‘ফেল’ তকমায় যেন থমকে না যায় ভবিষ্যৎ, এসএসসি অনুত্তীর্ণদের পাশে দাঁড়াতে যত প্রস্তাব

১০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৭ PM , আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৩ PM
অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর দায় কি শুধু তারই?

অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর দায় কি শুধু তারই? © এআই ছবি

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার দায় কি শুধু শিক্ষার্থীর? দারিদ্র্য, কোচিংনির্ভরতা, শিক্ষকস্বল্পতা ও পাঠদানের দুর্বলতাও কি এর জন্য দায়ী নয়? এমন প্রশ্ন সামনে রেখে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় একাধিক প্রস্তাব এসেছে এক সম্মেলনে। এক বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্যদের তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষা, বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ক্লাস, শিক্ষকদের জবাবদিহি, দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একটি পরীক্ষার ফল যেন কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের পথ বন্ধ করে না দেয় এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।

আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের উইন্ডি টাউনে গণসাক্ষরতা অভিযান ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থী সম্মেলন-২০২৬’-এ এসব প্রস্তাব ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা গবেষক ও উন্নয়নকর্মীরা। দেশের আট বিভাগের দুই শতাধিক শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।

নিম্নবিত্তের সন্তানেরা বেশি অকৃতকার্য
সম্মেলনে উঠে আসা অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, আর্থিক অসচ্ছলতা শিক্ষার্থীদের ফলাফলে প্রভাব ফেলছে। কোচিংয়ের ব্যয় বহন করতে না পারা, শিক্ষক স্বল্পতা ও বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবেও পিছিয়ে পড়ছে অনেক শিক্ষার্থী।

এক গৃহকর্মী অভিভাবক তাঁর মেয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, মেয়েটি বরাবরই ভালো ফল করত। শ্রেণিতে তার রোল নম্বর থাকত প্রথম ১০ জনের মধ্যে। বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার পাশাপাশি চিকিৎসক হতে না পারলেও নার্সিংয়ে পড়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষায় রসায়নে অকৃতকার্য হওয়ায় সেই স্বপ্ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ওই অভিভাবক বলেন, তাঁর মেয়ের স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষার্থী ‘সায়েন্স’ নামের একটি কোচিংয়ে পড়ত। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় মেয়েকে সেখানে পড়াতে পারেননি তিনি। গৃহকর্মী হিসেবে কঠোর পরিশ্রম করে মেয়েকে এসএসসি পর্যন্ত পড়িয়েছেন। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর মেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

তিনি সরকারের কাছে অনুরোধ জানান, দরিদ্র শিক্ষার্থীরা যেন একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে জীবন থেকে পিছিয়ে না পড়ে। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

সম্মেলনের বক্তারা বলেন, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর শিক্ষার সুযোগ নির্ভর করলে বৈষম্য আরও বাড়বে। তাই বিদ্যালয়ে কার্যকর পাঠদান, দুর্বল শিক্ষার্থীদের বাড়তি সহায়তা এবং কোচিংনির্ভরতা কমানোর ব্যবস্থা জরুরি।

শিক্ষকস্বল্পতায় পিছিয়ে চা বাগানের শিক্ষার্থীরা
চা বাগানের এক অভিভাবক জানান, তাঁদের কাছাকাছি উচ্চবিদ্যালয়ও প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে। দারিদ্র্যের কারণে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন খরচ, কোচিংয়ের ব্যয় ও যাতায়াতের দূরত্ব পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।

তিনি বলেন, সন্তানদের পিছিয়ে পড়ার পেছনে আর্থিক সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা ও শিক্ষকদের অমনোযোগিতার মতো কারণ রয়েছে। শহরের শিক্ষার্থীরা যেসব সুযোগ পায়, চা বাগানের শিশুরাও সেই সুযোগ পাওয়ার অধিকার রাখে। চা বাগান এলাকায় মাদকের প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

সম্মেলনে আলোচকেরা বলেন, প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের সমস্যা চিহ্নিত করতে পারিবারিক অবস্থা, বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর সুযোগ, শিক্ষকের উপস্থিতি ও পাঠদানের মান বিবেচনায় নিতে হবে। শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের সুযোগের বৈষম্য কমাতে অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত পাঠদান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা জরুরি।

দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার প্রস্তাব
দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক সংকটকে বড় বাধা হিসেবে তুলে ধরেন অভিভাবক ও উন্নয়নকর্মীরা। তাঁদের মতে, ভর্তি ও পরীক্ষার ফি ছাড়াও বইপত্র, যাতায়াত, পোশাক এবং অতিরিক্ত পড়াশোনার খরচ অনেক পরিবারের ওপর চাপ তৈরি করে। এতে কেউ নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, আবার কেউ পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার প্রস্তাব দেন অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, শ্রমজীবী পরিবার ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শিক্ষার ব্যয় কমানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।

বক্তারা বলেন, বিদ্যালয়ে মানসম্মত পাঠদান ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করা গেলে কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।

