শিম্পাঞ্জি © সংগৃহীত
উগান্ডার কিবালে ন্যাশনাল পার্কে বসবাসকারী বিশ্বের বৃহত্তম পরিচিত বন্য শিম্পাঞ্জিদের একটি দল দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ভেঙে গত আট বছর ধরে এক ভয়াবহ ‘গৃহযুদ্ধ’-এ জড়িয়ে পড়েছে। একসময়ের ঘনিষ্ঠ ও সহযোগিতাপূর্ণ এই শিম্পাঞ্জি সম্প্রদায়টি এখন দুটি শত্রুভাবাপন্ন উপগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে একে অপরের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছে বলে এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় উঠে এসেছে।
বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের নৃতত্ত্ববিদ অ্যারন স্যান্ডেলের নেতৃত্বে এনগোগো শিম্পাঞ্জি প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত হয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে ২০১৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৪টি শিম্পাঞ্জিকে হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টিই নিরপরাধ শিশু শিম্পাঞ্জি মারা গেছে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, একসময় প্রায় ২০০ সদস্যের এই শিম্পাঞ্জি দলটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ছিল। তারা একসঙ্গে চলাফেরা করত, এমনকি একে অপরের হাত ধরাধরিও করত। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে সেই নিবিড় সামাজিক বন্ধন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। দলটি মূলত এখন ‘ওয়েস্টার্ন’ এবং ‘সেন্ট্রাল’ নামক দুটি পৃথক ও বৈরী উপগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০১৫ সালে প্রথম বড় ধরনের বিভাজনের লক্ষণ দেখা দেয়, যখন একদল অন্য দলকে তাড়া করতে শুরু করে এবং পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ তারা একে অপরকে এড়িয়ে চলতে থাকে। এরপর যখনই তাদের মধ্যে দেখা বা যোগাযোগ হয়েছে, তা ক্রমেই আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও সহিংস রূপ নিয়েছে।
বিবিসিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি পৃথক দলে বিভক্ত হওয়ার পর ‘ওয়েস্টার্ন’ গোষ্ঠীর সদস্যরা ‘সেন্ট্রাল’ দলের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালাতে শুরু করে। এসব হামলায় অন্তত সাতটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং ১৭টি শিশু শিম্পাঞ্জি নিহত হয়েছে বলে গবেষণায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা।
এই নজিরবিহীন সহিংসতার পেছনে গবেষকেরা কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, ২০১৪ সালে কয়েকটি প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রভাবশালী সদস্যের রহস্যজনক মৃত্যু দলটির দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধন দুর্বল করে দিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, ২০১৫ সালে নেতৃত্ব পরিবর্তনের ফলে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই তীব্রতর হয়ে ওঠে। তৃতীয়ত, ২০১৭ সালে একটি ভয়াবহ শ্বাসযন্ত্রের রোগে অন্তত ২৫টি শিম্পাঞ্জির মৃত্যু দলটির অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়।
গবেষকেরা মনে করেন, শিম্পাঞ্জিদের এই আচরণ মানব সভ্যতার প্রাচীন সংঘাত ও যুদ্ধের উৎপত্তি বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। তাঁরা মন্তব্য করেছেন যে, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় বা রাজনৈতিক মতাদর্শ ছাড়াও কেবল গোষ্ঠীগত সম্পর্কের পরিবর্তনই কীভাবে একটি সমাজ বা গোষ্ঠীর মধ্যে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়।
জার্মানির ‘জার্মান প্রাইমেট সেন্টার’-এর বিশিষ্ট গবেষক জেমস ব্রুকস এই ঘটনাকে মানব সমাজের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, ‘অন্যান্য প্রজাতির আচরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষকে বুঝতে হবে—বিভাজন কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।’