ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতা করতে চেয়ে সক্রিয় পাকিস্তান, ভারত কি কোণঠাসা হচ্ছে?

০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৭ AM
হোয়াইট হাউসে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প

হোয়াইট হাউসে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প © সংগৃহীত

দিল্লিতে একটা কথা খুব শোনা যাচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের যুদ্ধে পাকিস্তান যেভাবে নিজেদের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করে ফেলল, তার ফলে ভারতকে কি কোণঠাসা করে দেওয়া হল? ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার জন্য ইসলামাবাদ যে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়েছে, সেরকম তৎপরতা সাধারণত দেখা যায় না।

গত সপ্তাহে, পাকিস্তান ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫-দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা পৌঁছে দিয়েছে এবং সব পক্ষের মধ্যে আলোচনার আয়োজন করার প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে, যদিও সেই প্রস্তাব তেহরান প্রত্যাখ্যান করেছে।

আবার এই সপ্তাহেই, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরান ও আমেরিকার মধ্যেকার সংঘাত নিরসনে পাঁচ-দফা শান্তি পরিকল্পনার জন্য চীনের সমর্থন চাইতে বেইজিংয়ে গেছেন।

পাকিস্তানের প্রতিবেশী এবং চির-প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি যথেষ্ট অস্বস্তিকর। এই অস্বস্তি আরও তীব্র হয়েছে বর্তমানে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কারণে। অন্যদিকে পাকিস্তান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক গঠনের চেষ্টা করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধরত সবকটি দেশের সঙ্গেই দিল্লির নিজস্ব সম্পর্ক রয়েছে, তাই তারাও মধ্যস্থতা করতে পারত। তাতে ভূ- রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ভারতের অনুপস্থিতি প্রকট বলে মনে হত না।

মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নেওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসার পর বিরোধী কংগ্রেস দল ভারত সরকারের সমালোচনা করে এটিকে ভারতীয় কূটনীতির জন্য একটি 'লজ্জাজনক' ঘটনা বলে বর্ণনা করছে।

স্ট্র্যাটেজিক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্মা চেলানি নিজের এক্স হ্যান্ডেলে এ কথা লিখেছেন, ‘ন্যারেটিভ তৈরির যুদ্ধে' অনেক বেশি তৎপর ও আক্রমণাত্মক হয়ে পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে ভারতকে টেক্কা দিয়েছে।’

তবে অনেকেই পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতার বিষয়কে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাদের মতে প্রভাব বা আমন্ত্রণ ছাড়া মধ্যস্থতা করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তারা বরং বিশ্বাস করেন যে, নীরব কূটনীতি এবং কৌশলগতভাবে দূরত্ব রাখাই ভারতের স্বার্থের পক্ষে ভাল।

ভারত সরকারের মধ্যে থেকেও এই ধরনের আলেচনা উঠে আসছে। গত সপ্তাহে একটি সর্বদলীয় বৈঠকে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পাকিস্তানের ভূমিকাকে ‘দালালি’ বলে নাকচ করে দিয়েছেন।

তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৯৮১ সাল থেকে পাকিস্তান এই ধরনের ভূমিকা পালন করে আসছে, যার মধ্যে মার্কিন-তালিবান আলোচনাও রয়েছে।

জয়শঙ্করের বলেন, ‘আমরা কী ধরনের মধ্যস্থতা করতে পারি, তা জানাতে অন্য দেশগুলোর কাছে আমাদের দৌড়াদৌড়ি করতে হয় না।’

কিন্তু কিছু বিশ্লেষক জানাচ্ছেন, দিল্লিতে এই বিতর্কের তীব্রতা এতটাই যে ভারতের নীতির পাশাপাশি দেশটির দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কেও বেশ কিছু প্রশ্ন উঠছে।

শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যাপিমোন জ্যাকবের মতে, বিষয়টি যতখানি কৌশলগত তার থেকে অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়।

হিন্দুস্থান টাইমসে প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয়তে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ‘ভারতে এই ধরনের প্রতিযোগিতামূলক প্রতিক্রিয়াও পাওয়া গেছে যে পাকিস্তান পারলে আমরা পারব না কেন?’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ক্ষেত্রে এটা একদিকে সুযোগ হারানোর ভয়, আর তার থেকেও বেশি, প্রতিবেশী দেশের প্রতি ঈর্ষা।

