আমরা সাধারণত টিভি সিনেমায় নায়ক দেখি। যাঁদের জনসাধারণের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে দেখা যায়। বাস্তব জীবনের তেমনই এক নায়ক হলেন আঁখি। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে মাস্ক-সংকট দেখা দেয়। আঁখি তখন মাস্ক তৈরি করতে শুরু করে। কম দামে আশপাশের দরিদ্র মানুষের কাছে এসব মাস্ক বিক্রি শুরু করেন তিনি।
এ বছর বিশ্ব মানবিক দিবস উপলক্ষে মানবিক কাজে অনুপ্রেরণা জোগাতে জাতিসংঘ বাংলাদেশি চার তরুণ-তরুণীকে ‘রিয়েল লাইফ হিরো’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এদের প্রত্যেকেই মানবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে মনে করে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয় সংস্থা (ইউএনওসিএইচএ) আঁখি সম্পর্কে বলেছে, বাংলাদেশের আরও বহু শিশুর মতো একসময় শিশুশ্রমে নিয়োজিত ছিলেন আঁখি। তাঁকে পুনর্বাসনে সহায়তা করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন। বয়সের কারণে স্কুলে ফেরানো না গেলেও তাঁকে সেলাইকাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে তাঁকে দেওয়া হয় একটি সেলাই মেশিন ও কিছু কাপড়। সেখান থেকে তিনি নিজের গার্মেন্টস কারখানা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে থাকেন। বর্তমানে আঁখি তাঁর মা ও বড় বোনের সহযোগিতায় নিজের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে মাস্ক-সংকট দেখা দেয়। আঁখি তখন মাস্ক তৈরি করতে শুরু করে। কম দামে আশপাশের দরিদ্র মানুষের কাছে এসব মাস্ক বিক্রি শুরু করেন তিনি।
খুলনার রূপসা উপজেলার বাগমারার রূপসা চরের কিশোরী আঁখির (১৭) লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় দারিদ্র্যের কষাঘাতে। চরের বস্তিতে বসবাসরত মাসুদ মোল্লা ও আনোয়ারা বেগমের দ্বিতীয় মেয়ে আঁখি জানান, তার বাবা মাসুদ মোল্লা চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় কাজ করতেন। সেখানে কর্মরত অবস্থায় তিনি দুর্ঘটনার শিকার হন এবং শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন। মা আনোয়ারা বেগমও চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় কাজ করতেন। কিন্তু তার একার রোজগারে সংসার চালান অসম্ভব হয়ে ওঠে। পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর মাকে সাহায্য করার জন্য সে তার বড় বোনের সঙ্গে একটা চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় কাজে যোগ দেয়। ফলে তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
দুই বছর আগে ওয়ার্ল্ড ভিশন পরিচালিত জীবনের জন্য প্রকল্পের কর্মী আবেদা সুলতানা তাকে চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় কাজ করতে দেখে সেখান থেকে নিয়ে তাকে স্কুলে ভর্তি করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু আঁখির বয়স বেশি হয়ে যাওয়ায় কোনো স্কুলে তাকে ভর্তি করানো যায়নি। অবশেষে আঁখির আগ্রহ দেখে ওয়ার্ল্ড ভিশন পরিচালিত জীবনের জন্য প্রকল্পের মাধ্যমে তাকে সেলাই প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি। প্রশিক্ষণ শেষে আঁখি যাতে তার নিজ ব্যবসা শুরু করতে পারে তার জন্য ওই প্রকল্প থেকে তাকে একটি সেলাই মেশিন ও কিছু থান কাপড় দেয়া হয়। শুরু হয় আঁখির পোশাক তৈরির ব্যবসা। ঘরে বসেই এলাকার লোকজনের পোশাক সেলাই করে মাসে গড়ে তিন হাজার টাকা রোজগার করত সে। আঁখির এই রোজগারে তারি পরিবার সুখের মুখ দেখতে শুরু করে।

আঁখি বলেন, করোনা যখন আমাদের দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন সব কিছুই স্তব্ধ হয়ে যায়। চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাও বন্ধ হয়ে যায় তাই আমার মা ও বোনের রোজগারও বন্ধ হয়ে যায়। আমিও আমার ছোট দোকানটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। ঘরে বসেই আমি আমার সেলাইয়ের কাজগুলো করতে থাকি। ক্রেতা কমে যাওয়ায় আমার আয়ও কমে যায়। এক সময় করোনাভাইরাস মোকাবেলায় এলাকার গরিব মানুষ সাহায্য করার জন্য পোশাক সেলায়ের পাশাপাশি কাপড় দিয়ে মাস্ক তৈরি শুরু করি।
সব সময় গরিব এবং অসহায়ের পাশে থাকার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে আঁখি বলেন, গরিবকে সহায়তা করার জন্যই আজ আমি এতো বড় স্বীকৃতি পেয়েছি। তাই সারাজীবন অসহায় ও গরিবের পাশে থাকবো। ভবিষ্যতে নিজের দোকানটাকে আরও বড় করে নিজের পরিবারের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি আমার মতো মেয়েদের কাজ করার সুযোগ করে দেবো।