ভূমি অফিস
ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত তহশিলদার মো. আবুল বাশার © টিডিসি
ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত তহশিলদার মো. আবুল বাশারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত অফিস সময়ের বাইরে গভীর রাত পর্যন্ত অফিসে অবস্থান করে বিভিন্ন ভূমিসেবা দেওয়া হয় এবং এসব সেবার জন্য সরকারি ফির চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া হয়। সরেজমিন অনুসন্ধানেও গভীর রাতে তাকে অফিসকক্ষে সরকারি নথিপত্র নিয়ে কাজ করতে দেখা গেছে।
সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকার কথা সরকারি দপ্তরের নিয়মিত কার্যক্রম। কিন্তু ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিসে গভীর রাতে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। রাত ১১টার দিকে অফিসকক্ষে আলো জ্বলতে দেখা যায়। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। কয়েকবার কড়া নাড়ার পর ভেতর থেকে জানতে চাওয়া হয়, ‘কে, কী দরকার, কেন এসেছেন?’ পরে দরজা খুলে দেন পৌর ভূমি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত তহশিলদার মো. আবুল বাশার। তখন তাঁকে একাই সরকারি নথিপত্র নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়। এর আগে একই রাত প্রায় ৯টার দিকে অফিসের সামনে দুই ব্যক্তিকে কাগজপত্র হাতে তহশিলদার আবুল বাশারের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। পরে রাত ১১টার দিকে তহশিলদারের অনুমতি নিয়ে তিনজন গণমাধ্যমকর্মী অফিসকক্ষে প্রবেশ করেন। পুরো কথোপকথন গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে।
এত রাতে অফিসে অবস্থানের কারণ জানতে চাইলে তহশিলদার আবুল বাশার বলেন, ‘আমার কাজ থাকতে পারে, আমি কাজ করছি। এতে আপনাদের সমস্যা কোথায়?’ তিনি দাবি করেন, একাধিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সেটেলমেন্ট অফিসসহ বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। ফলে দিনের বেলায় সব কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না। নির্ধারিত অফিস সময়ের বাইরে একা অফিস খুলে সরকারি নথিপত্র নিয়ে কাজ করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘তা-ও ঠিক বলেছেন। আপনাদের যদি সমস্যা হয় আর আপনারা যদি বলেন, তাহলে আর রাত জেগে জনগণের সেবায় কাজ করব না।’
অন্যদিকে ভূমিসংক্রান্ত সেবা নিতে আসা কয়েকজন সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেন, দিনের নির্ধারিত সময়ে অনেক কাজ না করে তাদের সন্ধ্যা কিংবা রাতে অফিসে ডেকে নেওয়া হয়। পরে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করে দেওয়া হয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে রাতে সরেজমিন অনুসন্ধানে গেলে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। রাতে সেবাগ্রহীতারা অফিসে আসেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তহশিলদার প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে তথ্য-প্রমাণের বিষয়টি জানানো হলে বলেন, `আমার কাছে লোক আসতেই পারে, যেমন আপনারাও এসেছেন।' কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি বিষয়টি নিয়ে সামনে আর না এগোনোর অনুরোধ জানান। একই সময়ে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের চা-নাশতার খরচ হিসেবে নগদ টাকা দেওয়ারও চেষ্টা করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভূমি অফিসসংলগ্ন বারোচালা এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী জানান, তহশিলদারকে প্রায়ই রাত ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত অফিসে অবস্থান করতে দেখা যায়। গভীর রাতেও বিভিন্ন লোকজন তাঁর কাছে আসা-যাওয়া করেন। তবে ওই সময়ে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তা তাদের জানা নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মো. আবুল বাশার এর আগে দীর্ঘদিন ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিসে কর্মরত ছিলেন। পরে তিনি কীর্তিপাশা ভূমি অফিস এবং পোনাবালিয়া ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি পোনাবালিয়া ভূমি অফিসের পাশাপাশি ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কামারপট্টি এলাকার এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, তার বাবার জমির নামজারি করতে তহশিলদার প্রথমে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এ ছাড়া তাদের দোকান থেকে দুই হাজার টাকার বেশি মূল্যের মালামাল নেওয়া হলেও তার মূল্য পরিশোধ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সরকারি নামজারি ফি ১ হাজার ১৭০ টাকা হলেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তাকে বলা হয়, ‘তুমি এসব বুঝবে না, অনেক টেবিল পার হয়ে কাজ করাতে হয়।’
জানা গেছে, এর আগেও তহশিলদারের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল ঝালকাঠি সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর দেওয়া এক লিখিত অভিযোগে এক সেবাগ্রহীতা দাবি করেন, নামজারির জন্য তার কাছ থেকে ছয় হাজার টাকা নেওয়া হলেও সরকারি ডিসিআরে (ডুপ্লিকেট কার্বন রসিদ) উল্লেখ ছিল মাত্র ১ হাজার ১০০ টাকা।
অভিযোগের বিষয়ে ঝালকাঠি সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম মেহেদী হাসান বলেন, অভিযোগটি তদন্তাধীন রয়েছে। দাপ্তরিক প্রয়োজন থাকলে সরকারি ছুটির দিন বা নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ করা যেতে পারে। তবে ওই সময় কোনো সেবাগ্রহীতাকে সরকারি সেবা দেওয়া যাবে না।
তিনি আরও বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ঝালকাঠির সভাপতি সত্যবান সেন গুপ্ত বলেন, ভূমিসেবা সাধারণ মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবা। এ খাতে অনিয়ম বা অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে।