প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
১৯৭০ সালে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার হন সন্দেলা। মামলা চলে বেশ কয়েক বছর। ১৯৮৩ সালে ওয়ারাঙ্গলের একটি আদালত সন্দেলাকে খুনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। তিনি জেলে যান এবং প্রায় ৬ মাস সাজা কাটান। এই সময়েই পাল্টে যায় সন্দেলার জীবন। ঘটনাটির ভারতের। প্রতিবেদন দিয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা
৪০ বছর ধরে পুলিশের চোখকে ফাঁকি। জেলের ঘানি টানার বদলে সাজাপ্রাপ্ত আসামি দিব্যি জুটিয়ে ফেলেছিলেন সরকারি চাকরিও! খুনের মামলায় দোষী সাব্যস্ত সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত। প্যারোলে মুক্তি পেয়ে দীর্ঘ চার দশক পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বহাল তবিয়তে শিক্ষকতা করে এসেছেন। এমনকি কোনও রকম বাধা ছাড়া অবসরও নিয়েছেন। তবে শেষরক্ষা হলো না ৭০-এর কোঠায় পা দেওয়া তেলঙ্গানার বাসিন্দা সন্দেলা বীরান্নার। দীর্ঘ কয়েক বছর আইনি সাজা এড়ালেও ২০২৪ সালের মে মাসে ওয়ারাঙ্গলের কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্সের হাতে ধরা পড়েন। ফলে যে সাজা তিনি ৪০ বছর আগে এড়াতে পেরেছিলেন তা এই বৃদ্ধ বয়সে এসে তা তাঁকে ভোগ করতে হচ্ছে।
সূত্রের তথ্য, প্যারোলে মুক্তির আবেদন জানিয়েছিলেন সন্দেলা। এর প্রেক্ষিতেই প্রথমে তাঁকে ৩০ দিনের প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। পরে প্যারোলের মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং ১৯৮৪ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত তাঁকে বাইরে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। পরের দিন তাঁর জেলে আত্মসমর্পণ করার কথা ছিল। কিন্তু তিনি আর ফেরেননি। এভাবেই শুরু হয় তাঁর প্রায় ৪০ বছরের ‘পলাতক জীবন’। তবে তিনি কখনওই আত্মগোপন করে থাকেননি। পরিচয় ভাঁড়িয়েছিলেন মাত্র। কোনও গোপন আস্তানায় বা ভুয়া পরিচয়ে অন্ধকারে জীবন কাটাননি বলেই আদালতের নথি থেকে উঠে এসেছে। তিনি স্বাভাবিক সামাজিক জীবনই যাপন করেছেন এত বছর।
জেলে না ফিরে সন্দেলা এমনভাবে নতুন জীবন শুরু করেন যে, দীর্ঘ দিন তাঁর অতীতের অপরাধের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি। আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি তৎকালীন অন্ধ্রপ্রদেশের গুড়িভাডায় সরকারি শিক্ষকের চাকরি পান। বহু বছর সেই পদে কাজ করেন কোনও সন্দেহের অবকাশ না রেখেই।
যে ব্যক্তি আইনের চোখে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এবং প্যারোলের শর্ত ভেঙে পলাতক ছিলেন সেই একই সময়ে তিনি সমাজের চোখে এক সফল সরকারি শিক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, ২০০৪ সালে তিনি ‘সেরা শিক্ষক’-এর পুরস্কার লাভ করেন। আইনের চোখে সাজাপ্রাপ্ত এক আসামিকে এই স্বীকৃতি দিয়েছিল প্রশাসনই।
আনন্দবাজার বলছে, ২০১৩ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন সন্দেলা। এরপরও তিনি সরকারি পেনশন পেতে থাকেন এবং মহবুবাবাদ জেলায় বসবাস করতেন বলে মামলার নথিতে উঠে এসেছে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক ব্যক্তি কীভাবে সরকারি চাকরি পেলেন, চার দশক ধরে চাকরি করলেন, পুরস্কার পেলেন, অবসর নিলেন এবং পেনশনও পেলেন, তা নিয়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে গোটা দেশে।
জেলে ফেরার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার ৪০ বছর এক মাস ২৮ দিন পর গ্রেফতার করা হয় সন্দেলাকে। তাকে চেরলাপল্লি কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। আদালতে কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন পলাতক আসামিকে খুঁজে বার করার জন্য বিভিন্ন সময়ে চেষ্টা করা হয়েছিল। ২০১২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পুলিশ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগও করা হয়। পরে বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়।
