আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীরা © সংগৃহীত
আর্টেমিস অভিযানের চার মহাকাশচারী সোমবার ব্রিটিশ সময় রাত আনুমানিক ১১টা ৪৭ মিনিটে চাঁদের উল্টো পিঠে যাওয়ার পর টানা প্রায় ৪০ মিনিট পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকবেন। এই সময়ে চাঁদ নিজেই বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কারণে মহাকাশযান এবং পৃথিবীর মধ্যে যোগাযোগের বেতার ও লেজার সংকেতগুলো আটকে যাবে।
ফলে মহাকাশচারীরা মহাবিশ্বের বুক চিরে সম্পূর্ণ একা ছুটে চলবেন, যা হবে এক গভীর নির্জনতা আর চরম নীরবতার মুহূর্ত। অথচ এর আগে পেছনের জানালায় পৃথিবীটা ক্রমেই ছোট হতে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের হিউস্টনে অবস্থিত মিশন কন্ট্রোলের সাথে তাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল এবং নাসার দলের শান্ত ও ভরসা জাগানিয়া কথাগুলো তাদের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক সংযোগ হিসেবে কাজ করেছে। আর্টেমিস অভিযানের মহাকাশচারীরা যখন পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে চলে যাবেন, তখন তাদের চেয়ে বেশি দূরত্বে মানুষের ইতিহাসে আর কেউই থাকবেন না।
আর্টেমিস অভিযানের পাইলট ভিক্টর গ্লোভার জানান, 'আমরা যখন চাঁদের পেছনে থাকব এবং সবার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, আমরা সেটাকে একটা সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাই। আপনারা প্রার্থনা করুন, আশা রাখুন এবং আপনাদের ইতিবাচক চিন্তা ও শুভকামনা আমাদের দিকে পাঠান, যেন আমরা আবার পৃথিবীর সাথে যোগাযোগে ফিরতে পারি।'
৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে, চাঁদে যাওয়ার অভিযানে অ্যাপোলোর মহাকাশচারীরাও সংকেত হারানোর কারণে এই বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন। তবে অ্যাপোলো-১১ এর মাইকেল কলিন্সের মতো অভিজ্ঞতা সম্ভবত আর কারো হয়নি। ১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং এবং বাজ অলড্রিন যখন চাঁদের বুকে পা রেখে ইতিহাস গড়ছিলেন, কলিন্স তখন একা কমান্ড মডিউলে চড়ে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করছিলেন এবং তার মহাকাশযানটি চাঁদের উল্টো পিঠে চলে যাওয়ায় উভয় পক্ষের সাথেই তার যোগাযোগ পুরো ৪৮ মিনিটের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তার স্মৃতিচারণমূলক বই 'ক্যারিয়িং দ্য ফায়ার'-এ তিনি সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, তিনি নিজেকে 'সত্যিই একা' এবং 'পরিচিত সব প্রাণ থেকে বিচ্ছিন্ন' মনে করছিলেন। তবে তিনি মোটেও ভয় বা একাকীত্ব অনুভব করেননি। পরবর্তী বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি এই বেতার নীরবতা নিয়ে আসা শান্তি ও প্রশান্তির কথা উল্লেখ করে জানান, মিশন কন্ট্রোলের অনবরত নির্দেশনার হাত থেকে বাঁচার জন্য এটি ছিল দারুণ একটি বিরতি।
এদিকে পৃথিবীতে বসে যারা এই মহাকাশযানের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখার দায়িত্বে আছেন, এই ব্ল্যাকআউট বা যোগাযোগহীন সময়টি তাদের জন্য তীব্র উত্তেজনার হবে। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে কর্নওয়ালের 'গুনহিলি আর্থ স্টেশন'-এর একটি বিশাল অ্যান্টেনা ওরিয়ন ক্যাপসুল থেকে সংকেত সংগ্রহ করছে এবং এই পুরো যাত্রায় ক্যাপসুলটির অবস্থান নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করে সেই তথ্য নাসার সদর দপ্তরে পাঠিয়ে আসছে।
গুনহিলির প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ম্যাট কসবি বিবিসিকে বলেন, 'এবারই প্রথম আমরা এমন একটি মহাকাশযান ট্র্যাক বা নজরদারি করছি যাতে মানুষ রয়েছে।' তিনি আরও বলেন, 'এটি যখন চাঁদের পেছনে চলে যাবে, আমরা কিছুটা নার্ভাস বা চিন্তিত হয়ে পড়ব। এরপর যখন এটিকে আবারও দেখতে পাব, আমরা ভীষণ আনন্দিত হব—কারণ তখন আমরা জানব যে তারা সবাই নিরাপদে আছেন।'
তবে আশা করা হচ্ছে, যোগাযোগের এই সাময়িক বিচ্ছিন্নতা খুব দ্রুতই অতীতের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। কসবি জানান, নাসা এবং বিশ্বের অন্যান্য মহাকাশ সংস্থাগুলো যখন চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করতে এবং আরও গভীর অনুসন্ধান চালাতে শুরু করবে, তখন এটি আর চলতে দেওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, 'চাঁদে মানুষের স্থায়ী ও টেকসই উপস্থিতির জন্য সার্বক্ষণিক অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টাই যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকা দরকার। এমনকি চাঁদের উল্টো পিঠেও এটা লাগবে, কারণ চাঁদের সেই অংশটিও মানুষ অন্বেষণ করতে চাইবে।' এই লক্ষ্যেই ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির 'মুনলাইট'-এর মতো বিভিন্ন প্রকল্পে ভবিষ্যতে চাঁদের চারপাশে কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের একটি নেটওয়ার্ক চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে সার্বক্ষণিক ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়।
আর্টেমিস মহাকাশচারীরা পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার এই সময়টুকুকে পুরোটা চাঁদের পেছনেই ব্যয় করবেন। যোগাযোগহীন এই সময়টিতে তারা শুধুই চাঁদকে পর্যবেক্ষণ করবেন—ছবি তুলবেন, চাঁদের ভূতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করবেন এবং কেবলই এর রূপ ও বিশালতা অপলক চোখে উপভোগ করবেন। তারা যখন চাঁদের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসবেন এবং সংযোগটি আবার পুনঃস্থাপিত হবে, তখন পুরো পৃথিবী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে এবং ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই মহাকাশচারীরা পৃথিবীর বুকে ফিরে আসা সবার সাথে তাদের দেখা সেই অবিশ্বাস্য ও রোমাঞ্চকর দৃশ্যগুলো ভাগ করে নিতে পারবেন।
নিউজ সোর্স: বিবিসি