মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগ
৫ আগস্টের আগে ক্যাম্পাসে নীলদলের কর্মসূচিতে ড. হাবিবুল্লাহ-আল-মামুন (গোলবৃত্ত) © টিডিসি সম্পাদিত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) জীববিজ্ঞান অনুষদভুক্ত মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগে দুইজন প্রভাষক পদে নিয়োগ দিতে আগামী ৪ নভেম্বর সিলেকশন বোর্ড বসার কথা রয়েছে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বোর্ড প্রধান হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মো. আবদুল করিম ও বিভাগটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ মামুন চৌধুরীসহ আরও চারজনকে এই বোর্ডে রাখা হয়েছে। বাকিরা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুল্লাহ-আল-মামুন ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নিয়ামুল নাসের।
অভিযোগ উঠেছে, এই নিয়োগ বোর্ডে আগে থেকে তালিকায় থাকা মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মিসেস ওয়াহিদা হককে বাদ দিয়ে একই বিভাগের আওয়ামীপন্থী নীল দলের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুল্লাহ-আল-মামুনকে যুক্ত করা হয়েছে। অধ্যাপক ওয়াহিদা হক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী সাদা দলের শিক্ষক হিসেবে পরিচিত।
অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুল্লাহ-আল-মামুন হয়তো কোনো একসময় সেই দলের সাথে ছিলেন, এখন আছেন কিনা জানি না। কারও প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এ ধরনের অভিযোগ আসতে পারে। তবে যদি সুস্পষ্ট বা বৈধ প্রমাণ থাকে বা সঠিক কারণ থাকে, তাহলে আমরা তাকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করব-অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা), ঢাবি
অপরদিকে অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুল্লাহ-আল-মামুন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে নীল দলের কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। সর্বশেষ ওই বছরের ৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে নীলদলের প্রোগ্রামেও তিনি উপস্থিত ছিলেন।

৫ আগস্টের আগে ক্যাম্পাসে নীলদলের কর্মসূচিতে ড. হাবিবুল্লাহ-আল-মামুন (সর্ব ডানে)। বাকি দুইজনের একজন শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ড. রহমত উল্লাহ ও নীল দলের নেতা ড. অসীম কুমার
নিয়ম অনুযায়ী, বিভাগের কোনো শিক্ষককে নিয়োগ বোর্ডে রাখা হলে অপেক্ষাকৃত সিনিয়রদের তালিকায় রাখা হয়। কিন্তু তুলনামূলকভাবে বিভাগের জুনিয়র অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুল্লাহ-আল-মামুন। এমনকি অধ্যাপক ওয়াহিদা হকেরও জুনিয়রও তিনি। এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিভাগের শিক্ষক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী ও নিয়োগপ্রত্যাশীরা। তারা বলছেন, এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বাদ দেওয়া অধ্যাপক ওয়াহিদা হককে যুক্ত করতে তারা জোর দাবি জানিয়েছেন।
সম্প্রতি বিভাগের সিলেকশন বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়েছে। একইসঙ্গে সিলেকশন বোর্ড বসার তারিখও নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা ও বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
শিক্ষক নিয়োগ দিতে সিলেকশন বোর্ড গঠন করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায়। এর আগে উপ-উপাচার্য (শিক্ষার) অফিস থেকে কমিটি গঠনের খসড়া সিন্ডিকেটে প্রেরণ করা হয়। ফলে এ কাজটি করে থাকে উপ-উপাচার্য (শিক্ষার) অফিস।
জানা গেছে, অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুল্লাহ-আল-মামুন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে নীল দলের কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপিপন্থী সাদা দলে ভিড়ছেন। সাদা দলের এক প্রভাবশালী নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হাত ধরে তিনি সাদা দলে ভিড়ছেন। এছাড়া সাদা দলের সাবেক এক শীর্ষ নেতা ও বর্তমানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যে দায়িত্ব পালন করা এক অধ্যাপকের আত্মীয় ড. মো. হাবিবুল্লাহ-আল-মামুন।
জানা গেছে, চলতি বছরের শুরুর দিকে মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগে দুইটি প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে একটি স্থায়ী এবং একটি ছুটিজনিত শূন্য পদের বিপরীতে অস্থায়ী। আগ্রহী প্রার্থীরা ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবেদন করতে পেরেছেন। এরপর ২৩ মার্চ বিভাগ সিএন্ডডি (কোঅর্ডিনেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট) কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ইতিপূর্বে অধ্যাপক ওয়াহিদা হক সিএন্ডডি সদস্য ছিলেন এবং তিনি প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক সিলেকশন কমিটির সদস্য থাকাকালীন সময়ে একটি নিয়োগ সম্পন্ন হয়। কিন্তু সম্প্রতি এই সিলেকশন বোর্ড পুনর্গঠন করে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

