ইরানের কুর্দীরা এই সময়ে কেন জোট তৈরি করল?

০৮ মার্চ ২০২৬, ১০:৫২ AM
কুর্দিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্যরা

কুর্দিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্যরা © টিডিসি ফটো

ইরানি শাসকদের বিরোধী কুর্দি যে গোষ্ঠীগুলো ইরাকের উত্তরাঞ্চলে বসবাস করছে, তাদের দায়িত্বশীলরা বিবিসিকে বলেছেন যে সীমান্ত পার হয়ে ইরানে প্রবেশের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের, কিন্তু এখনো সেটার বাস্তবায়ন ঘটানো হয়নি।

ইরানের প্রবেশের এই পরিকল্পনা নতুন নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে এর প্রস্তুতি চলছে, তারা জানান। তবে তাদের যোদ্ধারা ইতোমধ্যে ইরানি ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে- এমন দাবি তারা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন।

কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টির হানা ইয়াজদানবানা বিবিসি সংবাদদাতা অর্লা গেরিনকে বলেছেন, "ইসলামিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ৪৭ বছর ধরে আমরা এটির প্রস্তুতি নিচ্ছি"। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, "এখনো পর্যন্ত একটি যোদ্ধাও অগ্রসর হয়নি"।

"যারা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়"- এমন যোদ্ধাদের বিষয়ে এখানে ইঙ্গিত করেন তিনি।

ইয়াজদানবানা ব্যাখ্যা করেন যে ছয়টি বিরোধী গোষ্ঠী, যারা সম্প্রতি "ইরানিয়ান কুর্দিস্তানের রাজনৈতিক শক্তির জোট" নামে একটি রাজনৈতিক ও সামরিক জোট গঠন করেছে, তারা তাদের কর্মকাণ্ড সমন্বয় করছে।

তিনি বলেন, "কেউ একা কাজ করছে না। আমাদের ভাইয়েরা পদক্ষেপ নিলে আমরা তা জানতে পারব"।

তিনি আরও জানান, তিনি আশা করছেন না যে যোদ্ধারা এই সপ্তাহে অগ্রসর হবে; কারণ যেকোনো পদক্ষেপ সবার আগে নির্ভর করছে আকাশপথে চলমান অভিযানের ওপর।

"আমাদের ওপরে আকাশসীমা পরিষ্কার না হলে আমরা অগ্রসর হতে পারি না এবং আমাদের অবশ্যই (ইরানি) শাসনব্যবস্থার অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করতে হবে—নইলে সেটা আত্মঘাতী প্রচেষ্টা হবে," তিনি আরো যোগ করেন, "এই শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত নৃশংস, আর আমাদের সবচেয়ে উন্নত অস্ত্র হলো কালাশনিকভ রাইফেল"।

প্রায় আড়াই থেকে সাড়ে তিন কোটি কুর্দী জনগোষ্ঠী তুরস্ক, ইরাক, সিরিয়া, ইরান ও আর্মেনিয়ার সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করেন। তারা মধ্যপ্রাচ্যের চতুর্থ বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী, কিন্তু কখনো স্থায়ী স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।

ইরানের প্রায় আট কোটি ৪০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে কুর্দিরা প্রায় ১০ শতাংশ এবং তাদের বেশিরভাগই সুন্নি মুসলিম। তারা মূলত দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাস করে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে যে ইরানি কুর্দিরা "দীর্ঘদিন ধরে গভীর বৈষম্যের শিকার" এবং তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার—পাশাপাশি অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষাও—দমন করা হয়েছে।

নির্বাসিত ইরানি কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীগুলো, যারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন লাভের চেষ্টা করছে, ইরাকের কুর্দিস্তানে অবস্থিত তাদের ঘাঁটি থেকে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মাঝে মাঝেই সশস্ত্র সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে আসছে।

নতুন জোট কী?
২০২৬ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি "ইরানি কুর্দিস্তানের রাজনৈতিক শক্তির জোট" গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে কার্যক্রম চালানো ছয়টি ইরানি কুর্দি বিরোধী সংগঠন এই জোটে যুক্ত হয়েছে, যাদের লক্ষ্য ইরানি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের প্রচেষ্টা সমন্বয় করা।

জোটে রয়েছে কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টি, কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ ইরান, কুর্দিস্তান ফ্রি লাইফ পার্টি, কুর্দিস্তান স্ট্রাগল অর্গানাইজেশন অব ইরান 'খাবাত', কুর্দিস্তানের শ্রমিকদের কমালা—এছাড়াও পরে জোটে যোগ দেয় কমালা পার্টি অফ ইরানিয়ান কুর্দিস্তান।

এই জোট গঠনের ঘোষণা আসে ইরান ও ওই অঞ্চলের এক সংবেদনশীল রাজনৈতিক মুহূর্তে, যখন কুর্দি বিরোধী শক্তিগুলো মনে করে যে তারা ঐক্যবদ্ধ হলে ইসলামিক রিপাবলিকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সক্ষমতা বাড়তে পারে।

বিশেষত তাদের ভাষ্যমতে, ইরানি শাসনব্যবস্থার বৈধতার অবক্ষয় এবং বিরোধী শক্তিগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মধ্যে এই জোটের দরকার ছিল।

তবে জোটটি দ্রুতই মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার মুখে পড়ে, কারণ একতাবদ্ধ হওয়ার ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী।

