ব্যাংকনোটে কলমের আঁচড়ে বাংলাদেশকে বুনছেন ঢাবির মুহাম্মাদ সাদ

২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৪ PM , আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৫ PM
মুহাম্মাদ সাদ ও তাঁর আঁকা কয়েকটি ব্যাংকনোট

মুহাম্মাদ সাদ ও তাঁর আঁকা কয়েকটি ব্যাংকনোট © টিডিসি সম্পাদিত

শৈশবে বইয়ের পাতায় থাকা গাড়ি আর বিমানের ছবি দেখে শিশুমনে আঁকাআঁকির আগ্রহ নতুন নয়। আর দশটা শিশুর মতো তিনিও একই চেষ্টা করেছিলেন। তবে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় ব্যাংকনোটে জালের মতো সূক্ষ্ম রেখা দিয়ে তৈরি প্রতিকৃতি ভাবনার সাগরে ফেলে তাকে। সেই কৌতূহল থেকে শুরু হয় অনুশীলন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আগ্রহ রূপ নেয় ব্যতিক্রমী এক শিল্পচর্চায়। এখন কলম, পেন্সিল ও রঙের আঁচড়ে কাগজে ফুটিয়ে তোলেন ব্যাংকনোটের নকশা। প্রতিকৃতির সূক্ষ্ম রেখা, অক্ষরের বিন্যাস, ক্যালিগ্রাফি আর নকশার নিপুণ সমন্বয়ে তৈরি করেন নিজের কল্পনার নোট। শুধু নান্দনিক নকশা নয়, ব্যাংকনোটের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে তাঁর ভাবনা। তাঁর স্বপ্ন, একদিন বাংলাদেশের ব্যাংকনোটের নকশা তৈরিতে অবদান রাখা। বলছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুহাম্মাদ সাদের কথা।

মুহাম্মাদ সাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি চারুকলা অনুষদের শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের মাস্টার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়ন করছেন। থাকেন হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলে। তাঁর বাড়ি ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলায়। শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যাংকনোটের নকশা তৈরির এই ব্যতিক্রমী চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

সাদের ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহের শুরু শৈশবেই। ছোটবেলায় যেসব বই হাতে পেতেন, সেগুলোর পাতায় থাকা বিভিন্ন গাড়ি ও বিমানের ছবি তাঁকে আকৃষ্ট করত। ছবিগুলো দেখে নিজেও আঁকার চেষ্টা করতেন। পাশাপাশি কেজি স্কুলে পড়ার সময় ড্রয়িং ক্লাস থাকায় ছবি আঁকার চর্চাও চলতে থাকে। এভাবেই ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর।

তবে ব্যাংকনোটের নকশা নিয়ে বিশেষ কৌতূহল তৈরি হয় সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়। ব্যাংকনোটে প্রতিকৃতির চারপাশে জালের মতো দেখতে অসংখ্য সূক্ষ্ম রেখার বিন্যাস তাঁকে ভাবিয়ে তুলত। কীভাবে এত নিখুঁতভাবে এসব রেখা দিয়ে প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়, তা জানার আগ্রহ থেকেই এ ধরনের নকশা আঁকার অনুশীলন শুরু করেন তিনি। শৈশবের সেই কৌতূহলই পরবর্তী সময়ে তাঁর শিল্পচর্চায় আলাদা মাত্রা যোগ করে।

চারুকলা অনুষদে ভর্তি হওয়ার পর ব্যাংকনোটের নকশা নিয়ে সেই আগ্রহ আরও বিস্তৃত হয়। একপর্যায়ে বাংলাদেশের ব্যাংকনোটে ব্যবহৃত প্রতিকৃতির আদলে নিজের মতো করে নকশা তৈরি করতে শুরু করেন সাদ। জয়নুল আবেদীন, তাজউদ্দীন আহমেদ, কাজী নজরুল ইসলাম, খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তির প্রতিকৃতি সংবলিত একাধিক ব্যাংকনোটের নকশাও এঁকেছেন তিনি। তাঁর তৈরি নকশাগুলোতে প্রচলিত ব্যাংকনোটের বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করার পাশাপাশি নিজস্ব শিল্পভাবনা প্রকাশের চেষ্টাও রয়েছে বলে জানান তিনি।

