চাকুরিজীবী না হয়ে যে কারণে উদ্যোক্তা হতে চায় তরুণরা

২২ আগস্ট ২০২১, ০১:১১ PM
সরকারি চাকুরির জন্য বছরের পর বছর সময় পার করছেন অনেকে

সরকারি চাকুরির জন্য বছরের পর বছর সময় পার করছেন অনেকে © সংগৃহীত

শাম্মি রহমান একসময় সরকারি চাকরি করবেন বলে স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। তিনি পেশা জীবনের শুরু করেছেন একটি আন্তর্জাতিক প্রসাধনী উৎপাদনকারী কোম্পানিতে। এরপর যোগ দেন দেশের অন্যতম প্রধান একটি মোবাইল ফোন কোম্পানিতে। কিন্তু সম্প্রতি তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজে ইস্তফা দিয়ে ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমার মাথার মধ্যে ছিল যে বেসরকারি চাকরিতে একটা সুন্দর পরিবেশ পাবো। এখানে কাজ পাওয়া যায়, বেতনও ভাল কিন্তু কাজ করতে গিয়ে দেখি যেখানে আমার কাজ আট ঘণ্টা সেখানে আমাকে অনেক বাড়তি সময় কাজ করতে হচ্ছে, বেতন ঠিক মতো দিচ্ছে না, সরকারি যে ছুটিগুলো আছে সেসব দিনেও কাজ করিয়ে নেয়া হয়।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তারা সবসময় তাদেরটাই দেখে। তাদের যখন দরকার হবে না তখন আর কাজ থাকবে না। কিন্তু যখন কাজের ক্ষেত্রে আমার প্রতি তাদের যেসব কমিটমেন্ট ছিল সেনিয়ে প্রশ্ন তুলবো তখন আর সেটা তাদের ভাল লাগে না।

চাকুরিজীবীদের কাজের পরিস্থিতি
২০১৮ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর করা শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬০ শতাংশ চাকুরিজীবী কাজ করেন ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ১৪ শতাংশ। যদিও সরকারি চাকুরির জন্য বছরের পর বছর সময় পার করছেন তরুণ প্রজন্মের অনেকে তবে সরকারি কাজে যুক্ত রয়েছেন মাত্র ৩ দশমিকের মতো চাকুরিজীবী।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ তরুণ প্রতি বছর নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করে।

ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ বিভাগের প্রধান নির্বাহী অজেয় রোহিতাশ্ব আল্ কাযী বলেন, তরুণ প্রজন্মের বেসরকারি চাকুরীতে আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে।

তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি চাকুরির বিষয়টা ছিল এরকম যে, বেসরকারিতে টাকা পাওয়া যাবে, কিছু ক্ষেত্রে সম্মানও পাওয়া যাবে কিন্তু নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না। গত ১০ বছরে তা উল্টে গেছে। সরকারি খাতে নিশ্চয়তাসহ যেভাবে বছর বছর বেতন বেড়েছে, বেসরকারি খাতে তা হয়নি।

“কিছুদিন আগেও নতুন গ্রাজুয়েটরা কর্পোরেট জবে আগ্রহী ছিল। এখন যখন দুটিরই বেতন সমান হয়ে যাচ্ছে তখন বেসরকারি চাকরি আর আকর্ষণ করছে না কিন্তু সরকারি চাকরি আছে কয়টা?” তাই অন্যকিছুতে তাদের ঝুঁকতেই হবে বলে মনে করছেন অজেয় রোহিতাশ্ব আল্ কাযী।

যেসব কাজে ঝুঁকছেন তরুণরা
বৈশ্বিক মহামারির কারণে সারা বিশ্বব্যাপী মানুষের পেশার উপরে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। কিন্তু একই সাথে নতুন ধরনের কাজও তৈরি হচ্ছে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০২০ সালে ই-কমার্সে ব্যাপকভাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

গত বছর ই-কমার্স খাতে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। গত বছর সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির সময় ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেনদেন ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। তাদের মতে বাংলাদেশে ই-কমার্সের প্রবৃদ্ধি হচ্ছিল কয়েক বছর ধরেই। মহামারির কারণে এর যে উর্ধ্বমুখী প্রবৃদ্ধি শুরু হয়েছে সেই ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

অজেয় রোহিতাশ্ব আল্ কাযী বলেন, এমন কোন জিনিস নেই যা আপনি অনলাইনে বা ফেসবুকে কিনতে পারবেন না। নতুন পাশ করা ছেলেমেয়েরা যারা চাকুরির জন্য চেষ্টা করছিলেন, প্যান্ডেমিকের কারণে পড়াশুনা বন্ধ হয়ে রয়েছে এমন ছেলেমেয়েরা, এমনকি যারা নানা পেশায় যুক্ত ছিলেন কিন্তু কাজ হারিয়েছেন বা বেতন কমে গেছে তারাও ই-কমার্সে যুক্ত হয়েছেন। তারা অসংখ্য তরুণকে চাকরিও দিয়েছেন।

পড়াশোনা বন্ধ হয়ে রয়েছে এমন অনেক তরুণ এখন গ্রামে ফিরে কৃষি কাজ করছেন, খামার তৈরি করেছেন, নানা ধরনের ক্ষুদ্র শিল্পের সাথ যুক্ত হচ্ছেন।

তরুণ প্রজন্মের অনেকেই দেশের বাইরে কাজে চলে যাচ্ছেন। আর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা তরুণরা কখনো আর চাকরী করবেন কিনা সে নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছেন মি. আল কাযী।

জামালপুরের বাসিন্দা রকিবুল হাসান খান ঢাকার একটি নামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু তিনি কোন ধরনের চাকরির চেষ্টাই করেননি। জামালপুরের হাতের কাজের শিল্প মাধ্যমকে বেছে নিয়ে নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন।

