ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান © সংগৃহীত
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান পদত্যাগ করেছেন—এমন খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে দেশটির সরকার ও প্রেসিডেন্ট কার্যালয়। কর্তৃপক্ষের দাবি, পেজেশকিয়ান এখনো দায়িত্বে বহাল রয়েছেন এবং স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন।
এর আগে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনে দাবি করেছিল, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে প্রেসিডেন্ট ও সরকার কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কট্টরপন্থি অংশ রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রবিবার পাঠানো পদত্যাগপত্রে পেজেশকিয়ান উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট ও সরকারের ভূমিকা ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে। আইআরজিসির আধিপত্যের কারণে সরকার পরিচালনা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণেই তিনি অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর আবেদন জানিয়েছেন।
তবে এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি। সরকারের একটি অবগত সূত্রের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান কোনো পদত্যাগপত্র জমা দেননি এবং তিনি তার দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখেছেন।
একই বিষয়ে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের যোগাযোগ ও তথ্যবিষয়ক উপপ্রধান সাইয়্যেদ মেহদি তাবাতাবাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইরান ইন্টারন্যাশনাল-এর প্রতিবেদনকে ‘গুজব’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জনগণের সেবা থেকে পিছু হটবেন না।
তাবাতাবাই লিখেছেন, ‘অবিশ্বস্ত বিদেশি এই গণমাধ্যমের গুজব ছড়ানোর চেষ্টা তাদের আগের হাস্যকর প্রচারণারই ধারাবাহিকতা। তারা বাস্তবতার পরিবর্তে নিজেদের কল্পনাকে সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করেছে।’
আরও পড়ুন: কাজিনদের মধ্যে বিয়ে: ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে সতর্কবার্তা দেয়
তিনি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জনগণের সেবা থেকে সরে দাঁড়াবেন না, যেমন ইরানি জনগণও ঐক্য ও প্রতিরোধের পথ থেকে সরে আসবে না। ইরানি জাতির ঐক্য বিনষ্ট করার যে স্বপ্ন তারা দেখছে, তা তাদের সঙ্গেই কবরস্থ হবে।’
পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যেই ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে সরকার ও দেশটির সামরিক-নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে টানাপোড়েনের খবর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এর আগে ইরান ইন্টারন্যাশনাল দাবি করেছিল, আইআরজিসি ধীরে ধীরে প্রেসিডেন্টের অনেক ক্ষমতা সীমিত করে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এ পরিস্থিতির কারণে পেজেশকিয়ানের প্রশাসন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার মধ্যে পড়ে যায়। ফলে কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মন্ত্রিসভার কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও পুনর্গঠনের উদ্যোগও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী গোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ গোষ্ঠীর অধিকাংশ সদস্য বর্তমান বা সাবেক উচ্চপদস্থ আইআরজিসি কমান্ডার।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ৫৬ বছর বয়সী উত্তরসূরি মুজতবা খামেনির নেতৃত্বে পরিচালিত হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেবল একজন ব্যক্তির হাতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা বর্তমান ও সাবেক সামরিক নেতাদের একটি শক্তিশালী ও ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠী দেশটির নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করছে।
এদিকে একই দিনে তেহরানের ভ্যালিয়াসর সড়কের একটি ক্যাফে সিলগালা করেছে দেশটির পুলিশ। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, সেখানে ‘শয়তানপন্থি কার্যক্রম’ প্রচার করা হচ্ছিল। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ক্যাফেটিতে সরাসরি সঙ্গীত পরিবেশনার সময় নারী-পুরুষ একসঙ্গে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ক্যাফেটি বন্ধ করে দেয় তেহরানের জনসমাগমস্থল তদারকির দায়িত্বে থাকা পুলিশ।