ব্যাংকনোটের নকশা তৈরি সাধারণ ছবি আঁকার মতো নয়। এখানে প্রতিকৃতির পাশাপাশি অসংখ্য সূক্ষ্ম রেখা, জটিল নকশা, অক্ষরের বিন্যাস বা লেটারিং এবং ক্যালিগ্রাফির সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি রেখার নিখুঁত বিন্যাস নকশাটিকে স্বতন্ত্র রূপ দেয়। ফলে এ ধরনের কাজের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য্য, মনোযোগ এবং সূক্ষ্মভাবে আঁকার দক্ষতা।

সাদ জানান, প্রচলিত ব্যাংকনোট এনগ্রেভিং পদ্ধতিতে তৈরি হলেও তাঁর নকশাগুলো কলম, পেন্সিল ও রঙের সাহায্যে আঁকা। সূক্ষ্ম রেখার কাজ করতে তিনি জাপানি সাকুরা পিগমা, রোট্রিংসহ বিভিন্ন ধরনের কলম ও কিছু ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করেন। এমনকি হাঁসের পালক দিয়েও ড্রইং করেছেন তিনি। এসব উপকরণের কিছু বাংলাদেশেই পাওয়া যায়, আবার কিছু কলম অর্ডার দিয়ে বিদেশ থেকে আনতে হয়েছে।

একেকটি নোটের নকশা তৈরি করতে একেক রকম সময় লাগে। তবে নির্দিষ্ট করে কত সময় লাগে, তা বলা কঠিন। কারণ, তিনি একটানা কাজ করেন না। নকশার ধরন ও কাজের ধারাবাহিকতার ওপর নির্ভর করে সময়ের তারতম্য ঘটে বলে জানান সাদ। সূক্ষ্ম রেখা, প্রতিকৃতি ও অন্যান্য নকশার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নকশা দাঁড় করাতে তাঁকে মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে হয়।

ব্যাংকনোটের নকশা তৈরির ক্ষেত্রে সাদের আগ্রহ শুধু প্রতিকৃতি আঁকা কিংবা সূক্ষ্ম রেখার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের উপস্থাপনের ভাবনা। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকনোটে সাধারণত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় নেতা, রাজা, বিখ্যাত কবি কিংবা বিজ্ঞানীদের প্রতিকৃতি স্থান পায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও কোন কোন ব্যক্তির ছবি ব্যাংকনোট বা স্মারক মুদ্রায় স্থান পেতে পারে, তা বিবেচনায় নিয়ে নকশা তৈরি করেন তিনি।

নিজের কাজকে আরও সমৃদ্ধ করতে বিভিন্ন দেশের ব্যাংকনোটের নকশা ও নকশাকারদের কাজ অনুসরণ করেন সাদ। এ ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার ব্যাংকনোট তাঁর বিশেষ আগ্রহের জায়গা। এসব দেশের নোটের নকশা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নকশার ধরন, প্রতিকৃতির উপস্থাপন এবং সূক্ষ্ম রেখার ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

যেসব নকশাকারের কাজ তিনি অনুসরণ করেন, তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশের মুছলিম মিয়া ও কাজী গোলাম মোস্তফা রয়েছেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ব্রায়ান থম্পসন, কানাডার জর্জ পেরাল ও চার্লস এফ. কমফোর্ট এবং অস্ট্রেলিয়ার ম্যাক্স রবিনসনের কাজ থেকেও অনুপ্রেরণা নেন তিনি। তাঁদের নকশা পর্যবেক্ষণ করে নিজের কাজের ধরন ও দক্ষতা আরও সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছেন সাদ।

সাদের কাছে শিল্পচর্চা পড়াশোনার পাশাপাশি চালিয়ে যাওয়া কোনো শখ নয়; বরং শিল্পচর্চাই তাঁর পড়াশোনার বিষয়। শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগে অধ্যয়নের কারণে শিল্প ও নকশার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক একাডেমিকভাবেও যুক্ত। তিনি জানান, বাংলাদেশের প্রচলিত ব্যাংকনোটের নকশাকাররাও চারুকলার প্রাক্তন শিক্ষার্থী। ফলে চারুকলার শিক্ষাজগতের সঙ্গে ব্যাংকনোটের নকশা তৈরির একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

