২০১৯ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের একজন নতুন ছাত্র আমি। রীতি অনুযায়ী আমাদের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ নবীনদের বরণ করে নিতে মার্চ মাসে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সেখানে নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি ও অভিনয়সহ বেশ কিছু চমৎকার ইভেন্টের অন্তর্ভুক্তি ছিল। এগুলোর ছাড়া একটা ইভেন্ট ছিল, যেটি আমাদের বিভাগের দশম ব্যাচের শিক্ষার্থী শাহপরান ভাইয়ের অভিনীত মাইম বা মূকাভিনয়। এটিই আমার জীবনে দেখা প্রথম মূকাভিনয়। কোনরকম কথা না বলে শুধু শরীরের বাচনভঙ্গি দিয়েই বিরাট গল্পের প্রদর্শনী দর্শকের মনে যেন এক বাস্তব দৃশ্যপট তৈরি করে, এই মূকাভিনয়।
ঘুম থেকে ওঠা, ফ্রেশ হয়ে কোথাও যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়া, হেঁটে যাওয়া, ভিড় ঠেলে লোকাল বাসে উঠা, গাদাগাদি করে দাঁড়ানো, গাড়ি ভাড়া দেয়া, দৌড়াদৌড়ি করা, ফোনে কথা বলা ও পাইপ বেয়ে দুতলায় উঠা, এমনকি বেশ কয়েকটি যৌথ চরিত্রের অভিনয়ও শুধু এই বাচনভঙ্গির মাধ্যমেই মাত্র একজন ব্যক্তি কর্তৃক প্রদর্শিত হওয়ার ব্যাপারটি আমাকে রীতিমত অবাক করেছিল এবং এই শো’টি দেখেই আমি মূকাভিনয় শিখতে উৎসাহিত হয়েছিলাম।
আর খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, যিনি অনুষ্ঠানে মাইম পরিবেশন করেছেন তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশনের সদস্য। এজন্য পরে আমি নিজেও এই সংগঠনের সদস্য হিসেবে যোগদান করি এবং সাপ্তাহিক কর্মশালাগুলিতে অংশগ্রহণ করতে থাকি। কিছুদিন যেতে না যেতেই অভিনয়ের জন্য আমাদের সামনে একটি গল্প হাজির করা হলো। যেটি জুলাই মাসের ৩০ তারিখে ডাকসুর আয়োজনে টিএসসিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ধর্ষণবিরোধী ‘জম্বি’ নামের এই মাইমোড্রামাটি প্রায় এক ঘন্টা ধরে প্রদর্শিত হয়েছিল। এই শো’তে আমরা অর্ধশতাধিক শিল্পী অংশগ্রহণ করেছিলাম। আর পুরো গল্পটা সাজানোসহ সার্বিক দিক নির্দেশনায় ছিলেন এক উদীয়মান তরুণ। একটানা কিছুদিন রিহার্সেলে অংশ নেয়ার কারণে তাকে খুব কাছ থেকে দেখা, চেনা ও জানার সুযোগ আমার হয়েছিল।
হ্যাঁ, বলছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ ও ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মীর লোকমানের কথা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে, মীর লোকমান ও মূকাভিনয় যেন একটি প্রতিশব্দ। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এই বিনোদন মাধ্যমটি পশ্চিমা বিশ্বসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার দাবিদার। বাংলাদেশে মূকাভিনয় অনেক আগে থেকে শুরু হলেও, এর প্রচার-প্রকাশ ঘটিয়ে দেশের সর্বত্র পুরোপুরি ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
তারপরও বিশ্ব বিখ্যাত মূকাভিনেতা পার্থ প্রতিম মজুমদার, কাজী মশহুরুল হুদা ও রঞ্জন চক্রবর্তীসহ অনেকেই মূকাভিনয়কে সর্বত্র মানুষের মাঝে পৌঁছাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন বা করে যাচ্ছেন। মীর লোকমান তাদের মধ্যকার অন্যতম। তার স্বপ্ন হলো প্রাচীন ও অন্যতম এই শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম, মূকাভিনয়কে পুরো দেশব্যাপী জনপ্রিয় করে তোলা।
