ভিত্তি নেই রাবির ‘প্রাচ্যের ক্যামব্রিজ’ উপাধির

২৫ আগস্ট ২০২০, ০৬:৩৬ PM

© ফাইল ফটো

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘প্রাচ্যের ক্যামব্রিজ’ আখ্যা দিয়ে থাকেন অনেকেই। দেশের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ দুটি অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে কিছু অবকাঠামো ও শিক্ষার ক্যারিকুলাম মিলে যাওয়ায় অনেকে বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় দুটির সাথে এদের তুলনা করে থাকেন। আর সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই উপাধির কোন ভিত্তি নেই। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় দুটিতে শিক্ষার মান, গবেষণা সুনাম, অভিনবতত্ব ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কতটা এগিয়ে দেশের প্রাচীনতম এই দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান? শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিশ্ববিখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা করা কতটা যুক্তিযুক্ত? সেই প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে।

পড়ুন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা ভিত্তিহীন

ডারউইনের ‘বিবর্তনবাদ’, জে জে থমসনের ‘ইলেকট্রন আবিষ্কার’, ফ্রান্সিস বেকনের ‘বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রসার’, লর্ড কেভিনের ‘থার্মোডাইনামিকস’ অথবা নিউটনের ‘গতির সূত্র’ কিংবা ক্যালকুলাস তত্ত্বের উদ্ভাবন—অভিনব ও বিশ্বখ্যাত এ আবিষ্কারগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। জগৎখ্যাত বিজ্ঞানীদের সঙ্গে গর্বিত হয়ে ইংল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলোর মধ্যে একটি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়। ১২০৯ সালে যাত্রা শুরু বিশ্ববিদ্যালয়টির। বিশ্বের বুকে দাঁড়িয়ে এখনও শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনীতে সুনাম ও খ্যাতি অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে তারা।

অন্যদিকে, দেশের বৃহত্তর ও পুরনো ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। ইতিহাস ঐতিহ্যের দৌঁড়েও অনেকটা এগিয়ে মতিহারের লীলাভূমিতে গড়ে উঠা এই বিশ্ববিদ্যালয়। জন্মলগ্ন থেকেই অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে দেশের অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

কালের পরিক্রমায় বহু খ্যাতিমান পণ্ডিত, গবেষক ও জ্ঞানতাপসের সংস্পর্শ পেয়েছে চির সবুজ এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। ভাষাবিদ ও জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌, ভাষাবিজ্ঞানী ড. এনামুল হক, প্রখ্যাত তাত্ত্বিক রাজনীতিবিদ বদরুদ্দীন উমর, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রয়াত বিচারপতি হাবিবুর রহমান, খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ডেভিড কফ, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী পিটার বার্টচী, সংগ্রামী শহীদ প্রফেসর ড. শামসুজ্জোহা, প্রফেসর ড. এমএ বারী জীবন্ত শহীদ খ্যাত অধ্যাপক মজিবর রহমান দেবদাস, উপমহাদেশের বরেণ্য কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সংস্পর্শে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনটি আলোকিত হয়েছে। এখনও বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার বসাকসহ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অনেক বরেণ্য পণ্ডিত শিক্ষকগণ গবেষণাকার্য চালিয়ে যাচ্ছেন।

শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ, গবেষণার সুনাম, প্রভাব, অভিনবত্ব ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের ক্ষেত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যথেষ্ট এগিয়ে।

পড়ুন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনোদিনও প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ছিল না

সেদিক থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ববিখ্যাত ক্যামব্রিজের সাথে তুলনা করা কতটা যুক্তিযুক্ত জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন এন্ড রিসার্চ বিভাগের অধ্যাপক ও ডিরেক্টর ড. গোলাম কবির বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়কে কখন প্রাচ্যের ক্যামব্রিজ বলা হয়েছে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন নথি পত্রে উল্লেখ আছে বলে আমার জানা নেই। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ৪৫ বছরের শিক্ষা ও চাকুরি জীবনে আমি কখনও প্রশাসনের কাউকে একথা বলতেও শুনিনি।

তিনি বলেন, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে বিশ্বের প্রচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্যতম। যেখানে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই যার সুনাম ও সুখ্যাতি বিশ্বের বুকে সমাদৃত। যেখানে নিউটন, ডারউইন, ফ্রান্সিস বেকনসহ বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের জন্ম হয়েছে। এখন সেখানে বিশ্বের বিখ্যাত গবেষক ও বিজ্ঞানীদের পদচারণায় সবস্থান ধরে রেখেছে বিশ্ববিখ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি।

