্ড পর্যন্ত প্রায়ই যানজট লেগে থাকে। মহাসড়কের দুপাশে এমনভাবে বাস রাখা হয়েছে, দেখে মনে হয় এটি একটি মিনি বাস টার্মিনাল। একটি বড় গাড়ি চলাচল করলে রিকশা যাওয়ার জায়গাও থাকে না। খুলনা বিভাগের দশ জেলার মানুষ শিক্ষা বোর্ডে সেবা নিতে আসেন। তাদের স্বস্তিতে চলাচলের জন্য জায়গাটি দখলমুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি।’
আরও পড়ুন: টিএসসি নির্মাণ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণসহ ১৩ দাবি সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি শিক্ষার্থীদের
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কাটগড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তবিবর রহমান বলেন, প্রশাসনিক কাজে তাকে প্রায়ই শিক্ষা বোর্ডে আসতে হয়। তার অভিযোগ, ‘শিক্ষা বোর্ডের সামনে সড়ক, হাউজিং ও শিক্ষাবোর্ডের জায়গার একটি বড় অংশ দখল হয়ে গেছে। কেউ দোকানপাট, কেউ বাসটার্মিনাল, আবার কেউ বালি, ইট ও খোয়ার ব্যবসা করছেন। এ কারণে সড়কে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
যশোর জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনিচুর রহমান লিটন বলেন, শিক্ষা বোর্ডের সামনে খাজুরা, মাগুরা ও যশোর বাসমালিক সমিতির গাড়ি প্রায়ই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। ‘দেখলে মনে হয় এটা অনেকটা মিনি বাসটার্মিনাল। শিক্ষাবোর্ডের সামনের সরকারি জায়গা এসব গাড়ি দখল করে রেখেছে, যা সম্পূর্ণ অন্যায়। এতে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ কারণেই এ এলাকায় যানজট কমছে না।’
তিনি আরও বলেন, জনস্বার্থে সরকারি জায়গা ফাঁকা রাখার জন্য জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে খাজুরা, মাগুরা ও যশোর মালিক সমিতিকে পৃথকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এরপরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। তাঁর মতে, বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক বিভাগ ও জেলা প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।
যশোর হাউজিংয়ের আশিক আহমেদ সাকিব বলেন, কয়েক মাস আগে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় হাউজিং কর্তৃপক্ষ অভিযান চালিয়ে শিক্ষাবোর্ডের সামনে সরকারি জায়গা থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করেছিল। এখন সেখানে নতুন করে স্থাপনা তৈরি ও দখলের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি জায়গা কোনোভাবেই কাউকে দখল করতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজন হলে আবারও অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর ড. আব্দুল মতিন বলেন, শিক্ষা বোর্ডের সামনে সরকারের বড় একটি অংশের জায়গা রয়েছে। এর মালিকানা শিক্ষাবোর্ড, সড়ক ও জনপথ এবং হাউজিং বিভাগের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দখলদার ওই জায়গা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছিল। দুই মাস আগে জেলা প্রশাসন ও হাউজিং বিভাগের অভিযানে অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয় এবং মিনি বাস টার্মিনালও সরিয়ে দেওয়া হয়।
তবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোনো এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে দুই মাস পার হতে না হতেই আবার আগের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নতুন করে অবৈধ স্থাপনা তৈরি শুরু হয়েছে। মিনি বাসটার্মিনালও আগের মতো বসে গেছে। এসব কারণে শিক্ষা বোর্ডের সামনে যানজট এখন নিত্যসঙ্গী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরও যদি অল্প সময়ের মধ্যে একই জায়গা আবার দখল হয়ে যায়, তাহলে শুধু উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সরকারি জায়গার সীমানা নির্ধারণ, দখল প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা এবং মহাসড়কের পাশে বাস দাঁড় করানো বন্ধে কার্যকর নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধভাবে জায়গা দখল করে ব্যবসা পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যশোর শিক্ষাবোর্ডে খুলনা বিভাগের বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়মিত সেবা নিতে আসেন। তাই শিক্ষা বোর্ডের সামনে সরকারি জায়গা দখলমুক্ত রাখার বিষয়টি শুধু সৌন্দর্য বা জায়গা ব্যবহারের প্রশ্ন নয়; এটি নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন সড়ক চলাচলের সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে দখলদারিত্ব আরও বাড়বে এবং যানজট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।