বিশ্বজুড়ে বাড়ছে তাপমাত্রা, গর্ভবতী নারীদের বড় দুঃসংবাদ দিলেন গবেষকরা  

৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৮ PM
তীব্র গরমে গর্ভবর্তী মায়েদের ক্ষেত্রে বিরুপ প্রভাব পড়ছে

তীব্র গরমে গর্ভবর্তী মায়েদের ক্ষেত্রে বিরুপ প্রভাব পড়ছে © সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে তাপপ্রবাহ। যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে গরম আবহাওয়া। এর প্রভাব পড়ছে গর্ভবতী নারী ও অনাগত শিশুদের স্বাস্থ্যে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব, উচ্চ রক্তচাপ এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই সন্তান জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এমনকি গর্ভাবস্থার শেষ মাসে তাপপ্রবাহ দেখা দিলে অপরিণত সন্তান জন্মের হার ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গবেষণা, চিকিৎসক এবং গর্ভবতী নারীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের চিকিৎসা গবেষক দর্শনিকা লাখু গর্ভাবস্থায় তীব্র গরমের মধ্যে নিজেই নানা জটিলতার মুখে পড়েন। গর্ভাবস্থায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছিলেন তিনি। কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর নিজের জীবনেও সেই ঝুঁকির অভিজ্ঞতা হয় তার। ২০২৪ সালের নভেম্বরে জোহানেসবার্গে তাপমাত্রা বারবার ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। ওই সময় তার যমজ সন্তান নির্ধারিত সময়ের ছয় সপ্তাহ আগেই জন্ম নেয়।

লাখু বলেন, ‘উষ্ণ হয়ে ওঠা বিশ্বে কেউই নিরাপদ থাকবে না। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীরা।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, লাখু ও তার সহকর্মীরা প্রায় ২০০টি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পর্যালোচনা করে গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত তাপমাত্রার প্রভাব বিশ্লেষণ করেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো গর্ভবতী নারীর বসবাসের এলাকার গড় তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে পরবর্তী দিনগুলোতে অপরিণত সন্তান জন্মের আশঙ্কা ৪ শতাংশ বাড়ে। আর তাপপ্রবাহের পরের সপ্তাহে এ আশঙ্কা ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে গর্ভপাত, জন্মগত ত্রুটি এবং গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। পাশাপাশি গর্ভবতী নারীদের উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্লাম্পসিয়া হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। প্রি-এক্লাম্পসিয়া এমন একটি জটিলতা, যা কিডনি বিকল, হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।

চীনের ২০ লাখ নারীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় অস্বাভাবিক গরমের সঙ্গে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঝুঁকি ১৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষকেরা বলছেন, অতিরিক্ত গরম সুস্থ গর্ভবতী নারীদেরও প্রভাবিত করতে পারে। তবে আগে থেকে স্বাস্থ্যগত জটিলতা থাকা, বয়স্ক, দরিদ্র এবং ধূমপান করেন এমন নারীদের ঝুঁকি আরও বেশি।

মেক্সিকোর ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৮০ লাখের বেশি জন্মের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সন্তান জন্মের আগের চার সপ্তাহে তাপপ্রবাহ বা দীর্ঘস্থায়ী গরম দেখা দিলে অপরিণত সন্তান জন্মের হার গড়ে প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ে। এতে প্রতিবছর দেশটিতে গরমের মৌসুমে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি শিশু অপরিণত অবস্থায় জন্ম নিতে পারে।

তবে গরমের সংস্পর্শ যত বেশি হয়, ঝুঁকিও তত বাড়ে। মৃদু তাপের সংস্পর্শে অপরিণত সন্তান জন্মের হার প্রায় ৪ শতাংশ বাড়লেও সর্বোচ্চ তাপের সংস্পর্শে তা ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। মেক্সিকোর বিভিন্ন অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় চিয়াপাস রাজ্যের পাহাড়ি এলাকাতেও গর্ভাবস্থার শেষ মাসে তাপপ্রবাহের মধ্যে থাকা নারীদের অপরিণত সন্তান জন্মের হার প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।

মেক্সিকো সিটির জুয়ারেজ হাসপাতালের চিকিৎসক হুয়ান রিভেরো করোনা জানান, ২০২৪ সালের গরমের মৌসুমে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে প্রি-এক্লাম্পসিয়া, উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা এবং প্লাসেন্টা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনা বেড়েছিল। এসব জটিলতায় মা ও শিশুর জীবন বাঁচাতে অনেক সময় জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়।

গরমের কারণে গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনাও বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে তাপপ্রবাহের সময় গর্ভপাত, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের কারণে গর্ভবতী নারীদের জরুরি বিভাগে যাওয়ার হার বেড়েছে। ব্রাজিলে গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে তাপপ্রবাহের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ভারতেও গরমের সময় নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার ঘটনা বেড়েছে।

তবে তাপমাত্রা কীভাবে গর্ভাবস্থায় জটিলতা তৈরি করে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত ধারণা নেই। গবেষকদের ধারণা, অতিরিক্ত গরমে মায়ের শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে প্লাসেন্টা থেকে রক্ত সরিয়ে নিতে পারে। এতে ভ্রূণের ওপর চাপ বাড়তে পারে। আবার তাপমাত্রা হরমোন নিঃসরণে প্রভাব ফেলতে পারে কিংবা ভ্রূণের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গঠনের সময় জিনের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

দক্ষিণ আফ্রিকার উইটওয়াটারস্র্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাতৃস্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষক ম্যাথিউ চেরশিচ বলেন, ‘যমজ গর্ভধারণের ক্ষেত্রে গরমের ঝুঁকি অনেক বেশি।’

গবেষকদের মতে, গরমের প্রভাব সব নারীর ক্ষেত্রে এক রকম নয়। বয়স, শারীরিক গঠন, আবহাওয়ার আর্দ্রতা, বাতাস চলাচল, বাসস্থানের ধরন এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণের সুবিধা—সবকিছুই ঝুঁকির মাত্রাকে প্রভাবিত করে। এ ছাড়া গর্ভাবস্থার কোন সময়ে তাপপ্রবাহ দেখা দিচ্ছে, তার ওপরও জটিলতার ধরন নির্ভর করে। গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে তাপপ্রবাহ জন্মগত ত্রুটি ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার সন্তান জন্মের আগের সপ্তাহে তাপমাত্রা বাড়লে মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

এ পরিস্থিতিতে গর্ভবতী নারীদের সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের রহিমা মুসা মা ও শিশু হাসপাতালে এ বিষয়ে গবেষণা চলছে। সেখানে গর্ভবতী নারীদের শরীরে বিশেষ যন্ত্র দিয়ে প্রতিদিনের তাপমাত্রার সংস্পর্শ পরিমাপ করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের রক্তচাপ, রক্ত, বুকের দুধ, প্লাসেন্টা ও নাভিরজ্জুর নমুনা পরীক্ষা করে অতিরিক্ত গরমের প্রভাব বোঝার চেষ্টা করছেন গবেষকেরা।

গবেষকদের পরামর্শ, গর্ভবতী নারীদের অতিরিক্ত গরম থেকে দূরে থাকতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান, ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং সম্ভব হলে ঠান্ডা পরিবেশে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। চিকিৎসকদেরও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় তাপমাত্রার প্রভাব সম্পর্কে জানতে হবে। গরমের কারণে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

গবেষক লাখু গর্ভাবস্থায় নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির নীতিমালা আরও কার্যকর করার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, শুধু সন্তান জন্মের পর নয়, গর্ভাবস্থায়ও নারীদের ছুটির সুযোগ থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি সহজলভ্য বিশুদ্ধ পানি ও চলমান শীতলীকরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাপপ্রবাহের ব্যাপ্তি ও সংখ্যা বাড়ছে। ১৯৬০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে মাত্র ৫০টি বড় তাপঝড়ের ঘটনা দেখা গিয়েছিল। চলতি দশকে এখন পর্যন্ত এ সংখ্যা ৬৬৫ ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় তাপঝড়টি এক বছর ধরে পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকায় প্রভাব ফেলেছিল।

গবেষকদের মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব থেকে গর্ভবতী নারী ও অনাগত শিশুদের সুরক্ষায় ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মক্ষেত্রের নীতিতেও পরিবর্তন আনা জরুরি। তবে অতিরিক্ত গরমের সঙ্গে গর্ভাবস্থার জটিলতার সম্পর্ক পাওয়া গেলেও কোনো নির্দিষ্ট নারীর জটিলতার একমাত্র কারণ তাপমাত্রা—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

মার্কিন বাণিজ্যচুক্তিসহ অসম বৈদেশিক চুক্তি বাতিলের দাবি, প্…
  • ৩০ অক্টোবর ২০২৬
বর্ণিল আয়োজনে আইএসইউতে নবীনবরণ, নতুনদের পদচারণায় উৎসবের আমেজ
  • ৩০ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন অমানুষদের জায়গা: বিএনপির এমপি ফজলুর …
  • ৩০ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে তাপমাত্রা, গর্ভবতী নারীদের বড় দুঃসংবাদ দিলে…
  • ৩০ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক পদে প্রার্থী ৭ জন, কে কো…
  • ৩০ অক্টোবর ২০২৬
গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩২ হাজার টাকা নির্ধারণের…
  • ৩০ অক্টোবর ২০২৬