শিক্ষার্থীর পাশাপাশি শিক্ষকেরও মূল্যায়ন
শিক্ষার্থীদের ফলাফলের পাশাপাশি শিক্ষকদের পাঠদানের কার্যকারিতা মূল্যায়নের আওতায় আনার প্রস্তাব দেন সম্মেলনের এক অংশগ্রহণকারী। তার মতে, কোনো শিক্ষার্থী বা বিদ্যালয়ের ফল খারাপ হলে তার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের প্রতিবছর মূল্যায়ন করা হলেও শিক্ষকদের কার্যকারিতা নিয়ে একইভাবে স্বচ্ছ মূল্যায়ন হয় কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে।

বক্তারা বলেন, শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হলেই তাদের অযোগ্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক আছেন কি না, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক দিয়ে পাঠদান হচ্ছে কি না, নিয়মিত ক্লাস হয় কি না এবং শিক্ষার্থীরা পাঠ বুঝতে পারছে কি না, তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কোনো বিদ্যালয়ে ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফল হলে শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী না করে পাঠদান ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও খতিয়ে দেখতে হবে।

শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা নিশ্চিত করা, পাঠদানের মান পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত তদারকি জোরদারের প্রস্তাবও দেন তাঁরা। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার সুযোগ এবং সহায়ক ও মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা। প্রশ্ন করলে অপমান বা তিরস্কারের শিকার হওয়ার মতো পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে বলেও তাঁরা মনে করেন।

একাধিক পরীক্ষকে খাতা মূল্যায়নের প্রস্তাব
পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার প্রস্তাবও এসেছে সম্মেলনে। এক অংশগ্রহণকারী বলেন, একজন পরীক্ষকের মূল্যায়নের ওপরই শিক্ষার্থীর চূড়ান্ত ফল নির্ভর করে। কিন্তু মূল্যায়নে ভুল হতে পারে। পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের পর ফল পরিবর্তনের ঘটনাও দেখা যায়।

এ পরিস্থিতিতে দুই বা তিনজন পরীক্ষক দিয়ে গোপনীয়ভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং তাদের দেওয়া নম্বরের গড়ের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের প্রস্তাব দেন তিনি। এতে মূল্যায়নগত ভুলের কারণে কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা কমবে বলে মনে করেন তিনি।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ও পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করার ওপর গুরুত্ব দেন। তবে একাধিক পরীক্ষকের মূল্যায়ন বা গড় নম্বরের ভিত্তিতে ফল প্রকাশের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।

বিদ্যালয়েই অতিরিক্ত ক্লাসের প্রস্তাব
কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিদ্যালয়ে তিন মাসের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. গোলাম রহমান। তিনি বলেন, এ ব্যবস্থায় অকৃতকার্য ও পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে।

বিদ্যালয়ের বাইরে আলাদা কোচিংয়ের ব্যবস্থা না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এ জন্য অতিরিক্ত সময় পাঠদানকারী শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনার প্রস্তাব দেন তিনি।

নিজের বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অধ্যাপক গোলাম রহমান জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সহায়তার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভালো ফল করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য সৃজনশীল কার্যক্রমের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। এতে কর্মজীবী অভিভাবকেরাও তাঁদের সন্তানদের নিরাপদ পরিবেশে বেশি সময় বিদ্যালয়ে রাখতে পারবেন।

অন্য বক্তারাও বলেন, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে নিয়মিত সহায়তা, পরামর্শ ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে পরীক্ষার আগে ব্যয়বহুল কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।

কারিগরি শিক্ষায় যুক্ত করার তাগিদ
এসএসসিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন বাংলাদেশ-কোরিয়া টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে এক দশকের বেশি সময় অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এক সরকারি প্রকৌশলী। তিনি বলেন, সব শিক্ষার্থী একই সময়ে বা একই পদ্ধতিতে সফল হবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। সাধারণ শিক্ষায় প্রত্যাশিত ফল করতে না পারা শিক্ষার্থীদের দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দেশের বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে চালু থাকা কোর্সগুলোর সুযোগ শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং কেউ যেন প্রশিক্ষণ থেকে বাদ না পড়ে, সে জন্য সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সম্মেলনে সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে এসএসসিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাবও আসে। তবে কারিগরি শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার বিকল্প হিসেবে চাপিয়ে না দিয়ে শিক্ষার্থীর পছন্দ ও যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা ও আগ্রহ অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার গঠন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কারও জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ, কারও জন্য ভাষা শিক্ষা এবং যাঁদের ব্যবসায়িক ধারণা রয়েছে, তাঁদের জন্য প্রাথমিক অর্থায়নের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বিবেচনায় জাপানি, কোরীয়, চীনা ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন ভাষা শেখানোর সুযোগ তৈরির বিষয়টিও ভাবা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের জন্য দক্ষতা অর্জন ও জীবিকার পথ তৈরি করা।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের বিকল্প বিষয় চান
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য কারিকুলাম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি আরও উপযোগী করার প্রস্তাব দেন প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কাজ করা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি আশরাফুন নাহার মিষ্টি।