তিনি বলেন, আমার অনেক অফার ছিল। আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অনেকগুলো ফার্মে কনসালটেন্সি করেন। আমাকে বারবার কাজের অফার দিয়েছেন। কিন্তু আমার চাকুরি করার ইচ্ছে হয়নি।

জামালপুরে হাতের কাজের নকশার কারখানা তার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সেই নকশা ক্রয় করে, সেই নকশা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করে বিক্রি করে। রকিবুল হাসান খান বলেন, আমি আমার নিজের বস। আমি নিজেই আমার জীবনের নিয়ন্ত্রণ করি। আয় ইনশাআল্লাহ ভাল আবার আমি অনেকগুলো মানুষের কর্মসংস্থান করতে পেরেছি এটা আমার খুব ভালো লাগে।

অর্থনীতি যেদিকে তরুণদের নিচ্ছে
অর্থনীতি তার প্রয়োজনে যেসব পেশার জন্ম দিচ্ছে সেদিকেই তরুণ প্রজন্ম ঝুঁকছে বলে মনে করেন বাংলাদেশে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ। তিনি বলেন, অর্থনীতির প্রবণতা যেরকম, কর্মসংস্থান কিন্তু সেইরকম হবে। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি এই চাকরি করবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম বিষয়টা তেমন নয়। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, নতুন সেক্টর, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে কাজের জন্য নতুন এভেন্যু তৈরি হবে। ধরুন প্যান্ডেমিকের কারণে নতুন কাজ তৈরি হচ্ছে এবং তরুণ প্রজন্ম সেটার দিকেই যাবে।

তিনি মনে করেন অর্থনীতিতে পেশার প্রভাব ও পেশার উপরে অর্থনীতির প্রভাব দুটোই ঘটে থাকে যা একটি চক্রে মতো। তার মতে, প্রথাগত খাতগুলোতে যথেষ্ট চাকরি নেই। তাই মুখস্থবিদ্যায় পরীক্ষার ফলে সবচেয়ে উঁচু সারিতে না হলেও যারা কাজ জানে, স্মার্ট তাদের যেখানে কাজ হচ্ছে সেই সুযোগটা তারা নিচ্ছেন। আর তাছাড়া বেশ কিছুদিন যাবৎ বাংলাদেশে আইটি, নানা ধরনের প্রযুক্তি, ডিজিটালাইজেশনের সাথে যুক্ত অনেক বিষয়ে তরুণরা পড়াশোনা করেছে। তারা তাদের জন্য তৈরি নতুন কাজগুলোই নেবে।

দক্ষতা যেভাবে কাজকে নিয়ন্ত্রণ করে
চাকুরিদাতারা এখন যেসব দক্ষতা চাচ্ছেন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় তরুণরা তা অর্জন করতে পারেন না, বলছিলেন বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশীপ সেন্টারের প্রধান ইজাজ আহমেদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর পাশের সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু একজন তরুণ কোন পেশায় যাবেন তা অনেকটাই তার যে দক্ষতা আছে তার উপরে নির্ভর করে।

বাংলাদেশে সেটা হচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, চাকুরিদাতারা চাচ্ছেন সৃষ্টিশীল চিন্তা, সমস্যা সমাধান করা ও যোগাযোগের দক্ষতা। যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দিচ্ছে না। প্যান্ডেমিকের সময় স্কিলের ধরনও বদলে গেছে। চাকুরিদাতারা এখন প্রযুক্তিগত দক্ষতা চায়। যেমন কিভাবে ভার্চুয়ালি কাজ করবেন সেটা খুব জরুরি। এখন আমাদের জন্য যেটা জরুরি তা হল শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে এমপ্লয়মেন্টের যোগাযোগ তৈরি করা।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, বিআইজিডি এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে করা এক জরিপে দেখা গেছে বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কম্পিউটার ও ইংরেজি ভাষায় আত্মবিশ্বাসী মাত্র ১৬ শতাংশ। ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী চার হাজারেরও বেশি তরুণ-তরুণীর ওপর এ জরিপ পরিচালনা করা হয়।

ইজাজ আহমেদ বলেন, আমাদের সমাজে শিক্ষার সুযোগে একদম সমতা নেই। যেটা প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর থেকে। বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট কানেক্টিভিটির অভাবের কারণে ছেলেমেয়েরা পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়েছে।

তিনি মনে করেন, যত বেশি শিক্ষা তত বেশি বেকারত্ব দেখা যাচ্ছে। “বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজগুলো ডিগ্রি দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু এই ডিগ্রি দিয়ে ছেলেমেয়েরা কি করবে, সেই হিসেবটা আমরা করছি না। বাংলাদেশে যেহেতু চাকরির বাজার খুব ছোট, তাই এখন দরকার উদ্যোক্তা গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ দেয়া। এক্ষেত্রে অর্থের যোগানটা একটি সমস্যা। সেই জায়গাটা সমাধান করতে হবে।”

সূত্র: বিবিসি বাংলা

ঢাবিতে তরুণদের কানে ধরিয়ে উঠবস করানোর কারণ জানালেন সর্ব মিত…
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
‘সাদ্দামের লগে কী করছস’ বলে বাগেরহাটের ডিসি-এসপিকে হুমকি
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সংবিধানে যা যা বদলে যাবে, নতুন যুক্ত হ…
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
আজ কুষ্টিয়ায় যাচ্ছেন জামায়াত আমির
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীদের সাংবাদিকতায় প্রশিক্ষণ দিল কনকসাস
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
আ.লীগ নেতাকে ধরতে যাওয়া পুলিশের ওপর হামলা, ৩ এসআই আহত
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