© টিডিসি ফটো
বৈশ্বিক মহামারি করোনায় থমকে গেছে গোটা বিশ্ব। লকডাউনের এই সময়ে অর্থনৈতিক অবস্থাও নাজুক। দেশে করোনার প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ায় গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ অবস্থায় ঘরে বসে অলস সময় পার করছেন শিক্ষার্থীরা।
তবে এই বিরূপ পরিস্থিতিতেও থেমে থাকেননি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) মার্কেটিং বিভাগের ছাত্রী কানিজ সুলতানা। করোনাকালে এই তরুণী যুক্ত হলেন ই-কমার্স প্লাটফর্মে। আর নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে পেয়েছেন অন্যরকম সফলতাও।
চবির ফাইনাল সেমিস্টারের এই ছাত্রী উদ্যোক্তা হিসেবে মাত্র ৩ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করে এখন প্রতিমাসে তার আয় এখন লাখ টাকা। দেশী তাঁতের শাড়ি ও তাঁতের থ্রি পিস নিয়ে শুরু করে ই-কমার্স উদ্যোগ Mayabikoinya-মায়াবীকইন্যা। দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের সাক্ষাৎকারে জানালেন তার উদ্যোক্তা হয়ে উঠার। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জিসান মাহমুদ-
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুটা কিভাবে তৈরি হলো?
কানিজ সুলতানা: আমার বেড়ে উঠা চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে চলে আসি চট্টগ্রামে। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম বড় কিছু হবার কিংবা নিজে কিছু করার। যাঁরা নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ভূমিকায় নিজেদের দাঁড় করিয়েছেন বলতে গেলে আমি তাদের একজন। গত পহেলা জুন আমার যাত্রা শুরু। আমার উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তা ক্লাস নাইন থেকে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী এবং সফল উদ্যোক্তাদের জীবনী পড়েই অনুপ্রাণিত হওয়া। সেই সূত্র থেকে গত ৩ বছর ধরে উদ্যোক্তা হওয়ার পরিকল্পনা শুরু হলেও সন্দ্বীপ সে সুযোগ ছিলনা।
এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে চট্টগ্রাম আসলেও হলে থেকে করা সম্ভব হয়নি। 'We' (Women and e-commerce forum) নামে একটা গ্রুপ আছে যেখানে আমি ১১ মাস ধরে টুকটাক লিখতাম। যেখানে গ্রুপ এডমিনরা দেশী পণ্যের প্রচার করেন। গত কয়েক বছর বাংলাদেশে বিদেশী পোশাকের রমরমা ছিলো। আর আমি ছিলাম দেশী পোশাকের প্রতি আকৃষ্ট। তাই 'We' গ্রুপের প্রচারের ফলে ২ মাস আগে শুরু করি। আর করোনা পরিস্থিতিতে টিউশন বন্ধ থাকায় বাসায় বসে ছিলাম। এদিকে পারিবারিক আর্থিক সমস্যাও প্রবল হলো। পরিবারের বড় মেয়ে আর বাবা না থাকায় পরিবারের দায়িত্ব নেওয়াটাও মাথায় ছিলো। এই সাহস থেকেই শুরু করা।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: কি নিয়ে কাজ করছেন?
কানিজ সুলতানা: বর্তমানে দেশী তাঁতের শাড়ি এবং তাঁতের ত্রিপিস নিয়ে কাজ করছি। সরাসরি তাঁতীদের ডিজাইন থেকে সিলেকশন করে কিছু কিছু নিজে ফিউশন করে ক্রেতাদের চাহিদা মিটাচ্ছি। ভবিষ্যতে ক্রেতার চাহিদা অনুসারে নতুন নতুন দেশী পোশাক আনতে পারবো বলে আমার বিশ্বাস।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: চ্যালেঞ্জগুলো কিভাবে মোকাবিলা করেন?
কানিজ সুলতানা: ই-কমার্স বিজনেসে ডেলিভারির বিষয়টি অনেক বড় সমস্যা। তাই চট্টগ্রাম শহরে বিভিন্ন ডেলিভারি কোম্পানি দিয়ে কাজ করতে হয়। যাতায়াত সমাস্যার কারণে সন্দ্বীপে তো এটা খুবই চ্যালেঞ্জিং কাজ। বর্তমানে সেখানে নিজস্ব ডেলিভারি বয় রেখেছি। এক্ষেত্রে আমার বন্ধুরা অনেক বেশি সাহায্য করতেছে। শুরুতে এই যাত্রায় অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। মেয়ে হওয়াতে বাধাটা একটু বেশিই ছিলো। পরিবার, প্রতিবেশিরা একটু নেগেটিভলি দেখে। এমনকি আমার শিক্ষিত বন্ধু-বান্ধবীরাও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। তবে বলা বাহুল্য যে অনেকেই অনেক বেশি উৎসাহ দিয়েছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। এমন কি প্রোডাক্ট ডেলিভারিতেও সাহায্য করতেছে। তাই নেগেটিভ কথা গুলো কে মাথায় না নিয়ে পজেটিভ গুলো নিয়েই নিজের মতোই কাজ করে যাচ্ছি।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: উই থেকে প্রাপ্তিগুলো কি?
