এলজি অ্যাম্বাসেডর
প্রশিক্ষণ নিচ্ছে নারীরা © টিডিসি ফটো
সুন্দরবনে মাছ, মধু ও কাঠি সংগ্রহ করতে গিয়ে যেসকল জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়াল বাঘের আক্রমণে নিহত হয়েছেন তাদের স্ত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে ছেলেমেয়েদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে আসছে। স্ত্রীদের কারণে তাদের স্বামীকে বাঘে খেয়েছে এমন কুসংস্কার আর অপবাদ প্রাপ্ত বাঘ বিধবাদের মুখে অবশেষে হাসি ফুটতে শুরু করেছে।
বাঘ বিধবাদের দুঃখ দুর্দশার কথা চিন্তা করে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য অনার্স মাস্টার্স শেষ করা শিক্ষার্থী আশিকুজ্জামান। আশিকের বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন কোল ঘেঁষা এলাকায়। নিজ এলাকায় গড়ে তুলেছেন ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (আইসিডি) নামের একটি সংগঠন। কয়রার সুন্দরবন তীরবর্তী এলাকার বিভিন্ন বয়সের শতাধিক তরুণ তরুণী ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ তার সংগঠনের সদস্য হিসেবে কাজ করছে। এ পর্যন্ত ৪০ জন বাঘ বিধবাকে ১ মাসের দর্জি প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মাঝে সেলাই মেশিন ও সিট কাপড় বিতরণ করা হয়েছে। কয়রার সুন্দরবনের তীর ঘেঁসে বসবাসরত আদিবাসী মুন্ডা সম্প্রদায়ের ১০ জন নারীকে পুঁতি শিল্পের প্রশিক্ষণের কাজ চলছে। মুন্ডা সম্প্রদায়ের ছেলে মেয়েদের শিক্ষা সহায়তা উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘বিরসা মুন্ডা প্রভাতী স্কুল’। যেখানে তিন হাজার স্কুল শিক্ষার্থীর বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের কাজ সম্পান্ন করা হয়েছে।
ছোট বেলা থেকে আশিক বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর তার সামাজিক কর্মকাণ্ড আরো গতিশীল হয়। খুলনার কয়রা উপজেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু এমন অনেক মেধাবী হতদরিদ্র শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে কোচিং ও ভর্তি নির্দেশিকা গাইড-বই বিনামূল্যে বিতরণ করে আসছেন। বর্তমানে বাঘ এতিম, এতিম, প্রতিবন্ধী ও মুন্ডা শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করছেন আশিক।
এ বিষয় আইসিডি’র প্রতিষ্ঠাতা আশিকুজ্জামান বলেন, ‘প্রথম দিকে আমি বাঘ বিধবাদের জন্য কিছু করার তাগিদে প্রতিষ্ঠা করি ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (আইসিডি)। প্রাথমিকভাবে ১০ জন বাঘ বিধবাকে সেলাই মেশিন দেয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক সাড়া পড়ে। আমার এই কাজে এগিয়ে আসে ‘এলজি ইলেকট্রনিকস বাংলাদেশ’৷ এলজির কান্ট্রি ডিরেক্টর ডি কে সন বাঘ বিধবাদের কল্যাণে কাজ করার জন্য ৪ লাখ টাকার নগদ চেক প্রদান করেন। আমি সেই অর্থ দিয়ে আরো ৩০ জন বাঘ বিধবাকে মাসব্যাপী দর্জি প্রশিক্ষণ শেষে তাদের মাঝে সেলাই মেশিন, সিট কাপড় ও প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রদান করি।
তিনি বলেন, এরই মধ্যে এগিয়ে আসে প্রাণ আরএফএল গ্রুপ ৷ তাদের সহযোগিতায় উপকূলের ৩ হাজার স্কুল শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপিং সম্পন্ন করেছি। বেসরকারি ভ্রমণ সংস্থা ‘স্বপ্ন পাড়ি’র সহযোগিতায় শতাধিক মুন্ডা শিক্ষার্থী, বাঘ এতিম ও প্রতিবন্ধীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে।
আশিক জানান, কয়রার এই অঞ্চলে বসবাসরত মুন্ডা সম্প্রদায়ের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বিরসা মুন্ডা প্রভাতী স্কুল। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে মুন্ডা সম্প্রদায়ের স্বপ্ন পুরুষ বিরসা মুন্ডার স্মরণে স্কুলটির নামকরণ করা হয়েছে। মুন্ডা শিশুরা যাতে ছোটবেলা থেকে তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য জানতে পারে এবং লেখাপড়া শিখতে পারে সে জন্য এই স্কুল। অভাব অনাটনে থাকা মুন্ডা নারী পুরুষ দিনরাত পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করে। এ সম্প্রদায়ের অধিকাংশ বাবা মা নিরক্ষর হওয়ায় তাদের শিশুদের অক্ষর জ্ঞান ও লেখাপড়ায় হাতেখড়ি দেয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে না। তাই সঠিক গাইড লাইনের অভাবে তারা সবার সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে না। আমাদের স্কুলে একজন স্কুল পড়ুয়া মুন্ডা নারীর তত্ত্বাবধানে তারা অতি যত্নে লেখাপড়া শিখছেন।
তিনি বলেন, দেশের ইতিহাস জানার পাশাপাশি তারা মুন্ডাদের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে। স্কুলের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ দেয়া হয়েছে। স্কুলের আপাতত কোন অবকাঠামো না থাকায় মুন্ডা সম্প্রদায়ের এক বাড়িতে স্কুলের জন্য নির্ধারিত স্থানে শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে। মাসিক এক হাজার টাকার বেতনে নিয়োগ প্রাপ্ত শিক্ষিকা বাসন্তী মুন্ডার শিক্ষকতায় প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত স্কুলের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঈদের সময় অসহায় হতদরিদ্র ও এতিম শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি মুন্ডা সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের মাঝেও পোষাক ও ঈদ সামগ্রী বিতরণ করে আমরা ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেই।
নানান চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়া আশিক আরো বলেন, বাঘ বিধবাদের জন্য কাজ করার ফলে ব্যাপক সাড়া পড়েছে এলাকায়। এই সংবাদ শুনে সুন্দরবন তীরবর্তী উপকূলীয় কয়েকটি উপজেলা থেকে বাঘ বিধবারা সাহায্যের জন্য আমার কাছে আবেদন করছে। সক্ষমতা না থাকায় তাদের সাহায্য করতে পারছি না। তবে ভবিষ্যতে কোন সুযোগ আসলে তাদের পাশে দাঁড়াবো।