দেখে বোঝার উপায় নেই এটি খাল © টিডিসি
গাইবান্ধা সদর উপজেলার দুটি খাল খনন প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দ থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বরাদ্দ পেতে বিলম্ব এবং বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় প্রকল্প দুটির কাজ আটকে যায়। ফলে অব্যয়িত ৫৭ লাখ ৩২ হাজার ৪৪৩ টাকা সোমবার (৩ আগস্ট) সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
সদর উপজেলার সাহাপাড়া ও বোয়ালী ইউনিয়নের খাল খনন প্রকল্পগুলো নিয়ে স্থানীয় কৃষক, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল ব্যাপক প্রত্যাশা। তারা আশা করেছিলেন, বর্ষার আগেই খালগুলো সংস্কার হয়ে যাবে, যা জলাবদ্ধতা কমাবে এবং কৃষি উৎপাদন বাড়াবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো চিত্র। প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থ ছাড়ের ধীরগতিতে প্রকল্প দুটি থমকে দাঁড়িয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত অব্যয়িত অর্থ ফেরত দিতে হয়েছে সরকারি তহবিলে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খাল খনন প্রকল্পের জন্য দুই খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওয়েজ কস্ট খাতে শ্রমিকদের মজুরি এবং নন-ওয়েজ কস্ট খাতে যন্ত্রপাতি, জ্বালানি, সরঞ্জাম ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটানোর জন্য অর্থ রাখা হয়।
সাহাপাড়া ইউনিয়নের কাশদহ-নান্দিনা খাল খনন প্রকল্পে ওয়েজ কস্ট খাতে বরাদ্দ ছিল ২০ লাখ ৫০ হাজার ৪৯২ টাকা এবং নন-ওয়েজ কস্ট খাতে ২০ লাখ ৭৩ হাজার ৫৬৪ টাকা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পরে বরাদ্দ পাওয়ায় ইতোমধ্যে বর্ষা শুরু হয়ে যায়। ফলে প্রকল্পটির কাজ শুরুই করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে দুই খাতের পুরো ৪১ লাখ ২৪ হাজার ৫৬ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হয়েছে।
বোয়ালী ইউনিয়নের খাল খনন প্রকল্পে প্রায় ১ দশমিক ৪ কিলোমিটার খাল খননের জন্য ওয়েজ কস্ট খাতে বরাদ্দ ছিল ১৭ লাখ ৯৪ হাজার ৭১৮ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১০০ মিটার খননকাজ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ৭ লাখ ১৪ হাজার ১৮ টাকা অব্যয়িত থেকে যায়। একই প্রকল্পে নন-ওয়েজ কস্ট খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮ লাখ ১৪ হাজার ৩৬৯ টাকা, যার মধ্যে ৮ লাখ ৯৪ হাজার ৩৬৯ টাকা ব্যয় না হওয়ায় সেটিও সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
দুটি প্রকল্প মিলিয়ে মোট অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৭ লাখ ৩২ হাজার ৪৪৩ টাকা, যা সম্পূর্ণ ফেরত দেওয়া হয়েছে।
সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ জানান, কয়েকটি প্রকল্পের বরাদ্দ নির্ধারিত সময়ের পরে পাওয়া যায়। এরই মধ্যে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় খাল খননের কাজ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। সরকারি আর্থিক বিধি অনুযায়ী অব্যয়িত অর্থ ৩ আগস্ট সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সময়মতো খাল খননের কাজ শেষ হলে বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা কমানো এবং কৃষি উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা ছিল। স্থানীয় কৃষকেরা আশা করেছিলেন, খাল খনন হলে তাদের জমির পানি নিষ্কাশনে সুবিধা হবে এবং ফসল উৎপাদন বাড়বে। কিন্তু বরাদ্দ পেতে বিলম্ব এবং মৌসুমি প্রতিকূলতার কারণে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি।
গাইবান্ধা অঞ্চলে খাল খননের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়, ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়, বাড়িঘর ডুবে যায়, গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সময়মতো খাল খনন ও সংস্কার করা গেলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়হীনতা থাকলে প্রকল্পগুলোর সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না। এবারও তারই প্রতিফলন ঘটেছে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, প্রতিবছর বন্যায় তাদের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। খাল খনন হলে সেই দুর্ভোগ অনেকটাই কমত। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ায় তাদের ভোগান্তি বাড়ছে।
ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন সদস্য জানান, তারা বারবার প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু বরাদ্দ আসতে দেরি হওয়ায় এবং বর্ষা চলে আসায় কিছুই করা যায়নি। তারা আগামী অর্থবছরে যেন সময়মতো বরাদ্দ দেওয়া হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানান।