সার্বিয়ায় দুর্ঘটনা থেকে গণ-আন্দোলন, ভুচিচের রাজনীতিতে বড় ধাক্কা

২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৯ PM
 সার্বিয়াতে শিক্ষার্থীদের জোট সরকার গঠন করতে যাচ্ছে

সার্বিয়াতে শিক্ষার্থীদের জোট সরকার গঠন করতে যাচ্ছে © সংগৃহীত

দুর্নীতি, সরকারি অবহেলা ও জবাবদিহির দাবিতে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন সার্বিয়ার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। ২০২৪ সালে নোভি সাদের রেলস্টেশনে ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর শুরু হওয়া বিক্ষোভ ধীরে ধীরে দেশব্যাপী সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। ফলে প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জীবন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত নির্বাচনী তালিকার সাফল্য ক্ষমতাসীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) জন্য একটি বড় ধাক্কা। খবর বিবিসি বাংলার।

বিবিসির পল কিরবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংসদীয় নির্বাচনের প্রাথমিক হিসাবে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অন্যদিকে, ভুচিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি পেয়েছে ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। ফল প্রকাশের পর রাজধানী বেলগ্রেডসহ নোভি সাদ ও নিশ শহরে সমর্থকেরা সমবেত হয়ে বিজয় উদযাপন করেছেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ কতরে লিখেছেন, "সার্বিয়া স্বাধীন"।

সূচনা যেভাবে:
২০২৪ সালের ১ নভেম্বর সার্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদের রেলস্টেশনের বাইরে কংক্রিটের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। এ ঘটনায় দেশজুড়ে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্টেশনটির সংস্কারকাজে অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি অবহেলার অভিযোগ সামনে আসে। এসময় প্রকল্পটির ত্রুটি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচার ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক থাকলেও আন্দোলন দ্রুত বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। কৃষক, অভিনেতা, বিচারকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যুক্ত হন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়।

গবেষণা সংস্থা হেনরি জ্যাকসন সোসাইটির গবেষক হেলেনা ইভানভ বলেন, ‘যখন ছাউনিটি ধসে পড়ল, সেটাই ছিল শেষ আঘাত’। তাঁর মতে, দুর্ঘটনাটি জনমনে জমে থাকা ক্ষোভকে আন্দোলনে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনকারীরা এমন জনসমর্থন অর্জন করেন, যা প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দলগুলো আগে অর্জন করতে পারেনি।

নেতৃত্বহীন আন্দোলন:
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর বিকেন্দ্রীভূত সাংগঠনিক কাঠামো। ‘স্টুডেন্ট লিস্ট-স্টুডেন্ট উইন’ নামে পরিচিত উদ্যোগটির কোনো একক নেতা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সভা বা প্লেনামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতেন এবং কর্মসূচি নির্ধারণ করতেন। আন্দোলনের চাপে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। তবে তাতেও বিক্ষোভ থামেনি। ওই বছরের মার্চে রাজধানী বেলগ্রেডে বড় সরকারবিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়গুলোকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।

যুক্তরাষ্ট্রের জার্মান মার্শাল ফান্ডের বলকান কর্মসূচির প্রধান গোরদানা ডেলিক বলেন, ‘বার্তাটি স্পষ্ট ছিল - আইনের শাসন, আইনের দ্বারা শাসিত নয়’। তাঁর মতে, নির্বাচনের লড়াইটি কার্যত সরকার ও বিরোধী জনমতের মধ্যে গণভোটের রূপ নিয়েছিল।

ভুচিচ আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিলে শিক্ষার্থীরা নির্বাচনী লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নেন। তাঁরা নিজেরা প্রার্থী না হয়ে বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিদের নিয়ে একটি নির্বাচনী তালিকা গঠন করেন। ২৫০টি সংসদীয় আসনেই প্রার্থী দেওয়া হলেও তালিকায় কোনো শিক্ষার্থী সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেননি। গত সপ্তাহে বেলগ্রেডের দিকে শিক্ষার্থীদের পদযাত্রায় অংশ নিয়ে তালিকার প্রধান প্রার্থী ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া সিদানোভিচ বলেন, ইতিহাস নতুন করে লেখা হচ্ছে এবং ‘এই শক্তি অপ্রতিরোধ্য’।

তিনি বলেছেন, ‘আমরা আমাদের নাগরিকদের সভ্য সমাজের মৌলিক মূল্যবোধর কথা বলেছি, যা পূর্ববর্তী এই সরকার শেষবারের মতো আমাদের নাগরিকদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে’।

শিক্ষার্থীদের সমর্থিত তালিকায় চিকিৎসক, অধ্যাপক, অভিনেতা, সাবেক ক্রীড়াবিদ ও অর্থনীতিবিদদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকারবিরোধী ভোটারদের আস্থা অর্জন করা এবং আন্দোলনের দাবিগুলোকে নির্বাচনী কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া।

বিবিসির প্রতিবেদনে নির্বাচনের প্রাথমিক ফলকে সার্বিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে কার্যত গণভোটের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মূল দাবিগুলোর মধ্যে ছিল দুর্নীতি প্রতিরোধ, সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা। শুরুতে ভুচিচ বিক্ষোভকারীদের ‘সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রশংসা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের আগে তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে সার্বিয়াকে ‘পতন ঘটানোর’ চেষ্টা করার অভিযোগ তোলেন।

পরাজয় স্বীকার করার পরও ভুচিচ দাবি করেছেন, আন্দোলনকারীরা বিদেশি শক্তির সমর্থন পেয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁরা নামহীন ‘ইউরোপীয় দেশ এবং আমেরিকার ডিপ স্টেটের’ সমর্থন পেয়েছেন। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উল্লেখ করেননি। ফল প্রকাশের পর বেলগ্রেড, নোভি সাদ ও নিশ শহরে সমর্থকেরা উদ্‌যাপনে অংশ নেন। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রতীকী ঘটনা ছিল মধ্য বেলগ্রেডের পাইওনিয়ার্স পার্কে স্থাপিত ভুচিচপন্থি তাঁবুশিবির ‘চাচিল্যান্ড’ ভেঙে ফেলা। সার্বিয়ার পার্লামেন্টের সামনে প্রায় ১৮ মাস ধরে থাকা এই শিবিরের ধাতব বেড়া ভাঙার সময় সমর্থকেরা “ভুচিচ চলে যাচ্ছেন” স্লোগান দেন।

দুর্নীতি দমন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি:
শিক্ষার্থীদের সমর্থিত তালিকার ১১ দফা কর্মসূচিতে দুর্নীতি প্রতিরোধ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সরকারি নিয়োগে দলীয় প্রভাব কমানো এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য দাবিগুলো হলো—
- দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ।
- বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন এবং সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
- সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
- সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ বন্ধ করা।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, তাঁরা এমন প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করতে চেয়েছেন, যাঁরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের সময় নিজেদের দায়িত্ব ও জনগণের কাছে জবাবদিহির বিষয়টি ভুলে যাবেন না। তবে ভুচিচ ও তাঁর দল দুর্নীতি এবং গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়ন নতুন নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

নতুনদের চ্যালেঞ্জ:
নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত তালিকা জয়ী হলেও দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কারা নেবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তালিকার প্রধান প্রার্থী হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া সিদানোভিচ হলেও তাঁকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিশ্চিতভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। স্বাধীন জরিপ সংস্থা সিইএসআইডি ও ইপসোসের পূর্বাভাসের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের সমর্থিত তালিকার প্রায় ১৪০ জন প্রার্থী সংসদে আসন পেতে পারেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক বাস্কেটবল তারকা দেইয়ান বোদিরোগা, অভিনেতা তিহোমির স্তানিচ, অপেরা গায়ক নিকোলা মিকিচ এবং সার্বিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর দেইয়ান শশকিচ।

শশকিচের নাম সম্ভাব্য শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় এসেছে। তিনি অর্থনৈতিক সংস্কারের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন এবং সরকারপন্থি গণমাধ্যমে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। শিক্ষার্থীরা বলছেন, ‘গত এক বছর ধরে আমরা রাস্তায় যে সংগ্রাম চালিয়ে আসছি, তার একটি অংশ প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে স্থানান্তরের দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে’। অর্থাৎ, আন্দোলনের দাবিগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন তাঁদের সমর্থিত প্রতিনিধিদের ওপর বর্তাবে।

আলেকজান্ডার ভুচিচ ২০১২ সাল থেকে সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। এ সময়ে তিনি উপপ্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন দেশটির রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে নির্বাচনী সাফল্যই আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। দুর্নীতি প্রতিরোধ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতিই নির্ধারণ করবে এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হবে।

ভুচিচ নির্বাচনের পর তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেন, শিক্ষার্থীরা সার্বিয়ার গত দুই বছরের জীবনযাত্রা ধ্বংস করেছে এবং তারা "তাদের ধারণার চেয়েও দ্রুত" পরাজিত হবে। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, নির্বাচনী ফলের পরও দেশটির রাজনৈতিক বিরোধ ও ক্ষমতার লড়াই শেষ হয়ে যায়নি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

সামনে সপ্তাহের শুরুতে নবম পে স্কেলের বেতন, বেতন নির্ধারণে উ…
  • ২৭ অক্টোবর ২০২৬
পদোন্নতির পরও আয় কমতে পারে অনেক সরকারি চাকরিজীবীর
  • ২৭ অক্টোবর ২০২৬
ঝালকাঠিতে মৎস্য বিভাগের অভিযানে হামলা, আহত ৭
  • ২৭ অক্টোবর ২০২৬
আরও ২৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাচ্ছে স্থাপন-একাডেমিক স্বীকৃতি-পাঠ…
  • ২৭ অক্টোবর ২০২৬
‘আমার স্বামী ১৭-১৮টা বিয়ে করেছে’— হাফেজ তাশরীফের মা
  • ২৭ অক্টোবর ২০২৬
৬৪ জেলায় ১০ হাজার পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ দেবে সরকার, আবেদনের…
  • ২৭ অক্টোবর ২০২৬