ইউপি চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম © সংগৃহীত
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন উপকূলীয় প্রতিরক্ষা বেড়িবাঁধ প্রকল্পে ফের হামলা, মারধর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বাধা ও চাঁদা দাবির লিখিত অভিযোগের কয়েক দিনের মাথায় এবার স্থানীয় বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, তার ছেলে এবং সহযোগীদের বিরুদ্ধে শ্যামনগর থানায় নিয়মিত মামলা করা হয়েছে।
রবিবার (২৫ মে) রাতে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান আর-রাদ করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন বাদী হয়ে এ মামলা করেন।
মামলায় বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর শূরা সদস্য হাজী মো. নজরুল ইসলামকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া তার ছেলে আ. রহমান, স্থানীয় বাসিন্দা বিশ্বজিৎ মণ্ডলসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, শ্যামনগরের পূর্ব দুর্গাবাটি এলাকায় খোলপেটুয়া, মালঞ্চ ও কালিন্দী নদীর তীররক্ষা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ করছে আর-রাদ করপোরেশন। অভিযোগ রয়েছে, গত বছরের আগস্ট থেকে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদা না দেওয়ায় গত ১৪ এপ্রিল থেকে প্রকল্পের কাজ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) ও পুলিশ প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হলে আসামিরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। গত ১৯ মে রাতে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম প্রকাশ্যে ১৫ লাখ টাকা দাবি করেন এবং টাকা না দিলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হত্যার হুমকি দেন।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, চাঁদা না পেয়ে গত ২৩ মে দুপুরে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও তার ছেলে আ. রহমান ৩০-৪০টি মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে প্রকল্প সাইটে হামলা চালান। সেখানে দায়িত্বরত প্রকৌশলী জাহিদ হাসানকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। তাকে বাঁচাতে গেলে কিউরিং ম্যান ফেরদৌসকেও মারধর করে আসামিরা। এ সময় প্রকৌশলী জাহিদের হাত থেকে একটি অ্যাপল আল্ট্রা স্মার্টওয়াচ ও নগদ টাকাসহ মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আহত প্রকৌশলী জাহিদ ও ফেরদৌস বর্তমানে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। ঘটনার পুরো বিবরণ প্রকল্প এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা আছে বলে বাদী পক্ষ নিশ্চিত করেছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান আর-রাদ করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সবুজ আলী খান বলেন, বর্ষার আগে কাজ শেষ করা না গেলে পুরো উপকূলীয় এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়বে। অথচ বারবার বাধা ও হুমকির কারণে কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর আগে গত ১৩ মে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া এই জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের পোল্ডার-৫ এলাকায় সিসি ব্লক স্থাপন ও জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে এ হামলার পর কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি জাইকার অর্থায়নে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাস্তবায়িত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারলে বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসে নতুন করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করবে।
হামলা ও মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বুড়িগোয়ালিনী ইউপি চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা হাজী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা হামলা, মারধর বা চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যেদিন হামলার কথা বলা হচ্ছে, ওই সময় আমি ইউনিয়ন পরিষদের অফিশিয়াল বাজেট অধিবেশনে ব্যস্ত ছিলাম। আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করতেই এই মামলা দেওয়া হয়েছে।’
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আমিনুর রহমান বলেন, ‘সম্প্রতি পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা তদন্ত করছিলাম। এর মধ্যেই প্রকল্প এলাকায় নতুন করে হামলা ও মারপিটের ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে শ্যামনগর থানায় নিয়মিত মামলা রুজু হয়েছে। পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। সরকারের এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প যাতে নির্বিঘ্নে শেষ হতে পারে, সে জন্য পুলিশ সর্বাত্মক নিরাপত্তা দেবে।’