ড. হাবিবুল্লাহ-আল-মামুন
তথ্যমতে, দুটি পদের বিপরীতে মোট ১৮ জন প্রার্থী আবেদন করেছেন। এরমধ্যে অন্তত চারজন প্রার্থী আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ সমর্থিত। এরমধ্যে রয়েছেন-মো. জাফরুল ইসলাম, আসাদুর রহমান, লিমা আক্তার ও ইমরান খান। মূলত এসব প্রার্থী ও র্যাগিংয়ে জড়িত একজন প্রভাষক (স্থায়ী পদে নিয়োগ প্রত্যাশী) বোর্ডে অতিরিক্ত সুবিধা পেতে পারেন বলে শঙ্কা করছেন বেশ কয়েকজন নিয়োগপ্রার্থী। তাছাড়া এই লোয়ার সিলেকশন বোর্ড থাকলে আগামীতে একই পদে নিয়োগ ও প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতিতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগপন্থী শিক্ষক সুবিধা পেতে পারেন বলে মনে করছেন বিভাগের শিক্ষকরা।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কারও নীল দল বা সাদা দল- এসব রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কমিটি করা হয় না। কমিটি গঠনের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে, যা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হয় এবং উপাচার্য অনুমোদন দেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো কমিটি গঠন করি না, সেই ক্ষমতাও আমার নেই।
অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুল্লাহ-আল-মামুনের নীল দলের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের বিষয়ে জানালে তিনি বলেন, হয়তো তিনি কোনো একসময় সেই দলের সাথে ছিলেন, এখন আছেন কিনা জানি না। কারও প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এ ধরনের অভিযোগ আসতে পারে। তবে যদি সুস্পষ্ট বা বৈধ প্রমাণ থাকে বা সঠিক কারণ থাকে, তাহলে আমরা তাকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করব।

ক্যাম্পাসে নীলদলের কর্মসূচিতে ড. হাবিবুল্লাহ-আল-মামুন
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম।
বিভাগটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ মামুন চৌধুরীকে কমিটির গঠনের বিষয়টি জানালে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, এই ধরনের বিষয় যদি হয়ে থাকে তাহলে সেটি দুঃখজনক।
স্থায়ী হতে পারে র্যাগিংয়ে জড়িত প্রভাষক সেই নিলুফারের চাকরি
২০২৩ সালে মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন মোছা. নিলুফা ইয়াসমিন। তিনি শূন্য পদের বিপরীতে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। আগামী ৪ নভেম্বর সিলেকশন বোর্ডে তাকে স্থায়ী নিয়োগের সুপারিশ করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, ২০১৬ সালে দ্বিতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় প্রথম বর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের একটি ক্লাস রুমে দীর্ঘক্ষণ আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছিল ওই শিক্ষার্থীসহ তার কয়েকজন সহপাঠীর বিরুদ্ধে। সে সময়ে তারা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ধমকাধামকি ও গালি-গালাজ করে।
এছাড়াও গায়ে হাত দেওয়া, কপালে টিপ ও লিপস্টিক দিয়ে দেওয়া, মেয়েদের গায়ের ওড়না খুলে ছেলেদের গায়ে পড়িয়ে দেওয়া ও অশ্লীল হিন্দি ভিডিও প্রজেক্টরে ছেড়ে নাচানো, চুমু দেওয়া ইত্যাদি যৌন হয়রানিমূলক ঘটনা ঘটে। শুধু তাই নয়; র্যাগিং এর স্বীকার কতিপয় ছাত্রীকে বারবার স্পর্শকাতর অঙ্গের নাম উচ্চারণ করতে বাধ্য করা হয়। তাদের মধ্যে অভিযুক্ত একজন মোছা. নিলুফা ইয়াসমিন। যিনি পরে নিজ বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছিলেন।

র্যাগিংয়ে জড়িত নিলুফার, দিয়েছিলেন মুচলেকাও
তখনও র্যাগিংয়ের এমন ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছিল বিভাগের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে। পরে শাস্তি না দিয়ে শুধু মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া এবং এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিসিপ্লিনারি কমিটিকে না জানানোর জন্য তৎকালীন বিভাগের চেয়ারম্যানের নিকট অনুরোধ জানায় ওই শিক্ষকরা। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বর্ষের ওই শিক্ষার্থীরা ক্ষমা প্রার্থনা করে আবেদন করে এবং আলাদা আলাদা স্বীকারোক্তিমূলক লিখিত আবেদন পত্র উপাচার্য বরাবর জমা দিয়েছিল বিভাগ।