করোনার লাগামহীন দাপটে জনজীবনে নেমেছে ক্লান্তির অমানিশা। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সময় পাঁচ মাস পূর্ণ হয়েছে। এদিকে ক্যাম্পাস বন্ধ হওয়ায় কর্মহীন হয়ে দুরূহ জীবন যাপন করছেন ক্যাম্পাসের অধিকাংশ ক্ষুদ্র ফুটপাত দোকানের মালিক কর্মচারীরা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসের উল্লেখযোগ্য আড্ডার প্রাণকেন্দ্র ধরা হয় টুকিটাকি চত্বরকে। সেখানকার মুখরোচক পরোটা/রুটি, গরম ডাল খিচুরির সাথে সুস্বাদু সবজি, মচমচে সিংগাড়া আর বুট-বুন্দার আমেজে কাটে শত শত শিক্ষার্থীর সকাল। শুধু কি তাই! কড়া লিকারে আদা চায়ে চুমুক না দিলে যেন দিনই বৃথা মনে হয় তাদের। দিনভর শিক্ষার্থীদের গল্পগুজব আর আড্ডায় মুখরিত থাকে চত্বরটি।
এদিকে শিক্ষার্থীদের চাহিদামত বিরতিহীন খাবার তৈরী ও পরিবেশনে ব্যস্ত থাকেন দোকানের মালিক ও কর্মচারীরা। স্বল্পমূলের প্রিয় এই খাবারগুলো খেতে ক্যাম্পাসের সব স্তরের শিক্ষার্থীদের নামে ঢল। বেঞ্চে বসতেই আবেগঘন দৃষ্টিতে সামনে এসে কর্মচারী ছেলেটা বলতে থাকে-
‘মামা, কি খাবেন? রুটি না পরোটা? গরম খিচুড়ি আর সবজি দিব নাকি মামা? গরম গরম সিংগাড়াও আছে। কয়টা চা হবে, মামা?’— তাদের এই জিজ্ঞাসা শুধু ব্যবসার উদ্দেশ্যই নয়, সেখানে মিশে থাকে আবেগ ও ভালবাসা। দিন শেষে যেটুকু উপার্জন হয়, সেটুকু দিয়েই পরিবারের মুখে হাসি ফোঁটাতে চেষ্টা করেন তারা।
কিন্তু আজ সেখানে আর সেই আড্ডাঘন মুহুর্তগুলো নেই। চা কাপের টুংটাং শব্দে চারপাশ মেতে উঠে না। সেখানে আর ভোরের আলোর সাথে সাথে চুলায় আগুন জ্বলে না। বিকেল গড়ালে বন্ধুদের সেই আড্ডাটা আর বসে না। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের রাতের আড্ডায় মেতে উঠে না চত্বরটি। দোকানের ছোট্ট ছেলেটা মামা ডেকে আর কারো কাছে আসতে পারে না। করোনা যেন আজ সেই আনন্দঘন মুহুর্তগুলোর বুকে ভাঁটা ফেলেছে।
করোনাকালীন সময়ে কেমন আছেন তারা, কিভাবে কাঁটছে তাদের জীবন— জানতে চাইলে টুকিটাকি চত্বরের ফুটপাতের হোটেল ব্যবসায়ী বাবু মিয়া দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, আজ পাঁচ মাস, ক্যাম্পাসে যেতে পারি না। নেই হোটেল ঘরটি। সেই ছোট্টকাল থেকে ক্যাম্পাসের গন্ডিতেই কাটিয়ে আসছি শৈশব, কৈশোরে ও বার্ধক্যের এই জীবনটা। শত শত শিক্ষাক ও শিক্ষার্থীর সংস্পর্শে থেকে পেয়েছি স্নেহ ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। প্রতিদিন হাজারো তারুণ্যের সংস্পর্শে থেকে নিজের মধ্যে কখন বার্ধক্যের ছাপ খুঁজে পাইনি। নিজের জীবনের সবটুকু সময় শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সেবায় অতিবাহিত করে এসেছি। দিনশেষে যেটুকু আয় রোজগার হয়েছে। সেটুকু দিয়েই বড় আনন্দে দিন কেঁটেছে। কোন দিন লাভের দেখা না মিললেও শিক্ষার্থীদের হাসিখুশি মুখগুলো দেখে ভুলে গিয়েছি দুঃখের কথাগুলো। কিন্তু ক্যাম্পাসবিহীন এই পাঁচ মাসে যেন আজ নিজেকে অনেক বৃদ্ধ মনে হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, খেয়ে না খেয়ে কাটছে দিন। ক্যাম্পাসের হোটেলটাই ছিল পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস। করোনার কারনে সেটাও আজ বন্ধ হয়ে গেছে। বৃদ্ধ বয়সে এসে তেমন আর কোন কাজও করতে পারি না। দিনে দুমুঠো খেয়ে বাঁচা টাও যেন আজ দুরূহ হয়ে পড়েছে। পাই না আর আগের মত মানসিক প্রশান্তি।
টুকিটাকি চত্বরের হোটেলবয় রনি বলেন, কোনরকম খেয়ে, না খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন কাজকর্মহীন থাকায় অভাব অনটনে ধার-দেনা আর সাহায্য সহযোগিতায় দিন অতিবাহিত করতে হচ্ছে।ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের হাসিতামাশা আর খুনসুটিতে দিন-রাত মেতে থাকত টুকিটাকি চত্বরটি। তাদের সংস্পর্শে থেকে ভালই কাটছিল দিনগুলো। দিন শেষে যে টাকা পেতাম, সেটাতেই কোরমনরকম চলত সংসার। আজ সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। করোনা যেন জীবনটাকে বড়ই ছোট করে দিয়েছে আজ।
টুকিটাকি চত্বরের কম্পিউটার দোকানদার আতাবুল ইসলাম বলেন, অর্ধ অনাহারে কাঁটছে দিন। প্রতিটি মুহুর্তই যেন আজ হতাশা আর দুর্বিষহে ভরপুর। রাত কাটে উৎকন্ঠায়। দীর্ঘ পাঁচ মাসে জীবনকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছি। অভাব অনটনে বিপর্যস্ত জীবন কাটছে প্রতিনিয়ত। কবে আবার মুখরিত হবে টুকিটাকি চত্বরেটি? কবে আবার দুঃখ দুর্দশা মুক্ত একটা ভোরের দেখা পাব? এই প্রত্যাশায় প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যাই।