কানিজ সুলতানা: 'We' (Women and e-commerce forum) দেশী পণ্যের সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম। 'উই'তে এসে আমার এগিয়ে চলা। আমরা যারা দেশী পণ্য নিয়ে কাজ করি তাদের জন্য 'উই' ফেসবুক গ্রুপ একটা আত্নবিশ্বাসের জায়গা। উইতে এসে যে সম্মান পেয়েছি তা বলা বাহুল্য। এক্ষেত্রে 'উই' এর রাজীব আহমেদ স্যার সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে যেখানে বাসায় অলস সময় পার করতে হতো, সেখানে 'উই'তে এক্টিভ থেকে লাখ টাকা সেল করতে পেরেছি এবং এখনো করে যাচ্ছি।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: সফলতার পিছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশী?
কানিজ সুলতানা: সফল হওয়ার জন্য আব্বু-আম্মুর দোয়াটা আমার জীবনে কাজে লাগছে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ উনাদের সব সময় ইচ্ছে ছিলো গ্রামের মেয়ে হলেও পড়াশোনা করে যেনো বড় হয়৷ পড়াশোনার জন্য সব সাপোর্ট করেছেন আব্বু। আব্বু মারা যাওয়ার পর পরিবারের দায়িত্বটা স্বাভাবিক ভাবে এসে গেছে। পারিপার্শ্বিক চাপ ছিলো মাথায়। আমাকে ও আমার পরিবারকে যাতে কারো কাছে হাত পাততে না হয়। আর আম্মু অনেক সাপোর্ট করে আমি সৎভাবে যায় করিনা কেনো। আজ তাদের দোয়ায় আমি লাখপতি। প্রতিমাসে আমার লাখ টাকার সেল হয়। সেজন্য মায়াবীকইন্যার প্রতিটা প্রোডাক্টের সাথে আমার পক্ষ থেকে ভালোবাসার উপহারস্বরুপ চিরকুট দেওয়া হয়।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
কানিজ সুলতানা: সন্দ্বীপ ই-কমার্সকে প্রসার করানো আমার সব সময়ই ইচ্ছে ছিল৷ সন্দ্বীপে আমার বড় হওয়া স্কুল-কলেজ সব ওখানে। সবসময় আলাদা টান ছিলো। আমাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইবা বোর্ডে যখন জিজ্ঞেস করেছিলো তখনো আমি বলেছিলাম সন্দ্বীপের মেয়েদের জন্য কিছু করতে চাই। ইনশাআল্লাহ আমি ওখানে ই-কমার্স প্রসারের চেষ্টা করবো যাতে সন্দ্বীপ গ্রাম হলেও মেয়েরা ই-কমার্সকে কাজে লাগিয়ে কিছু করতে পারে। ইতোমধ্যে আমি কয়েকজনকে পরিকল্পনা দিয়েছি। তারা কি করতে চাই সেজন্য আমি সব সাহায্য করবো৷ কয়েকটা শপেও আমি আমার ডিজাইনার শাড়ি দেওয়ার কথা চলতেছে। আশা করি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের টাকা আর বিদেশী পোশাকে খরচ হবেনা।
দেশী পণ্যের ব্যবহারের মাধ্যমে তার যথোপযুক্ত ব্যবহার হবে। আমরা যদি বিদেশি পণ্যের ব্যবহার কমিয়ে, আমাদের দেশীয় পণ্য ব্যবহার করি। তাহলে দেখা যাবে একদিকে আমাদের দেশীয় সম্পদ আমাদের দেশেই থাকবে। আর অন্যদিকে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মরা দেশীয় সম্পদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবে এবং তারা তা নিয়ে কিছু করার চিন্তা ভাবনা করবে। ভবিষ্যতে আমি এই পেশায় থাকতে চাই কারণ ২ মাসে আমি যে ভালোবাসা পেয়েছি সবার, সেক্ষেত্রে আমি সামনে এগিয়ে যেতে পারবো বলে আমার বিশ্বাস।