শহীদ মিনারি ফুল দিচ্ছে আজিজুর রহমান বিজয় © টিডিসি ফটো
আজিজুর রহমান বিজয়, বয়স ১০ কিংবা ১১ হবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) রেলস্টেশনের পাশেই বস্তিতে মায়ের সাথে থাকে। বাবা আছে কি নেই, সেটাও জানে না আজিজ। মায়ের কাছ থেকে শুনেছে জন্মের পর থেকে বাবা কোনো খোঁজখবর নেয়নি। আজিজ এর বেশি কিছু বলতে পারেনি বাবা সম্পর্কে। মা এখন অন্যের বাসায় কাজ করে আজিজকে স্থানীয় উপ-প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। এখন ক্লাস ফাইভে পড়ে। বড় হয়ে মায়ের জন্য কিছু করার ইচ্ছা তাঁর।
একটা পুরোনো শার্ট আর জিন্স পরে ভাষা শহীদদের পুষ্পমাল্য দিতে এসেছে সে। আজ সবাই শহীদ মিনারে যখন জুতা খুলে ঢুকছিলো তখনো আজিজ জুতা না খুলেই ঢুকেছে। কারণ, আজিজের পায়ে কোনো জুতোই ছিলো না।
আজিজ আজ প্রথম পুষ্পমাল্য অর্পণ করবে। যদিও সে জানে না আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। জানে না এই ভাষার জন্য ৫২’তে রফিক সাত্তারের জীবন উৎসর্গের ইতিহাস। শুধু জানে ফুল দিতে হবে। এর আগে এমন ফুল দেওয়ার দৃশ্য অনেক দেখেছে। কিন্তু কেউ এর ভাগিদার হতে পারেনি। তাই আজ বেশ উচ্ছ্বসিত সে। আজিজ তখন আনন্দের মুহূর্তের জন্যও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো। সেটা তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো। তাছাড়া আজ কিছু ভালো-মন্দ খাবারও যে মিলবে।
প্রসপেক্ট অব বাংলাদেশ’র মাধ্যমেই এখানে আসা। এর আগেও এই সংগঠনের কাছ থেকে কিছু সহযোগিতা পেয়েছে সে। সংগঠনের কাজকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাস করতেই আজিজের ছটফট উত্তর, অনেক ভালো ভাইয়ারা, আমার অনেক ভালো লাগে ওদেরকে। তারপর এমন বেশকিছু প্রশ্ন করলে সবগুলোর ইতিবাচক উত্তর দিয়েই যাচ্ছিলো সে। আর মুখে ভাসছিল ঝলমলে প্রাপ্তির আনন্দ।
ছোট্ট আজিজ হয়তো জানেই না, সংগঠনের সদস্যদের প্রতিদিনের তিন টাকার অনুদানে মাঝেমধ্যে তাদের একবেলা খাবার, শিক্ষা উপকরণ কিংবা শীতবস্ত্র মেলে। এসব বলতে না বলতেই আজিজ ছুটে গেলো শহীদ মিনারের দিকে। ওদের পুষ্পমাল্য অর্পণের সময় হয়েছে। আজিজের জীবনের প্রথম আনন্দে আর ভাগ বসালাম না। আজ ছোট বন্ধুদের সাথে নিয়ে শহীদ মিনারে ফুল দিবে সে। আজ আর কেউ ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবে না ওদের। কারণ, মাথার উপর আছে প্রসপেক্ট অব বাংলাদেশ’র শিশুকিশোর বান্ধব একদল সেচ্ছাসেবক। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হয়তো এমন অনেক আজিজের পুষ্পমাল্য অর্পণের অভিষেক হয়েছে আজ। যার পিছনে রয়েছে কিছু শিশুকিশোর বান্ধব সেচ্ছাসেবী সংগঠনের নিরলস পরিশ্রম।
শিশুদের সাথে মাতৃভাষা দিবস কেমন কাটলো জানতে চাইলে প্রসপেক্ট অব বাংলাদেশ’র যুগ্ম আহ্বায়ক তাসিময়া সরকার চৈতী বলেন, এই শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যত। কিন্তু দারিদ্র্যতা তাদেরকে পিছিয়ে রেখেছে। তাই আমরা সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য আজকের মাতৃভাষা দিবস সংবলিত চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছি। পরবর্তীতে আমরা প্রদর্শনীর মধ্য থেকেই কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করি। পাশাপাশি তাদের উৎসাহিত করার জন্য ৫ জনকে পুরস্কৃত করি আমরা। পরে পুষ্পমাল্য অর্পণ শেষে তাদের জন্য খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেছি।
তিনি বলেন, মজার ব্যাপার হলো প্রসপেক্ট অব বাংলাদেশ’র হাত ধরেই আজ প্রথম তারা পুষ্পমাল্য অর্পণ করেছে। এই সবকিছুর পেছনে আমাদের একটাই উদ্দেশ্য, আর তা হলো পিছিয়ে পড়া সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো এবং দেশের ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত করা। সংগঠনের সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় আজকের এই আয়োজন অত্যন্ত সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আগামী দিনেও শিশুদের নিয়ে কাজ করে যাবো আমরা।