এই পরিস্থিতিতে জোটটি ইরানের ভেতরে কুর্দি অঞ্চলের সশস্ত্র বাহিনীকে সরকারের পক্ষ ত্যাগ করার আহ্বান জানায়। তারা মনে করছে, ইরানের চলমান অবস্থা ইঙ্গিত দেয় যে দেশটি "গভীর ও মৌলিক রূপান্তরের" দিকে যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠার সময় দেওয়া বিবৃতিতে অংশগ্রহণকারী শক্তিগুলো জানায়, তাদের অভিন্ন লক্ষ্য হলো "ইরানে ইসলামিক রিপাবলিক উৎখাতে সংগ্রাম করা এবং কুর্দি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জন," পাশাপাশি কুর্দিস্তান অঞ্চলে কুর্দিদের রাজনৈতিক ইচ্ছার ভিত্তিতে একটি জাতীয় গণতান্ত্রিক সত্তা প্রতিষ্ঠা করা।

'বিচ্ছিন্নতাবাদী বক্তব্য'
এই জোটের ঘোষণা ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, যেখানে সংগঠনগুলোর বেশিরভাগ সক্রিয়।

আঞ্চলিক সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায় যে কিছু দল প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে হুমকি দিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। অঞ্চলটি তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেবে না বলে স্পষ্ট করা হয়।

এই অবস্থান ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতার সংবেদনশীলতাকে প্রতিফলিত করে—কারণ একদিকে ইরানি কুর্দি ভিন্নমতাবলম্বীদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা চলছে।

অন্যদিকে, নতুন জোটটি কয়েকটি কুর্দি ও আঞ্চলিক শক্তির সমর্থনও পেয়েছে।

আহওয়াজি ডেমোক্রেটিক পপুলার ফ্রন্ট এক বিবৃতিতে জোট গঠনকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, কুর্দিদের জাতীয় অধিকারের সংগ্রাম ইরানে পারসিয়ান নয় এমন জাতিগোষ্ঠীগুলোর বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ।

সিরিয়ার ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পার্টিও উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি কুর্দি ঐক্য জোরদারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ—বিশেষ করে সংবেদনশীল রাজনৈতিক সময়ে—এবং এটি কুর্দিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে কুর্দিদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে তারা।

তবে জোটটি কিছু ইরানি বিরোধী ব্যক্তিত্বের সমালোচনার মুখেও পড়েছে। বিশেষত ইরানের শেষ শাহ-এর (সম্রাট) নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভি অভিযোগ করেছেন যে জোটের দলগুলো এমন বিচ্ছিন্নতাবাদী বক্তব্য গ্রহণ করছে যা ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

পাহলভি বলেছেন, ইরানের ঐক্য রক্ষার বিষয়টি আপসহীন এবং দেশের "জাতীয় ঐক্য" নিয়ে আর কোনো আলোচনার বিরোধিতা করেন।

জোটটি এই বক্তব্যের জবাবে পাহলভির বিরুদ্ধে বর্জনমূলক অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ তোলে এবং জোর দিয়ে জানায় যে তাদের দাবি হলো ইরানের ভেতরে গণতান্ত্রিক কাঠামোর অধীনে কুর্দিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

আরও সংবেদনশীল পর্যায়
বিবিসি মনিটরিং ইউনিটের পর্যবেক্ষণ করা রিপোর্টগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি ইরানের ভেতরে একটি বিদ্রোহ উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কিছু কুর্দি বাহিনীকে অস্ত্র দেওয়ার কাজ করছে।

এতে আরও বলা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোটে থাকা দলগুলোর একটি, ইরানের কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা মুস্তাফা হিজরির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

এ তথ্যের কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ নেই, তবে এটি ইরানের অভ্যন্তরে চলমান ঘটনাবলীর প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহের মাত্রা এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কুর্দি বাহিনী কী ভূমিকা রাখতে পারে—সেটির সম্ভাব্যতা তুলে ধরে।

ইরানি কুর্দিস্তানের রাজনৈতিক শক্তির জোট গঠন বহু বছরের বিভক্তির পর কুর্দি দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার এক প্রচেষ্টা। এটি আরও প্রতিফলিত করে যে এই শক্তিগুলো উপলব্ধি করছে—ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক রূপান্তর তাদের রাজনৈতিক উপস্থিতি জোরদার করা এবং কুর্দি অধিকারের দাবি তোলার জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

তবে এই জোটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একাধিক জটিল উপাদানের ওপর—যার মধ্যে রয়েছে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির অগ্রগতি, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থান এবং আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কুর্দি দলগুলোর নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখার সক্ষমতা। [সূত্র: বিবিসি বাংলা]

ট্যাগ: রাজনীতি
জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামানের ছেলেকে ছুরিকাঘাত
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
হামের টিকা নিয়ে তদন্ত করছে সরকার
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
জায়গা দখল করে ছাত্রদল নেতার অবৈধ দোকান, নিউজ করায় সাংবাদিকে…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
এআই দিয়ে ভবনের কাঠামোগত শক্তি নির্ণয়ে ৯৯ শতাংশ নির্ভুলতা, য…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
‘ব্যক্তিত্বহীন’ আখ্যা দিয়ে মন্তব্যে নারাজ সাদিক, রাশেদ বললে…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
জেলা ও মহানগরের নির্বাচিত নতুন আমিরের নাম ঘোষণা করল জামায়াত…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950