বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কাছে যুদ্ধ শেষ করার বিকল্প কমে আসছে?

২৫ মার্চ ২০২৬, ০১:২৬ PM , আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২৬, ০১:৩১ PM
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা কি ইরানের কমান্ড কাঠামোকে পঙ্গু করতে পেরেছে আদৌ

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা কি ইরানের কমান্ড কাঠামোকে পঙ্গু করতে পেরেছে আদৌ © সংগৃহীত

কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলে আসছে যে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বারবার দাবি করেছেন, ধারাবাহিক হামলা ইরানের কমান্ড কাঠামোকে পঙ্গু করে দিয়েছে এবং তাদের জবাবি হামলার ক্ষমতাও দুর্বল হয়েছে।

তাদের হিসাব অনুযায়ী, এ সংঘাত এখন শেষ হওয়ার দিকে এগোনো উচিত। তবে বাস্তবে উল্টোটাই ঘটছে বলে মনে হচ্ছে। উত্তেজনা বৃদ্ধি দ্রুততর এবং আরও তীব্র হয়েছে আর কমেছে যুদ্ধ শেষ করে বেরিয়ে আসার স্পষ্ট উপায়।

শনিবার জানা গেছে, ইরান তাদের দেশ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দূরত্বে ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ ঘাঁটির দিকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। যদিও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দ্বীপে পৌঁছতে পারেনি, তবে এ ঘটনায় ইরানের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এত দিন বিশ্বাস করা হতো যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ সীমা দুই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ সীমা বৃদ্ধি কি তারা আগেই ঘটিয়েছিল, যা অজানা থেকে গিয়েছিল, নাকি বোমাবর্ষণের সময়ে তারা এ সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে, যাই ঘটে থাক, এর তাৎপর্য একই : সামরিক চাপ ইরানের অগ্রগতি থামাতে পারেনি।

যদি সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি বা আরেক শীর্ষ নেতা আলী লারিজানি, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর বা আইআরজিসির কমান্ডাররা এবং সামরিক বাহিনী চিফ অব স্টাফের মতো নেতৃত্ব যদি নিহতই হয়ে থাকেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকারী স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে অভিযান কার নির্দেশনায় চলছে? কীভাবেই বা এই চাপের মধ্যে ইরান তার সক্ষমতা বজায় রাখছে?

একেবারে শীর্ষ পর্যায় থেকেই অনিশ্চয়তার শুরু। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার পরিবারের আরও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সদস্য যে হামলায় নিহত হন, সেই হামলাতেই বেঁচে যাওয়া মোজতবা খামেনি এরপরে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষিত হন। তবে এখনো পর্যন্ত তিনি জনসমক্ষে আসেননি। দুটি লিখিত বার্তা ছাড়া তার কাছে থেকে কিছুই শোনা বা দেখা যায়নি।

তার অবস্থা যেমন এখনো অস্পষ্ট, তেমনই তার নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা কতটা, সেটাও পরিষ্কার নয়। কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের ওপরে নির্ভরশীল একটা কাঠামোয় এই নীরবতা ক্ষমতার একেবারে কেন্দ্রে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

ইসরায়েলের ডিমোনা শহরে ইরানের হামলা
তবু ইরানের কর্মকাণ্ড দেখে তো মনে হয় না তাদের কাঠামো আদৌ ভেঙে পড়েছে। শনিবার ইরান ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমির ডিমোনা শহরেও হামলা চালায়। এই শহরটি ইসরায়েলের একটি অঘোষিত পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত এলাকা। এরপরে ইরানের বুশেহরের কাছে বিদ্যুৎ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েল। ওই শহরেই ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রও অবস্থিত। বার্তাটি স্পষ্ট যে, উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে, আর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোও এখন আর সীমার বাইরে থাকবে না।

ইরানের এ সব হামলা এবং পাল্টা হামলা থেকে মনে হয় যে, কোনো বিভ্রান্তি নেই, বরং সমন্বয়েরই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ধারণা করে নিয়েছিল যে শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করা হলে পুরো ব্যবস্থাটা পঙ্গু হয়ে পড়বে। এই ধারণার ওপরে ভিত্তি করেই তারা কৌশল সাজিয়েছিল। কিন্তু এখন তা কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলেই আপাতভাবে মনে হচ্ছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোটি দ্রুত ভেঙে পড়বে কী না, তার ওপরেই নির্ভর করে ‘ধাক্কা এবং বিস্ময়’-এর ধারণাটি। কিন্তু সেই কাঠামোটি যদি প্রত্যাশার থেকেও শক্তপোক্ত হয়, তখন কী হবে?

