নাসার চাঁদে অভিযান © সংগৃহীত
দীর্ঘ ৫৪ বছর পর আবারও মানুষ চাঁদের কক্ষপথের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। নাসার ঐতিহাসিক ‘আর্টেমিস টু’ মিশনে চার নভোচারী বর্তমানে মহাকাশে অবস্থান করছেন, যারা রেকর্ড পরিমাণ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।
১০ দিনের এই অভিযানে নভোচারীরা চাঁদে অবতরণ করবেন না; বরং ওরিয়ন মহাকাশযানের সব সিস্টেম পরীক্ষা করা হবে, যা ভবিষ্যতে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ এবং মঙ্গল অভিযানের পথ প্রশস্ত করবে। ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষের পুনরাগমন হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে এই মিশনের সফলতার ওপর।
আর্টেমিস টু মিশনের দলে রয়েছেন নাসার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। তারা প্রায় ১০ দিনের যাত্রায় চাঁদের চারপাশ ঘুরে ফিরে আসবেন, যা সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে মানুষের দীর্ঘতম মহাকাশ ভ্রমণগুলোর একটি।
উৎক্ষেপণের পর নভোচারীদের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ পরিচালক চার্লি ব্ল্যাকওয়েল-টমসন বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক মিশনে আপনারা সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন আর্টেমিস দলের প্রাণশক্তি, আমেরিকান জনগণ ও বিশ্বজুড়ে আমাদের সহযোগীদের সাহসী মনোবল এবং নতুন প্রজন্মের আশা ও স্বপ্ন। শুভকামনা আর্টেমিস টু, এগিয়ে চলো।’
যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরই কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান চাঁদ দেখতে পান। তিনি বলেন, ‘অপূর্ব এক চাঁদ দেখা যাচ্ছে, আমরা ঠিক সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।’
এই মিশনটি বহু দিক থেকেই ব্যতিক্রম। প্রথমবারের মতো ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ (এসএলএস) রকেট ও ওরিয়ন মহাকাশযান নভোচারী বহন করছে। একইসঙ্গে এই মিশনে প্রথম কোনো নারী, প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী এবং প্রথম অ-মার্কিন নাগরিক চাঁদের কক্ষপথে যাচ্ছেন।
ক্রিস্টিনা কোচ বলেন, ‘অনেকগুলো “প্রথম” ঘটনা উদযাপনের বিষয় হলেও এগুলো পুরো গল্প নয় এবং এ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে উদযাপনের বিষয়ও নয়। উদযাপনের বিষয় হচ্ছে, আমরা এখন এমন এক সময়ে আছি, যেখানে স্বপ্ন দেখা প্রতিটি মানুষই তা পাওয়ার জন্য সমানভাবে কঠোর পরিশ্রম করার সুযোগ পাচ্ছেন।’
এই যাত্রায় নভোচারীরা পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৬ হাজার ৮৪১ কিলোমিটার দূরত্বে পৌঁছাবেন, যা ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো ১৩ মিশনের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাবে।
তবে নাসার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই যাত্রা থেকে নতুন কী শেখা যায়। ফ্লাইট ডিরেক্টর এমিলি নেলসন বলেন, ‘আপনি চাইবেন প্রতিটি মিশন থেকে নতুন কিছু শিখতে ও অন্বেষণ করতে। পৃথিবী থেকে রেকর্ড দূরত্বে যাওয়াটা দারুণ পরিসংখ্যান মাত্র। তবে এ মিশনে আমরা আরও অনেক কিছু শিখতে পারব, যা আমার কাছে আরও বেশি রোমাঞ্চকর।’
নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টারের ‘৩৯বি লঞ্চ কমপ্লেক্স’ থেকে এসএলএস রকেটটি উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের সময় ফ্লোরিডার স্পেস কোস্টে প্রায় চার লাখ মানুষের সমাগম ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উৎক্ষেপণের দুই মিনিট পর রকেটের সলিড বুস্টার আলাদা হয়ে যায় এবং ‘আরএস-২৫’ ইঞ্জিন ওরিয়ন মহাকাশযানকে কক্ষপথের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। প্রায় আট মিনিটে রকেটটি কক্ষপথে পৌঁছায়। এরপর নির্ধারিত ধাপে ইঞ্জিন চালু করে ওরিয়নকে চাঁদের পথে পাঠানো হয়।
এই মিশন ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি’ অনুসরণ করছে, যা চাঁদের চারপাশ ঘুরে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবে নভোচারীদের। পুরো অভিযাত্রাটি অনেকটাই ১৯৬৮ সালের অ্যাপোলো ৮ মিশনের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।