ব্যাংকনোটের নকশা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেশের জাল টাকার সমস্যাও সাদের ভাবনায় জায়গা করে নিয়েছে। বাংলাদেশে জাল টাকার কারণে প্রতিদিন অনেকে প্রতারিত হন। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য উচ্চ নিরাপত্তাবিশিষ্ট পলিমার ব্যাংকনোট চালু করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এ কারণেই বর্তমানে পলিমার নোট নিয়ে কাজ করছেন সাদ।

পলিমার নোটের উপাদান ও নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রচলিত কাগজের নোটের চেয়ে ভিন্ন। যথাযথ নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য যুক্ত করা গেলে এ ধরনের নোট জাল করা কঠিন করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। সাদের আগ্রহ তাই কেবল নান্দনিক নকশা তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়; ব্যাংকনোটের নিরাপত্তা ও ব্যবহারিক দিক নিয়েও রয়েছে তাঁর ভাবনা। নিজের শিল্পচর্চার মাধ্যমে এ বিষয়ে কাজ করার আগ্রহ থেকেই পলিমার নোট নিয়ে এগোচ্ছেন তিনি।

শৈশবে বইয়ের পাতায় থাকা গাড়ি ও বিমানের ছবি থেকে শুরু হওয়া আঁকাআঁকির যাত্রা এখন ব্যাংকনোটের সূক্ষ্ম রেখা, প্রতিকৃতি, লেটারিং ও ক্যালিগ্রাফির জগতে এসে পৌঁছেছে। সপ্তম শ্রেণিতে ব্যাংকনোটের নকশা নিয়ে তৈরি হওয়া কৌতূহলকে ধরে রেখে ধীরে ধীরে নিজের আগ্রহকে একটি বিশেষ শিল্পচর্চায় রূপ দিয়েছেন মুহাম্মাদ সাদ।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ব্যাংকনোটের নকশা করার ইচ্ছা তাঁর। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের নকশার মাধ্যমে তুলে ধরার পাশাপাশি ব্যাংকনোটের নিরাপত্তা নিয়েও কাজ করতে চান তিনি। এ জন্য বিভিন্ন দেশের নকশাকারদের কাজ অনুসরণ করছেন, ব্যবহার করছেন নানা ধরনের কলম ও উপকরণ, আর চর্চা করছেন সূক্ষ্ম রেখার শিল্প।

সাদের কাছে ব্যাংকনোটের নকশা কেবল কাগজে প্রতিকৃতি আঁকা নয়; এটি শৈশবের কৌতূহল, শিল্পকলার অধ্যয়ন ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের সম্মিলন। কলমের প্রতিটি আঁচড়ে সেই স্বপ্নকে আরও স্পষ্ট করে তুলতে চান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী। তাঁর প্রত্যাশা, একদিন নিজের শিল্পদক্ষতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকনোটের নকশায় অবদান রাখবেন।

সাংবাদিকদের পেটানোর হুমকি-পিটিয়ে মানুষ হত্যার প্রশংসা, এনা…
  • ২১ অক্টোবর ২০২৬
এইচএসসি পাসেই ওয়ালটন নিয়োগ দেবে ১০ সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ, আ…
  • ২১ অক্টোবর ২০২৬
শার্শায় ১৮ স্বর্ণের বারসহ আটক ১
  • ২১ অক্টোবর ২০২৬
নামের মিলেই কি মেহেদীর বিসিএস ক্যাডার হওয়া হলো না?
  • ২১ অক্টোবর ২০২৬
রোনালদো নাকি মেসি, পেনাল্টি মিসে কে এগিয়ে?
  • ২১ অক্টোবর ২০২৬
এখনও অন্ধকারে ‘ঢাকা’! কেন না জানিয়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ…
  • ২১ অক্টোবর ২০২৬