বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত © টিডিসি ফটো
ভারতের আসাম রাজ্য গত দুই বছরে ১ হাজার ৬৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন বা ঠেলে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল (এফটি) ঘোষিত ‘বিদেশি’ রয়েছেন ১৯৩ জন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে এসব ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। আসাম সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্য বিধানসভায় দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে।
অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের (এআইইউডিএফ) বিধায়ক বদরুদ্দিন আজমলের এক প্রশ্নের জবাবে আসামের মুখ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এসব তথ্য জানান।
আসাম সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঠানো ১ হাজার ৬৭৯ জনকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে একদলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ডিপোর্ট’ করা হয়েছে, একদলকে ‘সেন্ট ব্যাক’ হিসেবে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং আরেকদলকে ‘এক্সপেলড’ বা বহিষ্কার করা হয়েছে।
এই ১ হাজার ৬৭৯ জনের মধ্যে ১৯২ জনকে আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল ‘বিদেশি’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এ ছাড়া মরিয়ম বেগম নামে এক শিশুকন্যাকেও তাঁর মায়ের সঙ্গে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়েছে। তাঁর মা ঘোষিত বিদেশি ছিলেন।
ভারতের আইন অনুযায়ী, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল কাউকে বিদেশি ঘোষণা করলে তিনি প্রথমে গুয়াহাটি হাইকোর্ট এবং পরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার সুযোগ পান। তবে আনুষ্ঠানিক ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অন্য দেশের নাগরিক হিসেবে যাচাই-বাছাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাস থেকে আসাম সরকার ঘোষিত বিদেশিদের ‘পুশ ব্যাক’ বা জোর করে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পাঠানোর নীতি গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা সমন্বয় করা হয়নি।
এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকা ইমিগ্র্যান্টস (এক্সপালশন ফ্রম আসাম) অ্যাক্ট–১৯৫০ পুনরুজ্জীবিত করার ঘোষণা দেয় আসাম সরকার। পরে এ বিষয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) তৈরি করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইনটি প্রয়োগ করা হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই আইনের আওতায় বহিষ্কার করে বাংলাদেশে পাঠানো ৬৭ জন ঘোষিত বিদেশির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৯ জন মধ্য আসামের নগাঁও জেলার বাসিন্দা। এ ছাড়া পশ্চিম আসামের কোকরাঝাড় থেকে ১৬ জন, বারপেতা থেকে সাতজন, চিরাং ও কার্বি আংলং থেকে চারজন করে, ডিমা হাসাও ও হোজাই থেকে তিনজন করে, কামরূপ (গ্রামীণ) ও ধুবড়ি থেকে দুজন করে এবং আরও কয়েকটি জেলা থেকে একজন করে ব্যক্তিকে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে, বাকি ১২৬ জন ঘোষিত বিদেশিকে ‘রিপ্যাট্রিয়েটেড’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের ‘সেন্ট ব্যাক’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। এই তালিকায় দরং জেলার এক শিশুকন্যাও রয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালের মে মাসে ওই শিশুকে তার মা মানিকজানের সঙ্গে ‘পুশ ব্যাক’ করা হয়েছিল।
এদিকে, বদরুদ্দিন আজমল জানতে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশে পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন গুয়াহাটি হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিলেন। জবাবে আসাম সরকার জানিয়েছে, হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে কোনো আপিল বিচারাধীন থাকলে কোনো চিহ্নিত অবৈধ অভিবাসীকে প্রত্যাবাসন করা হয় না।
তবে যাঁদের বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে, তাঁদের কেউ হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই বলে জানানো হয়েছে।
এর আগে, সোমবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ গুয়াহাটি হাইকোর্টের ২৭টি রায় বাতিল করেন। ওই রায়গুলোতে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের এমন সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছিল, যেখানে আবেদনকারীদের অনুপস্থিতিতেই বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাঁদের বিদেশি ঘোষণা করা হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্ট জানায়, নাগরিকত্ব নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয় অবশ্যই ন্যায্য, আইনসম্মত ও যুক্তিসঙ্গত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। আদালত ২৭টি মামলাই সংশ্লিষ্ট ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে পুনর্বিচারের জন্য ফেরত পাঠিয়েছে।