যুদ্ধ শেষ করার শর্ত নিয়ে বিভক্ত হতে পারে ইরান: নেতৃত্বের লড়াইয়ে কে জিতবে?

২২ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৩১ PM
 কোলাজ ছবি

কোলাজ ছবি © টিডিসি ফটো

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের শীর্ষ নেতারা বর্তমানে একটি কঠোর অবস্থানে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা শুরু হলে দেশটির বর্তমান নীতিনির্ধারক প্যানেলের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হতে পারে। এটি তাদের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা নিহত হয়েছেন। ভয়াবহ এই আঘাতের পরও ইরানের নেতৃত্ব পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। তবে শান্তি চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে তাদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। 

খামেনি কয়েক দশক ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দেশটির বিভিন্ন শক্তিশালী গোষ্ঠীকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি বিরোধীদের দমনে কঠোর ছিলেন, আবার প্রতিদ্বন্দ্বী মতাদর্শের কথাও শুনতেন। এখন তার অনুপস্থিতিতে দেশটির শাসনভার সামলাচ্ছেন একদল বেসামরিক ব্যক্তিত্ব এবং আধাসামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) ক্ষমতাধর জেনারেলরা। বর্তমানে তাদের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী, তা স্পষ্ট নয়।

আপাতত তারা কঠোর অবস্থান নিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় কতটুকু ছাড় দেওয়া হবে—তা নিয়ে বড় ধরনের মতভেদ রয়েছে। চলতি সপ্তাহে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা নতুন করে আলোচনার আয়োজন করার চেষ্টা করছেন। এখানেই নেতাদের মধ্যকার মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে একটি কমিটি ইরান শাসন করছে

অতীতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তার ইচ্ছানুযায়ী ইরানের বিভিন্ন ক্ষমতা কেন্দ্রকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইসরায়েলি হামলায় তিনি নিহত হন। এরপর তার ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি তার স্থলাভিষিক্ত হন।

তবে হামলার পর মোজতবা খামেনির ভূমিকা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তিনি আহত হয়েছেন বলেও বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। তিনি কীভাবে শীর্ষ নেতাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তা এখনও এক রহস্য।

ইরান সরকার ইসরায়েলকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে প্রকাশ্যে কাজ করে।  ইসরায়েলের অভিযোগ ইরান হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে। এছাড়া তারা পারমাণবিক কর্মসূচিও চালিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছে 'সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল' নামক একটি প্যানেল। এই কাউন্সিলে ইরানের শীর্ষ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা রয়েছেন। বর্তমানে এই কাউন্সিলের প্রধান মুখ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং সব মহলেই তার শক্ত যোগাযোগ রয়েছে।

কাউন্সিলের অভ্যন্তরে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা

নিরাপত্তা কাউন্সিলে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতারা রয়েছেন এবং তাদের মধ্যে পুরনো শত্রুতাও রয়েছে। গালিবাফের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর বিরোধী সাঈদ জালিলি এই কাউন্সিলে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধিত্ব করছেন। অন্যদিকে, সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই বডির নামমাত্র প্রধান।

কাউন্সিলের কঠোরপন্থী সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন আইআরজিসি-র নতুন প্রধান কমান্ডার আহমেদ ভাহিদি এবং নতুন সেক্রেটারি মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর। তিনিও রেভল্যুশনারি গার্ডের একজন কমান্ডার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েল শীর্ষ নেতাদের হত্যা করলেই ইরান ভেঙে পড়বে—এমন ধারণাটি ভুল ছিল। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, ইরান টিকে আছে কারণ এখানে ক্ষমতার অনেকগুলো কেন্দ্র রয়েছে যাদের কাজ একে অপরের সাথে যুক্ত। উপদলীয় কোন্দল বা বিভিন্ন ছোট গোষ্ঠী এই ব্যবস্থার ডিএনএ-তে মিশে আছে। তবে যুদ্ধের পর থেকে কাউন্সিলে রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) প্রভাব অনেক বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা ও ক্ষমতার কাঠামো

পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি রোধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে ইরান দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের আছে। এই পরিস্থিতিতে কাউন্সিল এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।

গত রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গালিবাফ বলেন, ইরান একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি চায় যা দেশটিতে স্থায়ী শান্তি আনবে এবং যুক্তরাষ্ট্র আর হামলা করবে না। তিনি এই সংঘাতের চক্র বন্ধ করার ওপর জোর দেন।

কাউন্সিল সদস্যরা মনে করছেন, ইরান বর্তমানে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকায় তারা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে।

ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করেন, তারা যুদ্ধের ক্ষতি সহ্য করার ক্ষমতা রাখেন। তাদের প্রধান লক্ষ্য এখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। তবে যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের ফলে ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতি আরও চাপে পড়েছে। অর্থনৈতিক কষ্টের কারণে গত দুই দশক ধরে ইরানে অনেক বিক্ষোভ হয়েছে। এ বছরের জানুয়ারিতেও সরকার পতনের ডাক দিয়ে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। তাই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য পশ্চিমাপক্ষর সাথে একটি চুক্তি করা সরকারের টিকে থাকার জন্য জরুরি হতে পারে।

মতভেদের কিছু লক্ষণ
গত সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের নেতাদের মধ্যে স্পষ্ট মতভেদ দেখা গেছে। শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে  ঘোষণা করেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দিচ্ছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ চালিয়ে যাবে।

এর পরদিন শনিবার সকালে ইরানের সামরিক বাহিনী পাল্টা ঘোষণা দেয়, তারা পুনরায় প্রণালীটি বন্ধ করে দিচ্ছে। ইরানের কিছু গণমাধ্যম পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির সমালোচনা করে বলে, তার পোস্টের কারণে ইরানকে দুর্বল মনে হয়েছে। আইআরজিসি-র ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, এমন ঘোষণা সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল থেকে আসা উচিত ছিল। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয় দাবি করেছে , তারা উচ্চ পর্যায়ের সব প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করেই কাজ করে।

সাক্ষাৎকারে গালিবাফ এসব বিভক্তি ঢাকার চেষ্টা করেন এবং দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার বিষয়ে সব নেতা একমত আছেন।

গালিবাফ কি সমাধান আনতে পারবেন?

৬৪ বছর বয়সী গালিবাফ ইরানের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করার জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। তিনি রেভল্যুশনারি গার্ডের সাবেক জেনারেল এবং পুলিশের প্রধান ছিলেন। তেহরানের মেয়র হিসেবেও তার সফলতার খ্যাতি রয়েছে।

গালিবাফের ওপর রেভল্যুশনারি গার্ড এবং রক্ষণশীলদের সমর্থন যেমন আছে, তেমনি সংস্কারপন্থী ও মধ্যপন্থীরাও তাকে সমর্থন দিচ্ছেন। এমনকি তিনি খামেনি পরিবারেরও খুব কাছের মানুষ। আইআরজিসি-র যে নতুন নেতারা নিহতদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন, তাদের সাথেও গালিবাফের সুসম্পর্ক রয়েছে। এই সর্বজনীন সমর্থনের কারণে তিনি হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ইরানের অভ্যন্তরীণ বাধাগুলো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবেন।

তথ্যসূত্রঃ এপি ও টাইমস অফ ইসরায়েল 

জমি নিয়ে সংঘর্ষে নারী নিহত, আহত ৯
  • ২২ এপ্রিল ২০২৬
এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে ১১ বিশেষ নির্দেশনা বোর্ডের 
  • ২২ এপ্রিল ২০২৬
বিদায় অনুষ্ঠানে হামলা, ৬ বিএনপি নেতাকে আজীবন বহিষ্কার
  • ২২ এপ্রিল ২০২৬
২১ ঘণ্টা সময় পেলেন মনিরা শারমিন
  • ২২ এপ্রিল ২০২৬
ইবির আবরার ফাহাদ হলের প্রথম প্রভোস্ট অধ্যাপক হাফিজুর রহমান
  • ২২ এপ্রিল ২০২৬
একাত্মতার অনুরণন ২০২৬: উদ্ভাবন, সংযোগ ও উদযাপনের এক অনন্য আ…
  • ২২ এপ্রিল ২০২৬