ইন্দ্রাণী বিশ্বাস (ছদ্ম নাম) ৩৩ বছর আগে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে কর্মজীবন শুরু করেন। গত কয়েক দশকে তার ক্যারিয়ারে পদোন্নতি হয়েছে।
কিন্তু তার জন্য সবথেকে হতাশাজনক বিষয়টি হলো পদোন্নতি শর্তেও তার বেতন বাড়েনি তো বটেই বরং ২৪ হাজার টাকা থেকে কমে ২২ হাজার ৫০০ টাকায় এসে দাড়িঁয়েছে।
উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতির পরও তার বেতন কমে যাওয়ায় ইন্দ্রাণী মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা মন্ত্রণালযয়ের কাছে তার সমস্যা সমাধানের জন্য দারস্থ হন কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি।
তিনি বলেন, পদোন্নতি পাওয়ার পর আমার আগের বেতনটাও কমে যাওয়া অপ্রত্যাশিত এবং হাস্যকর। আমি জানি না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কখন এই সমস্যা ঠিক করবে এবং আমাকে আমার সঠিক বেতন দেবে।
সারাদেশে প্রায় ৩০ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এটি শুধু শিক্ষক ইন্দ্রানীর গল্প নয়, সাম্প্রতিক সময়ে স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে প্রায় প্রত্যেক শিক্ষকের পদোন্নতি হলেও পূর্বের তুলনায় কম বেতনে কাজ করে যাচ্ছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা নিজেরাই এই বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক মো. বেলাল হোসেন বলেন, 'সরকার চলতি বছরের মে মাসে একটি নতুন অর্গানোগ্রাম করেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বেতন নিয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষকদের সমস্যার সমাধান করা হবে। আমরা এই অর্গানোগ্রাম সম্পর্কে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্পষ্টীকরণের জন্য অপেক্ষা করছি। আমি এই বিষয়ে দ্রুত সমাধানের ব্যাপারে আশাবাদী।'
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম রনি বলেন, “সহকারী শিক্ষক থেকে যারা সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন তাদের ২০ থেকে ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে।মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের পদোন্নতি দিয়েছে, কিন্তু তাদের বেতন কমিয়ে দিয়েছে। শিক্ষকরা আগের বেতন ফিরে পাবে কিনা সেই বিষয়ে আমি বেশ উদ্বিগ্ন।
এদিকে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, করোনা মহামারি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আমরা বেতন সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য মন্ত্রণালয়ের সামনে আমাদের দাবিগুলো পেশ করব। আশা করি সমস্যাটি সরকারের নতুন পরিকল্পনায় সমাধান করা হবে। যদি তা না হয় তবে আমরা পরবর্তীতে সেই অনুযায়ী কর্মপদ্ধতি ঠিক করব।
গত সার্কুলার অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেড অনুযায়ী তাদের বেতন পাওয়ার কথা থাকলেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতন কমিয়ে দেয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষকদের বেতন গণনার জন্য ব্যবহৃত সফটওয়্যারটি তাদের সর্বশেষ পদোন্নতির আগে প্রাপ্ত সুবিধাগুলো বাদ পরে যাওয়ায় শিক্ষকদের বেতন হ্রাস পেয়েছে।
এখানে ৬৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে যেখানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিক্ষক রয়েছেন এবং তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর মোহাম্মদ মনসুরুল আলম বলেন, আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানিয়েছি এবং তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
রংপুর ক্যাডেট কলেজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাওশোন আরা বীথি বলেন, অভিজ্ঞ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরা নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের তুলনায় কম বেতন পাচ্ছেন। এটি একটি বৈষম্যমূলক আচরণ। এতে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের বঞ্চিত করছে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. শামসুদ্দিন মাসুদ বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ না নিলে অন্তত এক লাখ শিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।