তিনি আরও জানান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যের ক্যামব্রিজ ছিল/আছে কিনা? এ নিয়ে বিতর্ক করার চেয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে আন্তরিক হওয়া বেশি জরুরি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যের কেমব্রিজ কিনা তা জানি না। তবে এতটুকু বলতে পারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় একটি ক্ষেত্রে অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, হার্ভার্ডসহ বিশ্বের নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও একধাপ এগিয়ে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে একটি গৌরব ও ঐতিহ্যময় অতীত। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বাঙ্গালি ইতিহাসের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছিল সকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। ১৯৬২ সালের বিতর্কিত হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিল আন্দোলনে, ৬৬ এর ছয়-দফা, ‘৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানে এবং ‘৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। এমনকি অধিকার প্রতিষ্ঠায় জীবরও দিয়েছেন অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। ফলে আমরা পেয়েছি লাল সবুজের একটি পতাকা। যেটা বিশ্বে অন্যদের তুলনায় বিরল।

তবে হ্যাঁ, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এখানে তুলনামূলক অনেক ভাল গবেষণা হয়। এখানে রয়েছেন অরুণ কুমার বসাকসহ অনেক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অধ্যাপক। যাদের গবেষণা দেশবিদেশে অনেক সমাদৃত। সম্প্রতি স্কোপাস’র প্রকাশিত জরিপে গবেষণাকর্মসমূহ এবং গবেষণা সংশ্লিষ্ট পরিমিতির নিরিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষস্থান অর্জন করেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানকে আরও একধাপ এগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু গবেষণা কার্যে শিক্ষকদের অংশ গ্রহণ ও মান সম্মত গবেষণার পরিমাণ খুবই কম। যেটা দিয়ে বিশ্ব র‌্যাংকিং-এ টিকে থাকা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তবে সবার একাগ্রতা ও যৌথ প্রচেষ্টায় আমরাও চাইলে একদিন কেমব্রিজের সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারি, এটা অসম্ভব কিছু না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. সুলতান-উল ইসলাম বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্যামব্রিজের সাথে তুলনা করা যায় কিনা সেটা বড় বিষয় নয়। আমরা একটা বস্তুর সাথে অন্য বস্তুর তুলনা তখনই করি, যখন তাদের মধ্যে যথার্থ মিল খুঁজে পাই। আমরা প্রাচ্যের শেক্সপিয়ার বলি চীনের বিখ্যাত নাট্যকার ‘কুয়ান হান ছিংকে’-কে। তেমনি প্রাচ্যের হোমার বলা হয় কবি ফেরদৌসীকে। আবার প্রাচ্যের গ্রেট ব্রিটেন বলা হয় জাপান-কে। এগুলো উপমা হিসেবে বলা হয়ে থাকে।

তেমনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো কিংবা শিক্ষা পদ্ধতি ও সিলেবাসের মিলের কারণে হয়তো অনেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের ক্যামব্রিজ আখ্যা দিয়ে থাকেন। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিখ্যাত ক্যামব্রিজের মত এতো বিশ্ব সেরা মহামানবের দেখা না পেলেও পেয়েছে অনেক পণ্ডিত, গবেষক, জ্ঞানতাপস ও ত্যাগী মনীষীর। যাদের শ্রম ও ত্যাগের বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয় অর্জন করেছে সুনাম ও খ্যাতি।

তিনি জানান, শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ, গুনগত মান, শিক্ষা ও গবেষণা খাতে যথাযথ বরাদ্দ এবং স্বজনপ্রীতি ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে এসে যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যম ও সকলের যৌথ প্রচেষ্টায় হয়তো একদিন আমরাও বিশ্বের নামী-দামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাতারে নিজেদের পৌঁছাতে সক্ষম হব। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এর সঙ্গে ক্যামব্রিজের তুলনা করে খুব একটা ফয়দা হাসিল হবে না।

‘‘বৃক্ষ তোমার নাম কি ফলেই পরিচয়’’ জনৈক মনীষীর মতে, ‘‘অনুকরণ করার মধ্যে সৃষ্টি করার আনন্দ নেই। কিছু করে যদি আনন্দ পেতে চান। সুনাম অর্জন করতে চান। তবে নিজের মতো হোন’’।তাই নিজ যোগ্যতা ও কর্মপ্রচেষ্টায় আমাদেরকেই বিশ্বের বুকে স্থান করে নিতে হবে। তার জন্য চাই সৎ যোগ্য নিষ্ঠা ও কর্তব্যপরায়ণ মানুষ। রাবি প্রাচ্যের ক্যামব্রিজ এটা কোন সার্টিফিকেট প্রাপ্ত ক্যামব্রিজ নয়। এটা মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ক্যামব্রিজ।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় জামায়াতের আমিরের ক্ষোভ
  • ১৮ এপ্রিল ২০২৬
হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুতে শোকাহত পরিবারের পাশে প্রধানমন্…
  • ১৮ এপ্রিল ২০২৬
পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে মুয়াজের মাথায় হাতুড়ি দিয়ে পেটাতে থা…
  • ১৮ এপ্রিল ২০২৬
এনসিপিতে শতাধিক নেতাকর্মীর যোগদান, আছেন মুক্তিযোদ্ধা ও জুলা…
  • ১৮ এপ্রিল ২০২৬
জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ল
  • ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শিক্ষাদর্শন
  • ১৮ এপ্রিল ২০২৬