কারণ পাকিস্তান এই মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়ে সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করছে যা কৌশলগত মহলের কারো কারো মতে, এটা তো ভারতের প্রাপ্য ছিল। কিন্তু সুযোগ হারানোর ভয় কিংবা ঈর্ষা— কোনোটিই একটি ভালো পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হতে পারে না।

আটলান্টিক কাউন্সিলে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, ‘মধ্যস্থতা করার দৌড়ে ভারত কখনোই সেভাবে ছিল না এবং আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছাড়া তাদের হস্তক্ষেপ করার সম্ভাবনাও কম।’

তার মতে, পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক তৎপরতা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে এবং কেবল মাত্র একটি মধ্যস্থতাকারী হিসাবেই তাদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। কারণ পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে অদূর ভবিষ্যতে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার মধ্যে তাদের থাকার সম্ভাবনা কম।

তার বলেন, ‘এটি প্রকৃত পরিস্থিতিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে।’ অনেকের মতে, ভারত যদি মধ্যস্থতার প্রতিযোগিতায় কখনোই সেভাবে না থেকে থাকে, তবে আরও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো, ভারতের তাহলে এ ক্ষেত্রে কী ভূমিকা পালন করা উচিত?

পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতের প্রাক্তন হাইকমিশনার অজয় বিসারিয়ার মতে, এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে ভারতের শক্তি এবং সীমাবদ্ধতা উভয়কেই স্বীকার করে নেওয়ার মধ্যে।

তিনি বলেন, এই সমগ্র ভৌগোলিক অঞ্চলে ভারতের স্বার্থ রয়েছে। যুদ্ধরত দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্কের কারণে শান্তি স্থাপনের সম্ভাবনা থাকলেও, ভারত এমন কোনো দেশ নয় যাকে ওয়াশিংটন 'পরিচালনা' করতে পারে।

মি বিসারিয়া আরও বলেন, ‘এই কারণেই ভারত এই ভূমিকার জন্য অনুপযুক্ত। দিল্লির আরও বাস্তবসম্মত শান্তি-প্রচারের ভূমিকা পালন করা উচিত - তবে তা ‘পাকিস্তানের মতো করে নয়।’

এই দুটি অবস্থানের মাঝে একটা বাস্তবসম্মত মধ্যপন্থাও রয়েছে- সেটি হলো ভারতের যেমন ঝুঁকিপূর্ণ মধ্যস্থতায় জড়ানোর প্রয়োজন নেই, তেমনই একেবারে নিষ্ক্রিয় থাকাও মানায় না।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাও  এক্স-এ লিখেছেন, ‘এই যুদ্ধ বাস্তবে ভারতের স্বার্থের ক্ষতি করেছে। আসল প্রশ্ন, ভারত যথেষ্ট স্বচ্ছ্বতার সঙ্গে তা স্বীকার করে নিতে ইচ্ছুক কি না।’

ভারতের অভ্যন্তরে সরকারের এই চুপ করে থাকাই সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিরোধী নেতারা গাজায় ইসরায়েলের কার্যকলাপ এবং ইরানের উপর হামলার বিষয়ে নীরবতার জন্য নরেন্দ্র মোদী সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন।

তাদের যুক্তি, এটি একটি ক্রমবর্ধমান ইসরায়েল-পন্থী প্রবণতা এবং তা ভারতের ঐতিহ্যবাহী কূটনৈতিক ভারসাম্য থেকে বিচ্যুতি ঘটাচ্ছে।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘সংযত থাকার প্রয়োজন তবে যখন দেশের সার্বভৌমত্ব, শক্তির সীমা, নাগরিকদের সুরক্ষা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন ওঠে, তখন ভারত চুপ করে থাকতে পারে না। ভারতকে সেই 'খবরে ভেসে থাকার কূটনীতি'র বাইরেও ভাবতে হবে।’

তিনি বলেন, ভারত শান্তি ও সংঘাত, দুদিকেই আছে। যে কোনো যুদ্ধ অর্থনৈতিক উন্নতির পথে বাধা হতে পারে। মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকার পেছনে ছোটার পরিবর্তে দিল্লির উচিত শান্তি প্রতিষ্ঠার কৌশলগুলো নিয়ে ভাবা।

দীর্ঘমেয়াদি খুঁটিনাটি বিষয়গুলো, যেমন গোপন সামরিক যোগাযোগ থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালির মতো সংকীর্ণ পথ দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের আলোচনা—এই বিষয়গুলোর দিকে বেশি করে নজর দেওয়া। এর উত্তর হল পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং যোগাযোগ।