তিনি বলেন, শ্রবণ বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধিতা থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যমান কারিকুলাম সব সময় উপযোগী হয় না। তাই তাঁদের সক্ষমতা ও প্রয়োজন বিবেচনায় বিকল্প বিষয়ের ব্যবস্থা থাকা উচিত।

বিশেষ করে এসএসসির দশটি বিষয়ের মধ্যে কোনো একটি বিষয়ে বিকল্প ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়, যাতে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা বা বিশেষ শিক্ষাগত চাহিদা থাকা শিক্ষার্থীরা নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী মূল্যায়নের সুযোগ পায়। প্রতিবন্ধিতার ধরন, শেখার প্রয়োজন ও সক্ষমতা বিবেচনা না করে সবার ওপর একই মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রয়োগ করলে অনেকে অযথা পিছিয়ে পড়তে পারে বলে মনে করেন বক্তারা।

এ ছাড়া এক বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ, প্রান্তিক ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা এবং শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

গবেষণার ভিত্তিতে কারিকুলাম পর্যালোচনার তাগিদ
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত শিখনফল অর্জন করতে না পারলে তার কারণ চিহ্নিত করতে হবে। শুধু ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের বিচার না করে পাঠদান, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, কারিকুলাম নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার। তবে গবেষণা, পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত ছাড়া হঠাৎ করে কারিকুলামে পরিবর্তন আনা উচিত নয়। নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

তিন মাসে পুনঃপরীক্ষার সুযোগের দাবি
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, কোনো শিক্ষার্থী এক বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হলে তাকে পরবর্তী বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি এড়াতে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সম্পূরক বা পুনঃপরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন তাঁরা।

একজন অংশগ্রহণকারী বলেন, দ্রুত পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা গেলে শিক্ষার্থীরা পরবর্তী শিক্ষাজীবনে এগিয়ে যেতে পারবে। আর যারা পুনঃপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে না, তাদের জন্যও বিকল্প শিক্ষার পথ খোলা রাখা প্রয়োজন। এ ছাড়া এক বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি অন্তত দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কলেজে ভর্তির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও ওঠে।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ‘শিক্ষক ও অভিভাবকেরা এক বছর অপেক্ষা না করে তিন মাসের মধ্যে আবার পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। সরকার বিষয়টি সর্বোচ্চ ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।’

তবে পুনঃপরীক্ষা বা কলেজে ভর্তির বিষয়ে সম্মেলনে কোনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।

মাহদী আমিন বলেন, এসএসসিতে ভালো ফল করলেই জীবনে সফলতা নিশ্চিত হয় না। একইভাবে খারাপ ফল করলেই কাউকে ব্যর্থ বলা যায় না। আর্থিক সংকট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালো শিক্ষকের অভাব, দুর্বল অবকাঠামো, অসুস্থতা ও পারিবারিক সমস্যাসহ নানা কারণে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত ফল করতে পারে না। তাই অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্যোগ নেওয়ার আগে ফল খারাপ হওয়ার কারণ চিহ্নিত করতে হবে।

তিনি বলেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকার ইতিবাচকভাবে কাজ করতে চায়। পুনঃপরীক্ষার সুযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা প্রয়োজন।

শিক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের শুধু পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বিদ্যালয়ের পাঠদানের মান উন্নয়ন, শিক্ষকস্বল্পতা দূর করা, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিয়মিত তদারকি, শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা শনাক্ত করতে বিদ্যালয়ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ জোরদার, নিয়মিত অভিভাবক সভা আয়োজন এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকি দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব দেন তারা। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, শিক্ষক, অভিভাবক ও উন্নয়ন সংস্থার সমন্বিত অংশগ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণ, এর ফলে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ এবং উত্তরণের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে. চৌধুরীর সভাপতিত্বে সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. ইরাম মারিয়াম, প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আরিফুর রহমান, লেখক ও অনুপ্রেরণামূলক বক্তা সাদাত হোসাইনসহ অনেকে।

দানবীর ড. সৈয়দ রাগীব আলীকে সংবর্ধনা দিল লিডিং ইউনিভার্সিটি
  • ১০ অক্টোবর ২০২৬
জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে ড্যাফোডিলে শুরু হলো ‘সাসটেইনে…
  • ১০ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস: মানসিক সুস্থতা হোক বিএনপি সরকা…
  • ১০ অক্টোবর ২০২৬
৫৮ কর্মচারী নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে, আবেদ…
  • ১০ অক্টোবর ২০২৬
ওয়ালটনের সোলার ইকোসিস্টেম উন্মোচন করলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্…
  • ১০ অক্টোবর ২০২৬
রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা, যাত্রীসেবা বন্ধ
  • ১০ অক্টোবর ২০২৬