গ্রেফতারের পর কারা কর্তৃপক্ষ সন্দেলার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেন। তাঁর অর্জিত প্রায় ২৭ দিনের রেমিশন বা সাজা মকুবের সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি, ২০২৭ সালের ১০ অগস্ট পর্যন্ত তিন বছরের জন্য প্যারোলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। চিকিৎসাজনিত কারণেও প্যারোল চাওয়ার ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
২০২৬ সালে সন্দেলার স্ত্রী সন্দেলা চারাম্মা কারা কর্তৃপক্ষের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তেলঙ্গানা হাই কোর্টে আবেদন করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, চার দশক ধরে পুলিশ বা কারাবিভাগ সন্দেলাকে খুঁজে বার করতে বা আইনি পদক্ষেপ করতে পারেনি। তাই, এত দীর্ঘ সময় পরে তাঁর স্বামীর এই ধরনের শাস্তি অন্যায্য। তিনি স্বামীর বার্ধক্য ও অসুস্থতার কথাও উল্লেখ করেন এবং চিকিৎসাজনিত কারণে প্যারোলের আবেদন জানান।
চারাম্মা দাবি করেছেন যে, এই ৪০ বছরের পুরো সময়টা জুড়েই তাঁদের গোটা পরিবার লোকচক্ষুর সামনেই বসবাস করেছে। কোথাও আত্মগোপন করেননি তাঁরা। সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য এক বারও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি প্রশাসন।
দণ্ডিত ব্যক্তির স্ত্রী ২০২৬ সালে তেলঙ্গানা হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। সেখানে তিনি প্রশাসনের নেওয়া শাস্তিমূলক পদক্ষেপকে স্বেচ্ছাচারী এবং ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী বলে দাবি করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, রাষ্ট্র প্রায় ৪০ বছর ধরে সন্দেলার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। তাই এত বছর পর একই ঘটনার ভিত্তিতে নতুন করে কঠোর শাস্তি দেওয়া আইনসঙ্গত হতে পারে না।
সন্দেলার স্ত্রীর এই আবেদন পত্রপাঠ নাকচ করে দিয়েছে আদালত। আদালত এই মামলায় কোনও ছাড় দিতে রাজি হয়নি। বিচারপতি টি মাধবী দেবী স্পষ্টভাবে জানান, তাঁর বয়স কিংবা এত বছর ধরে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নিতে দেরি হওয়া— কোনটিই তাঁকে কোনও ধরনের ছাড় দেওয়ার যথেষ্ট কারণ নয়।
আদালতের মতে, দণ্ডিত ব্যক্তি দীর্ঘ দিন ধরে সফলভাবে সরকারি চাকরি করেছেন। তবে এটি তাঁর প্রতি সহানুভূতি দেখানোর কোনো কারণ বলে গণ্য করা যাবে না। কারণ তিনি নিজের অপরাধ ও দণ্ডের বিষয়টি গোপন করে এত বছর স্বাভাবিক জীবনযাপন করেছেন। এই ঘটনা সচেতনভাবে আইন এড়িয়ে চলার প্রবণতাকেই তুলে ধরে।
আদালতের জানায়, রাষ্ট্রের দীর্ঘ বিলম্ব বা অভিযুক্তের বর্তমান বয়স, কোনোটাই ১৯৮৩ সালের যাবজ্জীবন সাজা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার কারণ হতে পারে না।
একই সঙ্গে হাই কোর্ট রাজ্যের কারা প্রশাসনেরও তীব্র সমালোচনা করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এক জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি ৪০ বছর ধরে সরকারি শিক্ষক হিসেবে চাকরি করেছেন, পুরস্কার পেয়েছেন এবং অবসরও নিয়েছেন। অথচ এত বছর ধরে প্রশাসনের কারও নজরে এল না! এটি কারা ও পুলিশি ব্যবস্থার বড় ব্যর্থতার প্রমাণ। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে প্যারোলে মুক্ত বন্দিদের নজরদারির জন্য বিশেষ নির্দেশিকা ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা তৈরিরও নির্দেশ দিয়েছে আদালত।