যদি তাই হয়, তবে আরও তাৎক্ষণিক একটা সমস্যা দেখা দেয়: আলোচনা করার মতো কারা জীবিত আছেন?

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কিছুটা আড়ালেই থেকেছেন। সংঘর্ষের গোড়ার দিকে তিনি ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিবেশী দেশগুলির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। জানা যাচ্ছে যে তার ওই ভূমিকা নিয়ে আইআরজিসির ভেতর থেকেই ক্ষোভ জানানো হয়েছিল।

মোজতবা খামেনির ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি খুবই কম কথা বলেছেন, তাই কূটনৈতিক বিকল্পগুলি আরও সংকীর্ণ হয়ে এসেছে।

জেনেভার আলোচনায় ‘খুশি নন’ ট্রাম্প
তেহরানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পরে যেকোনো আলোচনার ওপরেই বিশ্বাস রাখা যায় না। ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে আসার পরের ১৪ মাস ধরে পারমাণবিক চুক্তির জন্য দুটি পৃথক দফায় আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও দুটি ক্ষেত্রেই তারপরে সামরিক অভিযান হয়েছে।

ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন যে ২৭ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় দ্বিতীয় দফা আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের তোলা বেশির ভাগ উদ্বেগরই সমাধান তারা দিয়েছিলেন। ভিয়েনায় প্রযুক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু মি. ট্রাম্প বলেন, যেভাবে আলোচনা চলছে, তা নিয়ে ‘খুশি নন’ এবং পরের দিনই হামলা শুরু হয়।

ইরানে যারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী, তাদের কাছে একটা স্পষ্ট বার্তা : আলোচনা মানেই যে হামলা হবে না, তা নয়, বরং আলোচনার কারণেও হামলা হতে পারে।

হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা ট্রাম্পের
তবে শুধু ইরানই সংঘাত বাড়িয়ে তুলতে পারে, তা নয়, মি. ট্রাম্পও শনিবার রাতে ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বিশ্বের ব্যস্ততম তেল রুটগুলোর অন্যতম হরমুজ প্রণালি আবারও খুলে দেওয়ার দাবি তুলে ইরানকে ৪৮ ঘণ্টা সময়সীমা বেঁধে দেন। তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে ওই সময়সীমা না মানা হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ‘ধ্বংস’ করে দেবে।

ইরান সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা হুমকি দেয় যে তাদের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপরে হামলা হলে পুরো অঞ্চলে হামলা চালানো হবে। ইরানের সুপ্রিম কাউন্সিল অব ডিফেন্সও পারস্য উপসাগরের কিছু অংশে মাইন পেতে রাখার সম্ভাবনার কথাও বলে রেখেছে।

এ হুমকি-পাল্টা হুমকির ফলে আগামী দিনে ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। ট্রাম্প এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, ফলে খুব বেশি বিকল্প খোলা থাকছে না। যেহেতু স্থলভাগে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের কোনো সেনাবাহিনী নেই, তাই তারা শুধুই আকাশপথে হামলা করতে পারে, যার ফলে ক্ষয়ক্ষতিই হবে, কিন্তু সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করানোর উদ্দেশ্য যে সফল হবেই তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। একই সঙ্গে ওইধরনের হামলার ফলে হরমুজ প্রণালী না খুলে দিয়ে আরও বড়ো পাল্টা হামলা হতে পারে।

পাল্টাপাল্টি হুমকির ফলে দুই পক্ষকেই সংঘাতের আরও বড়ো ঝুঁকিপূর্ণ একটা পর্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবু সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই ট্রাম্প সরে দাঁড়ান। ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে ‘খুব ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনা’ হয়েছে এবং ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর যেকোনো পরিকল্পিত হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন

নিজের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই ট্রাম্প কিছুটা পিছিয়ে আসেন। ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ইরানের সঙ্গে ‘খুব ভালো এবং ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে’ এবং ইরানের কোনো বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপরে হামলার পরিকল্পনা পাঁচ দিনের জন্য বন্ধ রাখছেন তিনি।

এখানে সময়টা তাৎপর্যপূর্ণ। নিজের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগেই তার এই সিদ্ধান্তের ফলে আপাতত বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা গেল।

বাজারগুলো অবশ্য সতর্কতার সঙ্গে সাড়া দিয়েছে। তেলের দাম কমেছে, তাতে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া গেছে, কিন্তু সেখানে বুঝে পা ফেলা হয়েছে। তবে ট্রাম্পের ঘোষণাটি বাস্তবে কতটা পালন করা হয়, সেটা এখনো দেখার এবং ওই প্রতিশ্রুতি কতদিন পালন করা হয়, সেটাও স্পষ্ট নয়। ওই ঘোষণা কি সত্যিই আলোচনার পথ প্রশস্ত করবে?

আরও মৌলিক যে প্রশ্নটি রয়ে গেছে, তা হলো ইরানে কে আসলে কথা বলছেন এবং আইআরজিসি ও সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব কার হাতে রয়েছে, কারণ দেখা যাচ্ছে যে তারা ‘ইচ্ছামতো গুলি; চালানোর মনোভাব নিয়ে চলছে।

যদি পরিস্থিতি একই রকম থাকে এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিবাদ জারি থাকে, দুই পক্ষই তাদের আগে থেকেই দিয়ে রাখা হুমকি কার্যকর করতে পারে। তবে এর পরিণতি হতে পারে মারাত্মক। গোটা অঞ্চলে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের, যার মধ্যে শুধু ইরানেরই প্রায় ৯ কোটি মানুষ আছেন, তাদের বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য জরুরি পরিষেবা গুরুতরভাবে ব্যাহত হতে পারে।

দুই পক্ষের কাছেই বিকল্প সীমিত হয়ে আসছে?
আলোচনার মাধ্যম সীমিত হয়ে আসায় ট্রাম্পের কাছেও বিকল্প কমে আসছে। এর পরে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেলে কৌশনগত লাভ খুব কমই হবে, বরং হামলা-পাল্টা হামলার ফলে ধ্বংসলীলা চলতে থাকবে দুই পক্ষেরই। তখন সামনে মাত্র কঠোরতম বিকল্পগুলিই খোলা থাকবে।

ইরানের জন্যও পরিস্থিতি কঠিন। দেশটিতে আগে থেকেই অর্থনৈতিক চাপে ছিল, তা নিয়ে ব্যাপক অস্থিরতাও চলছিল, তার মধ্যেই তারা সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের ফলে সেই অভ্যন্তরীণ চাপটা আপাতত কমেছে, এবং কর্তৃপক্ষকে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার সুযোগ এনে দিয়েছে।

এটি আবার একটি কঠিন ভারসাম্য তৈরি করেছে। উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে ইরানের পক্ষে বহিরাগত হুমকির মোকাবিল করা যেমন সহজ হবে, তেমনই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাও তারা সামলাতে পারবে। তবে একই সঙ্গে সেখানে ব্যয়বহুল ভুল করার ঝুঁকিও আছে।

উভয় পক্ষের কাছেই এখন বিকল্প সীমিত। ইরান সহজে পিছিয়ে আসতে পারবে না, সেক্ষেত্রে প্রমাণ হয়ে যাবে যে তারা দুর্বল। আবার যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলও শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে কোনো নির্ণায়ক ফলাফল অর্জন করতে পারবে না।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগে পদ সংখ্যা কমছে 
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
আগুনে পুড়ল চার পরিবারের ঘর
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগের আবেদন শুরু ২৯ মার্চ
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি: প্রবাসীদের বড় সুখবরের কথা জানালেন আসিফ…
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
তারেক রহমানের কথিত বন্ধুরা ১৭ বছর কই ছিল, নবীন ফ্যাশন ইস্যু…
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
তরুণীকে ডেকে নিয়ে ৩ জন মিলে ধর্ষণ, ‘প্রেমিক’ গ্রেফতার
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence