ঢাবি ভিসির জাপান-কোরিয়া সফরে যত অর্জন © ঢাবি জনসংযোগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম জাপান ও কোরিয়ায় সরকারি সফর শেষে সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। সফরকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কাগাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একাডেমিক সহযোগিতা জোরদার ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এবং কাগাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক নাতসুও উয়েদা নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।
উভয় বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে ‘দ্য প্রজেক্ট ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অব আ ফ্লাড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম ফর হাওরস’ (The Project for the Development of a Flood Early Warning System for Haors) শীর্ষক ৫ বছর মেয়াদি একটি যৌথ গবেষণা প্রকল্প শুরু করেছে। এটি ‘স্যাটরেপস’ (SATREPS - Science and Technology Research Partnership for Sustainable Development) কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত হচ্ছে, যা জাইকা (JICA) ও জেএসটি (JST) কর্তৃক যৌথভাবে অর্থায়িত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অনুষদের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগ এবং কাগাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অনুষদ যৌথভাবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের মেয়াদকাল জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩১ পর্যন্ত।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো- বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর উদ্দেশ্য হলো- বন্যা পূর্বাভাস সক্ষমতা জোরদার করা এবং সময়মতো সতর্কবার্তা প্রচার নিশ্চিত করা। প্রকল্পটি হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায়, বিশেষ করে বোরো ধান চাষ ও অন্যান্য কৃষি সম্পদ সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে জাপান দীর্ঘকাল ধরেই বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এই সমঝোতা স্মারক বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ গবেষণা, একাডেমিক সভা এবং জ্ঞান বিনিময়ের পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
জাপান সফরকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সভায় অংশগ্রহণ করেন। তিনি জাপানের এহিমে বিশ্ববিদ্যালয় ও কাগাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনায় মিলিত হন। যার উদ্দেশ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাপানের এই দুটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চলমান যৌথ একাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা।
বৈঠকে গত জুলাই মাসে শুরু হওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি SATREPS প্রকল্পের অগ্রগতি-সহ চলমান ও প্রস্তাবিত সহযোগিতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা হয়। উভয় পক্ষই যৌথ গবেষণা, শিক্ষক বিনিময়, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং একাডেমিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের বিষয়ে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদ এবং এহিমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর মেরিন এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ’-এর মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়-পর্যায়ের চুক্তিতে উন্নীত করার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। এছাড়া, যৌথ গবেষণা কার্যক্রম ও দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এহিমে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ‘স্যাটেলাইট অফিস’ এবং একটি ‘ইন্টারন্যাশনাল কোলাবোরেটিভ রিসার্চ ল্যাবরেটরি (ICRL)’ প্রতিষ্ঠার বিষয়েও আলোচনা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগ এই ল্যাব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করবে। শিক্ষা বিনিময় ও যৌথ গবেষণাকে উৎসাহিত করার উপায় হিসেবে ‘ফ্যাকাল্টি ক্রস-অ্যাপয়েন্টমেন্ট’ (শিক্ষকদের পারস্পরিক নিয়োগ)-এর বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনকে এহিমে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের জন্য ‘ক্রস-অ্যাপয়েন্টমেন্ট’-এ যোগদানের অনুমতি প্রদান করেছে।
পরে, উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪তম সমাবর্তনে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে যোগদানের জন্য জাপানের ‘সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন’-এর প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. আতসুশি সুনামি-কে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণপত্র প্রদান করেন। SPF-এর প্রেসিডেন্ট-এর পক্ষে ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মি. এইজি সাকাই এই আমন্ত্রণপত্র গ্রহণ করেন। এছাড়া, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ‘ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টাল স্ট্র্যাটেজিস’ (IGES) -এর প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক তাকেউচি কাজুহিকো-এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।
ঢাবি উপাচার্যের নেতৃত্বে ১৪ প্রতিষ্ঠানের ৩৯ সদস্যের প্রতিনিধি দলের দক্ষিণ কোরিয়া সফর
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদ্ভাবন, সৃজনশীলতা ও তরুণ উদ্যোক্তা বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ১৪টি প্রতিষ্ঠানের ৩৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল দক্ষিণ কোরিয়া সফর করে। এ প্রতিনিধিদলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ ৬টি মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি), ৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
বাংলাদেশ সরকার ও দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা Korea International Cooperation Agency (KOICA)-এর যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন Capacity Building of Universities in Bangladesh to Promote Youth Entrepreneurship (CREATIVE Bangladesh) প্রকল্পের আওতায় এ সফরের আয়োজন করা হয়।
প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২৫ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় আট দিনব্যাপী Management-Level Invitational Training Program অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি ২৫ অক্টোবর থেকে ৮ নভেম্বর পর্যন্ত Instructor-Level Invitational Training Program আয়োজন করা হয়। এসব প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারক, শিক্ষক ও প্রশিক্ষকরা অংশগ্রহণ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানাইজেশন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড লিডারশিপ বিভাগের ইনোভেশন, ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ সেন্টারের যৌথ তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্যোক্তা উন্নয়নবিষয়ক নীতি, কৌশল, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, কার্যকর উদ্যোগ ও সফল অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের বাস্তবভিত্তিক ধারণা প্রদান করা। বিশেষ করে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, জাতীয় পর্যায়ে স্টার্টআপ সহায়তাবিষয়ক নীতি ও কার্যকর মানদণ্ড প্রণয়ন এবং উদ্যোক্তা সহায়ক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সফরকালে অংশগ্রহণকারীরা দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্যোক্তা উন্নয়ন মডেল, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ কার্যক্রম, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তা সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার কৌশল সম্পর্কেও তারা ধারণা লাভ করেন।