লাহোর-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এজাজ হায়দারের মতে, পাকিস্তান ‘মুসলিম ব্লকের একমাত্র দেশ’ যা ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে কার্যকরী সম্পর্ক বজায় রাখে, যার ফলে তারা সকলের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে পারে।

ইসলামাবাদ-ভিত্তিক বিশ্লেষক এবং জেনস্ ডিফেন্স উইকলির সাবেক সংবাদদাতা উমর ফারুক বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে পাকিস্তানের নিরাপত্তার ওপরই এর কূটনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা নির্ভর করে।

এ সংবাদদাতা বলেন, ইয়েমেন থেকে শুরু করে ইরাক ও লেবানন পর্যন্ত ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি যেখানে সক্রিয়, সেই এলাকার মধ্যে থাকা সৌদি আরব ও তার প্রতিবেশী দেশগুলো মনে করে যে, পাকিস্তানি স্থলবাহিনীকে ভরসা করা যায়।

তিনি বলেন, এই ভরসা বা আস্থার বিষয়কে ভিত্তি করেই সেখানে প্রবেশের ক্ষেত্রে আমাদের কূটনৈতিক গুরুত্ব গড়ে উঠেছে, এই ক্ষেত্রে ভারতের ঘাটতি আছে।

তবে, প্রবেশের সুযোগ ও প্রভাব, গোটা বিষয়টিই ওই গল্পের অংশ। লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে অধ্যাপনা করেন অবিনাশ পালিওয়াল। তিনি বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা 'কঠোর বাধ্যবাধকতার প্রতিফলন, কোনো কূটনৈতিক নাটক নয়'।

পালিওয়ালের দাবি, ভারতের মতো পাকিস্তানের এই যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার বিলাসিতা দেখাতে পারবে না। যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, পাকিস্তানকে সৌদি আরবের পক্ষে যুদ্ধে নামতে বাধ্য হতে হবে। সেক্ষেত্রে ইসলামাবাদের সামনে একটাই রাস্তা, হয় যুদ্ধ থামানো বা একটি ব্যয়বহুল যুদ্ধে যোগ দেওয়া।

তিনি মনে করেন, এই মুহূর্তে ভারত সহ কোনও দেশের পক্ষেই তা সম্ভব নয়। এমনকি যদি ইসলামাবাদ যুদ্ধ থামাতে ব্যর্থও হয়, তবে তারা যে চেষ্টা চালাচ্ছে তা দিয়ে যুদ্ধের প্রভাব যে সব দেশগুলোতে পড়েছে, তাদের কাছে তারা এই বার্তাই পৌঁছে দিতে পারছে যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া ঠেকাতে তারা তাদের সীমিত সামর্থকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে প্রস্তুত।

ঠিক এই ইঙ্গিতটিই দিল্লির জন্য বিরক্তিকর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বমঞ্চে ভারতের গুরুত্ব বেড়েছে। তাই ভারতকে নিয়ে প্রত্যাশাও বেড়েছে।

নরেন্দ্র মোদীর সরকার যেহেতু ভারতের গুরুত্বকে ব্যাপকভাবে তুলে ধরেছে, তাই বিশ্বের সংকটজনক পরিস্থিতিতে ভারতের উপস্থিতি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

কিন্তু হ্যাপিমোন জ্যাকব মনে করেন, এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সংযত করা প্রয়োজন। জলবায়ু ও জ্বালানি বিষয়ে ভারত নেতৃত্ব দিয়েছে, তবে সব বিষয়ে তাদের উপস্থিতি থাকতে পারে না।

তিনি বলেন, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো কতটা করা সম্ভব এবং প্রত্যাশা, এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনা। কোনটা করতে হবে আর কোনটা করতে হবে না, তা জানা।’

দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে সরকার ব্য…
  • ১৮ মে ২০২৬
ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল থেকে চারজনকে আটক করে পুলিশে দিল জনতা
  • ১৮ মে ২০২৬
এআইইউবিতে উদ্বোধন হলো আন্তঃকলেজ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের
  • ১৮ মে ২০২৬
জীবন বিমা করপোরেশনে পার্ট-টাইম চাকরির সুযোগ, পদ ১০০, আবেদন …
  • ১৮ মে ২০২৬
স্মার্ট ক্যাম্পাস, সবুজ শক্তি: ড্যাফোডিলে বায়োগ্যাস প্ল্যান…
  • ১৮ মে ২০২৬
কুবিতে ৫ অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করবেন উপাচার্য
  • ১৮ মে ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
21 June, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081