নরসিংদীর এক প্রত্যন্ত এলাকায় জন্ম এই দৃঢ়চেতা তরুণের। ২০০৩ সালে নরসিংদীতে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মূকাভিনয় দেখে তার কাছে ভালো লাগে এবং তা শেখার আগ্রহ জন্মায়। তারপর একা একা প্র্যাকটিস করে, ২০০৬ সালে এক কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মূকাভিনয় করে অডিয়েন্সকে অবাক করে দেয়। ২০০৯ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মূকাভিনয়ের পরিবেশনা দেখে মূকাভিনয়কে মনেপ্রাণে ভালোবেসে ফেলেন এবং শেখার আগ্রহও অনেকটা বৃদ্ধি পায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ১৫ দিনব্যাপী কর্মশালাতে অংশ নিয়ে মূকাভিনয় শিখতে শুরু করেন এবং পরবর্তীতে মূল অনুষ্ঠানে অভিনয় করে তিনি দর্শকের পঞ্চমুখী প্রশংসায় ব্যাপক উৎসাহ পান। এভাবেই শুরু হয়েছিল তার মূকাভিনয় জীবনের পথযাত্রা।

তারপর ২০১১ সালে ফেব্রুয়ারির ২৭ তারিখে কয়েকজন বন্ধু মিলে, ‘না বলা কথাগুলো না বলেই হোক বলা’, এই শ্লোগানকে সামনে রেখে, ঢাবির টিএসসিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশন (ডুমা-DUMA)’। এই সংগঠনের ব্যানারেই তার জীবনে মূকাভিনয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। ছোট্ট পরিসরে প্রতিষ্ঠিত হলেও তার প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বাজেটভুক্ত প্রতিষ্ঠান। এখানে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নয় বরং এতে যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও মাইম শেখার সুযোগ প্রদান করা হয়। এমনকি টিএসসির আশেপাশের পথ শিশুদের অনেকেই এর বিভিন্ন শো দেখে মূকাভিনয়কে খুব ভালোভাবেই আয়ত্ত করে ফেলেছে।
সময়ের প্রয়োজনে মীর লোকমান ধাপে ধাপে বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির কাছে মূকাভিনয় শিখেছেন। তাদের মধ্যে কাজী মাশহুরুল হুদা, পার্থ প্রতিম মজুমদার, রণেন চক্রবর্তী, লরেন ডিকল ও পদ্মশ্রী নিরঞ্জন গোস্বামী প্রমুখগন অন্যতম। দক্ষ এই শিক্ষকদের হাতে গড়া মীর লোকমান তার নিজস্ব চিন্তাজগতে মাইমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অনন্য এক পর্যায়ে সমাসীন করেছেন। বাংলা গান ও নাচের সাথে মাইমের মিথস্ক্রিয়া সর্বপ্রথম তিনিই ঘটিয়েছেন। নাচের সাথে মাইমের এই সম্মিলনের নাম হলো মাইম ড্যান্স। মাইমে শ্যাডো ও ম্যাজিকের সংযোজন যেন তার এক অসাধারণ সৃষ্টি। তাছাড়াও তিনি মাইমের সাথে আবৃত্তি ও ডিবেটের সম্পর্ক স্থাপনসহ নতুন নতুন ধারা যোগ করতে ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, আন্তর্জাতিক ইয়ুথ ফেস্টিভ্যাল, ব্রিটিশ কাউন্সিল, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ, বিদেশি কালচারাল সেন্টারসমূহ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা দিবস এবং বিভিন্ন চ্যানেলসহ দেশের সর্বত্র মাইমের প্রয়োজনীয় শিক্ষা, মাইমের মহত্ত্ব ও মেসেজ নিয়ে মীর লোকমানের পদচারণা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমনকি পরিবেশ দূষণ, ধর্ষণ, খুন, যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমসহ এরকম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল প্রকার অসামঞ্জস্যতার বিরুদ্ধেও কালের প্রয়োজনে স্ট্রিট শো’র মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে তিনি আন্দোলন করেছেন বা করে থাকেন। এজন্যই তাকে কেউ কেউ রাজপথের শিল্পী বলেও সম্বোধন করেন। এ পর্যন্ত তিনি সহস্রাধিক মাইম পরিবেশন করে মানুষের মনে বিনোদন ও শিক্ষার প্রচার চালিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন।
বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেও তিনি একাধিকবার দেশের মুখ উজ্জ্বল করে দেশে ফিরেছেন। ২০১৬ সালে ভারতে, তিনি মূকাভিনয়ে দলগতভাবে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন এবং ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিতে ওয়েস্টার্ন ড্যান্সে প্রথম রানারআপ হয়েছিলেন। এছাড়া ২০১৭ সালে পূর্ব ইউরোপের দেশ আর্মেনিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াতেও মূকাভিনেতা হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ডুমা-(DUMA) এর উদ্যোগে প্রতিবছর এপ্রিল মাসে ইন্টারন্যাশনাল মাইম ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করা হয়। যেখানে জাপান, ভারত, নেপাল ও ভুটানসহ অন্যান্য দেশ থেকে মাইম শিল্পীগণ অংশগ্রহণ করে থাকেন।

সহজ-সরল, মেধাবী, পরিশ্রমী, সর্বদা হাসিখুশি ও একেবারে সাধারণভাবে জীবনযাপনকারী অপরাজেয় এই তরুণের ছোট্ট জীবনে রয়েছে বিরাট কর্মপরিধি। এনটিভি অনলাইনের এক তথ্যমতে, ২০১০ সালে অনার্সের প্রথমদিকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতার বই 'জীবনের প্রতিধ্বনি'। ২০১৪ সালে তিনি শ্রীলংকার একটি মিউজিক ভিডিওতে কাজ করেছেন। ক্যাম্পাস ক্লাইম্যাক্স ছবিতে তার অভিনয় যেন দর্শকের মন কাড়ে। তাছাড়াও টিভি ফিকশন ১৮+, শর্টফিল্ম ক্রাউন, রেড কার্পেট, অবশিষ্ট বুলেট ও লাল রঙের গল্প ইত্যাদিতে তিনি অভিনয় করেছেন।
মূকাভিনয়কে ঘিরে স্বপ্নবাজ ও অধ্যাবসায়ী এ তরুণ, মানুষের মাঝে মূকাভিনয়কে তুলে ধরতে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। কখনো হলের রুমে, বারান্দায়, কখনো মাঠে, আবার কখনোবা বিল্ডিঙ্গের ছাদে, সময়ে-অসময়ে অভিনয় অনুশীলন করে তার এই পথচলাকে তিনি বর্ণাঢ্য করে তুলেছেন।
বর্তমানের করোনা সংকট বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। করোনার প্রকোপজনিত সৃষ্ট সমস্যার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকার কারণে অধিকাংশ মানুষকে ঘরে অবস্থান করতে হচ্ছে। এজন্য মীর লোকমানও বর্তমানে তার গ্রামে অবস্থান করছে। আর দেশব্যাপী এত সমস্যার পরও উদ্যমী লোকমান বসে নেই। মানুষ যাতে ঘরে বসেই সুলভমূল্যে ফরমালিন ও ভেজালমুক্ত নানা রকমের ফলমূল হাতের নাগালেই পেতে পারে, সেই চাহিদার ভিত্তিতে তিনি এই লকডাউনেই গড়ে তুলেছেন অনলাইন ভিত্তিক ফল ক্রয়-বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম, ‘ফল বাগান’।
ইতোমধ্যে তার প্রতিষ্ঠিত এই ‘ফল বাগান’ দেশব্যাপী ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আর মানুষের চাহিদার উপর ভিত্তি করে চলতি বছরেরই গত ২২ আগস্ট ‘শুদ্ধতায় আস্থায় আপনার পাশে’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে, নিরাপদ সব রকমের খাদ্যসামগ্রীর নিশ্চয়তাস্বরূপ, ‘শুদ্ধবাজার.কম’ নামের আরো একটি অনলাইন ও অফলাইন প্লাটফর্ম গড়ে তুলেছেন। তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, প্রতিষ্ঠান দুটির আরো বিস্তৃতি ঘটিয়ে, ভবিষ্যতেও খুব সহজেই মানুষের জন্য সর্বোত্তম সেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
জীবনে চলার পথে তিনি নানারকম বাঁধা ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন। তবুও কখনো ভেঙে পড়েননি। তিনি নিজেকে থামিয়ে দেননি। সর্বদা হাসিখুশি থেকে হাজারো বাঁধায় নিজেকে গতিশীল রেখেছেন প্রতিনিয়ত। যার কারণে আজকে দেশ-বিদেশে একজন কবি, একজন মূকাভিনেতা, রাজপথের শিল্পী, গবেষক ও একজন তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যাপক সমাদৃত হচ্ছেন। তার মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হোক এবং শুভ হোক তার বর্ণাঢ্য পথচলা, এটাই কামনা।
লেখক: শিক্ষার্থী, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ
হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
mdjaforalip5@gmail.com