বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১১৮ ধরনের কৃষিপণ্য ও মৎস্য ৫০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে © টিডিসি
ফল, সবজি ও মাছের ফসলোত্তর অপচয় কমাতে সাশ্রয়ী ও আধুনিক ‘বিএইউ-এডিআই হাইব্রিড ড্রায়ার’ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। সৌরশক্তি ও বিদ্যুতের সমন্বয়ে পরিচালিত এ প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বিভিন্ন কৃষিপণ্য শুকানো সম্ভব হওয়ায় পুষ্টিগুণ সংরক্ষণ ও রপ্তানিযোগ্য মান উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ কর্মশালায় গবেষণার ফলাফল ও প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা তুলে ধরা হয়।
কর্মশালার সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মজিদ। প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা ড. তাপস কুমার পাল এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বাংলাদেশের প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার ও টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট অধ্যাপক ড. মো. মঞ্জুরুল আলম।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কৃষিপণ্য ও মৎস্যের ফসলোত্তর অপচয় হ্রাসে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী প্রকল্পের প্রধান গবেষক এবং কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. চয়ন কুমার সাহা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১১৮ ধরনের কৃষিপণ্য ও মৎস্য ৫০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে, তবে ফসলোত্তর অপচয় বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফল ও সবজির গড়ে প্রায় ৩২ শতাংশ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশের বেশি অপচয় হয়, আর মাছের ক্ষেত্রে এই হার ৭ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়।
এই প্রেক্ষাপটে উদ্ভাবিত হাইব্রিড সোলার ড্রায়ার প্রযুক্তি একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে কাজ করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ড. চয়ন কুমার সাহা বলেন, এই ড্রায়ারের বিশেষত্ব হলো- একই যন্ত্রে মাছ, সবজি, ফল ও ভেষজ পণ্য স্বাস্থ্যসম্মতভাবে শুকানো সম্ভব। এটি সৌরশক্তি ও গ্রিড বিদ্যুতের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়, দিনের বেলায় সম্পূর্ণ সৌরশক্তিতে এবং রাতে বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিদ্যুৎচালিত হিটিং সিস্টেমের মাধ্যমে শুকানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।
তিনি আরও বলেন, প্রচলিত খোলা রোদে শুকানোর তুলনায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে খাদ্যের পুষ্টিগুণ ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বজায় রাখা সম্ভব। প্রি-ট্রিটমেন্ট পদ্ধতি অনুসরণ করলে পণ্যের গুণগত মান আরও উন্নত থাকে এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আর্দ্রতা কমিয়ে ফসলোত্তর ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা যায়। যন্ত্রটির দামও তুলনামূলক কম, মাত্র ২ লাখ। দেশে সহজেই পাওয়া যায় এমন উপাদান দিয়েই যন্ত্রটি প্রস্তুত করা ফলে, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহারপ্রণালীও খুবই সহজ।
ড্রায়ারটির প্রযুক্তিগত দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, এতে আইওটিভিত্তিক স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সৌরশক্তি কমে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈদ্যুতিক হিটার চালু হয়ে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন শুকানোর সুবিধা নিশ্চিত করে। প্রতিটি ব্যাচে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কেজি পণ্য শুকানোর সক্ষমতা রয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি পোকামাকড়, ধুলা ও দূষণমুক্ত নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন হয়।
তিনি আরও জানান, নাইট্রোজেন গ্যাস সমৃদ্ধ প্যাকেজিং ও ভ্যাকিউম প্যাকেজিং ব্যবস্থার মাধ্যমে শুকানো পণ্যের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য ও পুষ্টিগুণ দীর্ঘসময় ধরে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়, যা রপ্তানিযোগ্য মান নিশ্চিত করতে সহায়ক।
প্রকল্পের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতি উল হাসান জানান, এই প্রকল্পের আওতায় মোট ২০টি হাইব্রিড ড্রায়ার নির্মাণ করা হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফল দিচ্ছে।
প্রযুক্তিটির ব্যবহারিক দিক তুলে ধরে চরমোন্তাজ শুটকি উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক নূর শাহিদা বলেন, আগে রোদে মাছ শুকাতে গিয়ে অনেক সময় সমানভাবে শুকানো যেত না এবং পোকামাকড়ের কারণে ক্ষতির মুখে পড়তে হতো। এখন এই ড্রায়ারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সব ধরনের মাছ সঠিকভাবে শুকানো সম্ভব হচ্ছে এবং আবহাওয়ার ওপর নির্ভরতা কমেছে।
চট্টগ্রামের উদ্যোক্তা ফাতেমা ইসলাম বলেন, কেমিক্যালমুক্ত, অর্থাৎ বিষমুক্ত নিরাপদ শুটকি উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছেন। ড্রায়ারের মাধ্যমে এখন তিনি মানসম্মত ও নিরাপদ পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি বিদেশেও সরবরাহ করতে পারছেন।
পরে উপস্থিত সবার অংশগ্রহণে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি নিয়ে মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উপস্থিত সকলে এর সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ প্রয়োগ নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. ফজলুল হক ভূইয়া বলেন, ‘এ গবেষণাটি প্রয়োজনভিত্তিক ও সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। এ ধরনের মানসম্মত গবেষণা কার্যক্রমে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) প্রশাসন সবসময়ই সহায়তা ও সহযোগিতা প্রদান করে আসছে। প্রকল্পটির বিভিন্ন প্রতিপাদ্য বিষয়কে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে এবং আশা করছি, নির্ধারিত লক্ষ্যসমূহ সফলভাবে অর্জিত হবে। এ গবেষণা সমন্বিত ও স্বল্প খরচের ড্রায়িং সিস্টেম উন্নয়নে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। ভবিষ্যতের সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’